ইরানের ওপর চাপ আরও বাড়ানোর পথে হাঁটছে যুক্তরাষ্ট্র। নতুন করে কঠোর নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার পর এবার তেহরানের সঙ্গে আলোচনায় ফেরার বিষয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর দাবি, ইরানের সঙ্গে আবার আলোচনায় বসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই, এমনকি এ নিয়ে কোনো তাড়াও নেই।
বুধবার আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা শুরু করার জন্য তিনি কোনো সময় বেঁধে দেননি।
তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, আলোচনায় ফিরতে ইরানকে কতটা সময় দিতে চান। জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘আমার কোনো সময়সূচি নেই। একটিও নেই। আমার কোনো তাড়া নেই।’
যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে আছে, দাবি ট্রাম্পের
ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে ট্রাম্প দাবি করেন, চলমান সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র বড় ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে। তাঁর ভাষায়, ইরানে এখন ভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতি চলছে এবং দেশটির অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইরানের অভ্যন্তরে বিক্ষোভ দমনের বিষয়টিও উল্লেখ করেন তিনি। ট্রাম্প বলেন, ইরান সরকার নাগরিকদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করছে এবং অনেক বিক্ষোভকারীকে হত্যা করছে।
সামরিক অভিযান ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে কোনটি বেশি কার্যকর—এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, তাঁর মতে দুটিই সমানভাবে কাজ করছে।
তবে এই অবস্থান এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান শুরুর ছয় মাস পূর্ণ হতে যাচ্ছে।
ছয় মাসেও শেষ হয়নি যুদ্ধ
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বর্তমান সংঘাত শুরু হয়। যুদ্ধ শুরুর পর ট্রাম্প একাধিকবার বলেছিলেন, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হবে না। একপর্যায়ে তিনি দাবি করেছিলেন, যুদ্ধ চার থেকে ছয় সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হয়ে যেতে পারে।
কিন্তু ছয় মাসের কাছাকাছি সময় পেরিয়ে গেলেও সংঘাতের স্থায়ী সমাধান হয়নি।
এর মধ্যে গত জুনে দুই দেশের মধ্যে ৬০ দিনের একটি সমঝোতা স্মারক হয়েছিল। ওই সমঝোতার অন্যতম লক্ষ্য ছিল হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখা, ইরানের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা কিছুটা শিথিল করা এবং তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শুরু করা।
তবে চলতি মাসের শুরুতে সেই সমঝোতার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। বর্তমানে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে নতুন কোনো চুক্তি কার্যকর নেই।
নিষেধাজ্ঞার চাপ বাড়াচ্ছে ওয়াশিংটন
আলোচনার বদলে আপাতত ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোর দিকেই এগোচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন।
গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দেয়। এর আওতায় ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা বিভিন্ন দেশের ৬০টি প্রতিষ্ঠানও এসেছে।
মার্কিন কর্মকর্তারা এই পদক্ষেপকে ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’ হিসেবে বর্ণনা করছেন। ট্রাম্প প্রশাসন অভিযানের নাম দিয়েছে ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’।
ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, নতুন নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের জন্য হুমকি।
এক বিবৃতিতে তেহরান সতর্ক করে বলেছে, বিষয়টি এখন আর শুধু ইরানকে ঘিরে নেই। তাদের ভাষ্য, কোনো আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র এমন ‘চরম অরাজকতা ও পদ্ধতিগত গুন্ডামি’ মেনে নেবে না।
নিষেধাজ্ঞার ধাক্কা পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর
দীর্ঘ যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক দুর্ভোগও বাড়ছে। দেশটির মুদ্রার মূল্য দ্রুত কমে যাচ্ছে। খাদ্য ও ওষুধের মতো প্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বেড়েছে ব্যাপকভাবে।
খোলা বাজারে এক মার্কিন ডলারের দাম ২০ লাখ ইরানি রিয়ালেরও বেশি হয়ে গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে বড় প্রশ্ন হলো—এতটা অর্থনৈতিক চাপ কি শেষ পর্যন্ত ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরতে বাধ্য করতে পারবে?
বিশ্লেষকদের একাংশ এ বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন।
এর অন্যতম কারণ, ইরানের অর্থনীতিতে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য এখনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ইরানের তেল রপ্তানির অন্তত ৯০ শতাংশ চীনে যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে তেহরান বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক আয় করছে।
অথচ ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করা বড় চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র এখনো ব্যাপক পদক্ষেপ নেয়নি।
চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর এখনই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হচ্ছে না কেন—এমন প্রশ্নের জবাবে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেন, ‘আমি কেন বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করতে যাব?’
চাপ বাড়লেই কি নীতি বদলাবে ইরান?
বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাতের এই পর্যায়ে তেহরান ওয়াশিংটনের প্রত্যাশার তুলনায় বেশি দৃঢ় অবস্থান ধরে রেখেছে। নতুন নিষেধাজ্ঞা নিঃসন্দেহে ইরানের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের ওপর আরও চাপ তৈরি করবে। কিন্তু সেই চাপ দেশটির সরকারকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন কোনো চুক্তিতে যেতে বাধ্য করবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
ওয়াশিংটনভিত্তিক কুইন্সি ইনস্টিটিউটের প্রধান ত্রিতা পারসি আল জাজিরাকে বলেন, নিষেধাজ্ঞার কারণে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়বে। তবে সেই ভোগান্তি ইরানকে তার নীতি পরিবর্তনে বাধ্য করবে কি না, সেটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
ফলে আপাতত পরিস্থিতি এমন—যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়াচ্ছে, আর ট্রাম্প বলছেন আলোচনায় ফেরার কোনো তাড়া নেই। অন্যদিকে, ছয় মাসের সংঘাতের পরও ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে স্থায়ী সমঝোতার পথ এখনো অনিশ্চিত।

