ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার সেনাবাহিনী প্রতি মাসে যতসংখ্যক নতুন সেনা নিয়োগ দিচ্ছে, তার চেয়ে বেশি সেনা হারাচ্ছে। পশ্চিমা কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৩৬ হাজার রুশ সেনা বিভিন্ন ফ্রন্টে হতাহত বা যুদ্ধের বাইরে চলে যাচ্ছে। বিপরীতে নতুন করে সেনাবাহিনীতে যোগ দিচ্ছেন প্রায় ৩০ থেকে ৩১ হাজার জন। ফলে প্রতি মাসেই প্রায় ৬ হাজার সেনার ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রুশ বাহিনী প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার নতুন সেনা নিয়োগ দিচ্ছে। মাসের হিসাবে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ৩০ থেকে ৩১ হাজারের মতো। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে সেনা হারানোর হার এর চেয়ে অনেক বেশি হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদে জনবল সংকট আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
পশ্চিমা এক কর্মকর্তা মনে করেন, নিয়মিত সেনা ঘাটতির কারণে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও চাপের মধ্যে রয়েছেন। তার দাবি, যুদ্ধক্ষেত্রে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পর্যাপ্ত সেনা না পাওয়ায় ইউক্রেনের বেসামরিক অবকাঠামো ও নাগরিকদের ওপর হামলার মাত্রা বাড়িয়েছে মস্কো।
ওই কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ের শুরু থেকে ইউক্রেনে ৩৬০টিরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে রাশিয়া। বিশেষ করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে কিয়েভের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে রুশ বাহিনী।
পশ্চিমা কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, আসন্ন শীতে ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে বড় ধরনের হামলা চালাতে পারে মস্কো। এর মাধ্যমে দেশটির মানুষের জীবনযাত্রায় চাপ বাড়ানোর পাশাপাশি ইউক্রেনীয়দের মনোবল দুর্বল করার চেষ্টা হতে পারে।
তাদের মতে, যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়ার বড় ক্ষয়ক্ষতির অন্যতম কারণ হলো সেনা সংকট। নতুন করে ব্যাপক সেনা সমাবেশ করা হলে সেটি পুতিন সরকারের জন্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
২০২২ সালের শরতে রাশিয়ায় সর্বশেষ বড় ধরনের সেনা সমাবেশের পর প্রায় ১০ লাখ রুশ নাগরিক দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন বলে পশ্চিমা কর্মকর্তাদের দাবি। তাদের মধ্যে অনেকে পরে দেশে ফিরলেও ফিরে আসা মানুষের সংখ্যা দেশত্যাগীদের অর্ধেকেরও কম ছিল।
এদিকে ইউক্রেনও রাশিয়ার জ্বালানি খাতের বিভিন্ন স্থাপনা ও তেল-সম্পর্কিত লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়ে আসছে। একই সঙ্গে দেশটি মিত্রদের কাছ থেকে আরও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চেয়ে সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছে।
যুক্তরাজ্যও ইউক্রেনের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে নতুন সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিজের প্রথম বিদেশ সফরে এ সপ্তাহে কিয়েভে গিয়ে অ্যান্ডি বার্নহ্যাম ইউক্রেনকে দূরপাল্লার ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
আগামী মাসে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ইউক্রেনকে রুশ হামলা থেকে সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরার পরিকল্পনাও রয়েছে বলে জানা গেছে।
এর প্রতিক্রিয়ায় রাশিয়া ইউক্রেনের পাশাপাশি যুক্তরাজ্যের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতেও পাল্টা হামলার হুমকি দিয়ে আসছে। তবে পশ্চিমা কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন, মস্কোর হুমকি বাস্তব হলেও রাশিয়া এখনো ন্যাটোর সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে চায় না।
ক্রিমিয়াকে রুশ ভূখণ্ড হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়া, মিনস্ক চুক্তি ঘিরে বিরোধ এবং ইউক্রেনের ন্যাটো সদস্যপদের প্রচেষ্টাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের উত্তেজনার পর ২০২২ সালে পুতিনের নির্দেশে ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরু করে রাশিয়া। চার বছর পেরিয়ে গেলেও সেই যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি। বরং দীর্ঘস্থায়ী এই সংঘাতে রাশিয়ার জন্য সেনা ধরে রাখা ও নতুন জনবল সংগ্রহ ক্রমেই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।

