মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর দুই বছরে তিনটি হত্যাচেষ্টার ঘটনার পর নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন তাঁর ২০ বছর বয়সী ছেলে ব্যারন ট্রাম্প। নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে তিনি অনেকটাই আড়ালে থেকে ‘একাকী’ জীবন কাটাচ্ছেন এবং বাইরে বের হওয়াও এড়িয়ে চলছেন বলে নিউইয়র্ক পোস্টের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। সূত্র: এনডিটিভি
নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে দ্বিতীয় বর্ষের পড়াশোনা শেষ করার পাশাপাশি ট্রাম্পের কনিষ্ঠ সন্তান নিজেকে জনসাধারণের নজর থেকে দূরে রাখছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রীষ্মকালীন ছুটির বেশিরভাগ সময় তিনি তাঁর মা ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের সঙ্গে নিউ জার্সির ‘ট্রাম্প ন্যাশনাল গলফ ক্লাব বেডমিনস্টার’-এ কাটিয়েছেন।
ট্রাম্প পরিবারের ঘনিষ্ঠ এক সূত্র নিউইয়র্ক পোস্টকে বলেন, ‘সে বাইরে বের হয় না।’ আরেক সূত্রের ভাষ্য, ‘ছেলেটি বেশ একাকী বা আত্মকেন্দ্রিক।’ ব্যারন সবার নজর কাড়ার বিষয়টি পছন্দ করেন না এবং যতটা সম্ভব তা এড়িয়ে চলেন। জানা গেছে, কোথাও গেলেও তিনি দ্রুত নিজের ব্যক্তিগত বাসস্থানে ফিরে যান। সূত্রটি আরও বলেন, ‘তাকে আশপাশে কোথাও ঘুরে বেড়াতে দেখা যায় না।’
নিউইয়র্ক পোস্টের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, রক্ষণশীল অ্যাক্টিভিস্ট চার্লি কার্কের সঙ্গে ব্যারনের বেশ ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছিল। কার্কের হত্যাকাণ্ড ব্যারনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। বাবাকে ওই খবর জানাতে ফোন করে ব্যারন বলেছিলেন, ‘বাইরে বের হলে এটাই ঘটে।’
ব্যারনের নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে মেলানিয়া ট্রাম্পও অত্যন্ত সতর্ক। তাঁর কার্যালয় জানিয়েছে, ‘সাম্প্রতিক হুমকির বিষয়টি মাথায় রেখে… ব্যারনের ব্যক্তিগত জীবন সংক্রান্ত যেকোনো বিস্তারিত সংবাদ প্রকাশ থেকে বিরত থাকার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে।’ ফার্স্ট লেডি তাঁর ছেলের বিষয়ে অত্যন্ত প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে রয়েছেন এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বজায় রাখার বিষয়ে ব্যারনের ইচ্ছাকে সম্মান করেন।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদ যখন শেষের দিকে এবং ব্যারনের সিক্রেট সার্ভিসের নিরাপত্তা হারানোর সময় ঘনিয়ে আসছিল, তখন মেলানিয়ার কার্যালয় হোয়াইট হাউসের সঙ্গে যোগাযোগ করে। সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের কাছে ব্যারনের নিরাপত্তার মেয়াদ বাড়ানোর অনুরোধ জানানো হয়। বাইডেন প্রশাসন সেই অনুরোধ মেনে নেয়।
মেলানিয়া ট্রাম্পকে নিয়ে তৈরি একটি প্রামাণ্যচিত্রের এক অংশে দেখা যায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তিনি সিক্রেট সার্ভিসের এজেন্টদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘আমি জানি ব্যারন বাইরে যাবে না। এবং আমি তার এই সিদ্ধান্তকে সম্মান করি।’
এটি ঘটেছিল ট্রাম্পের অভিষেক প্যারেডের পরিকল্পনার সময়। তখন ফার্স্ট ফ্যামিলির পেনসিলভানিয়া অ্যাভিনিউ ধরে হেঁটে যাওয়ার কথা ছিল। তবে তীব্র শীতের কারণে পরে ওই প্যারেড ইনডোর বা ভেতরের স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়।
এদিকে ব্যারন ট্রাম্পকে ঘিরে ইরানের হুমকির বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। চলতি সপ্তাহের শুরুতে ট্রাম্প পরিবারের প্রতি হুমকি হিসেবে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে একটি প্রতিবেদন সম্প্রচার করা হয়। সেখানে ব্যারন ট্রাম্পের কাছে পৌঁছানোর উপায় বর্ণনা করা হয় এবং তাঁকে হত্যার জন্য ১ কোটি মার্কিন ডলারের পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। বাংলাদেশি মুদ্রায় এই অর্থের পরিমাণ ৮০ কোটি টাকারও বেশি।

ইরাকি ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের তৈরি এবং ইরানি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের চ্যানেল ৩-এ সম্প্রচারিত ওই ভিডিওটির শিরোনাম ছিল ‘হোয়্যার টু কিল ব্যারন ট্রাম্প’ বা ‘কোথায় ব্যারন ট্রাম্পকে হত্যা করা যায়’। এতে ২০ বছর বয়সী ব্যারন কীভাবে চলাচল করেন, সেটিও দৃশ্যমানভাবে তুলে ধরা হয়।
ভিডিওটিতে দাবি করা হয়, ব্যারন ‘সম্পূর্ণ নজরদারিতে’ রয়েছেন। একই সঙ্গে এতে অভিযোগ করা হয়, সিক্রেট সার্ভিসের নিরাপত্তা এড়িয়ে এক তরুণী একবার একটি ব্যক্তিগত বৈঠকে ব্যারনের পাশে গিয়ে বসেছিলেন।
এর আগের মাসেও ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছিল, যেটি সরাসরি মার্কিন ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পকে লক্ষ্য করে তৈরি করা হয়। ভিডিওটির শেষ দিকে ব্যারনের দিকে নজর ঘুরিয়ে একটি সরাসরি সতর্কবার্তা দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়, ‘এটি কেবল সূচনা মাত্র। ব্যারন ট্রাম্প, আমাদের জন্য অপেক্ষা করো।’
ব্যারনকে ঘিরে প্রকাশিত এসব হুমকির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সিক্রেট সার্ভিসও অবগত রয়েছে। সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে ব্যারনকে হত্যার হুমকি দিয়ে প্রচারিত ভিডিওটির বিষয়ে সিক্রেট সার্ভিস সচেতন।
সিক্রেট সার্ভিসের মুখপাত্র নেট হেরিং সিএনএনকে বলেন, ‘ইউএস সিক্রেট সার্ভিস ভিডিওটি সম্পর্কে অবগত এবং আমাদের সুরক্ষাধীন ব্যক্তিদের প্রতি হুমকি হিসেবে গণ্য হতে পারে- এমন যেকোনো বিষয় আমরা তদন্ত করে দেখি।’
সিক্রেট সার্ভিসের বিবৃতিতে আরও বলা হয়, কৌশলগত নিরাপত্তার স্বার্থে সংস্থাটি তাদের সুরক্ষাধীন ব্যক্তিদের নিরাপত্তা সংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে আলোচনা করে না।
তবে ইরান থেকে আসা এই হুমকির দাবির বিষয়ে ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া গেছে। বৃহস্পতিবার লেবাননের আল মানার টিভিতে প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে ইরানের নিরাপত্তা প্রধান মহসিন রেজাই জানান, ট্রাম্পের কনিষ্ঠ ছেলে ব্যারনকে হত্যার পরিকল্পনার যে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা।
ফলে একদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারে ব্যারনকে লক্ষ্য করে হুমকি ও পুরস্কার ঘোষণার মতো বিষয় সামনে এসেছে, অন্যদিকে ইরানের নিরাপত্তা প্রধান সেটিকে অস্বীকার করেছেন। এর মধ্যেই ব্যারনের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও চলাফেরা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ট্রাম্প পরিবারের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলোর বক্তব্য অনুযায়ী, নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কার কারণে ব্যারন ইতোমধ্যেই নিজের চলাফেরা সীমিত করেছেন। তাঁর জনসমক্ষে উপস্থিতি খুবই কম এবং ব্যক্তিগত জীবনকে যতটা সম্ভব আড়ালে রাখার চেষ্টা করছেন তিনি। মেলানিয়া ট্রাম্পও ছেলের এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করছেন এবং তাঁর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষায় সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন।

