কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অভাবনীয় অগ্রগতি একদিকে অর্থনীতির জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছে, অন্যদিকে এর আড়ালেই জমা হচ্ছে বিশাল ঝুঁকি। উন্নত এআই মডেল ব্যবহার করে সাইবার হামলার সক্ষমতা যদি আরও বেড়ে যায়, তাহলে তা একসময় বিশ্ব অর্থনীতি ও শেয়ারবাজারে প্রবল অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে বলে কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছেন যুক্তরাজ্যের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর।
জি-টোয়েন্টিভুক্ত দেশগুলোর অর্থমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রধানদের উদ্দেশে লেখা এক চিঠিতে তিনি বলেছেন, এআই প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে যথাযথ নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে না ওঠায় বৈশ্বিক আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা এখন প্রশ্নের মুখে।
গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সোমবার পাঠানো দুই পৃষ্ঠার এই চিঠিতে তিনি সর্বাধুনিক প্রজন্মের এআই মডেল নিয়ে স্পষ্ট উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর পর্যবেক্ষণ হলো, এসব মডেল যত বেশি জটিল হয়ে উঠছে এবং নিজে থেকে সমস্যা সমাধানে যত বেশি সক্ষম হচ্ছে, সম্ভাব্য হুমকির মাত্রাও ততই বাড়ছে।
আন্তর্জাতিক আর্থিক স্থিতিশীলতা তদারকিতে নিয়োজিত একটি বৈশ্বিক সংস্থার প্রধানের দায়িত্বও পালন করছেন তিনি। সেই অবস্থান থেকে তিনি মন্তব্য করেন, বর্তমানে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার জন্য সবচেয়ে তাৎক্ষণিক উদ্বেগের একটি হলো উন্নত এআই প্রযুক্তির কারণে ক্রমবর্ধমান সাইবার ঝুঁকি।
তাঁর আশঙ্কা অনুযায়ী, অত্যাধুনিক এআই মডেল সাইবার আক্রমণের গতি ও ব্যাপ্তি— দুটোকেই আমূল বদলে দিতে পারে। বিশেষত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখন তৃতীয় পক্ষের প্রযুক্তি সেবাদাতার ওপর ক্রমেই বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, ফলে বড় কোনো সাইবার হামলা ঘটলে বিশ্বজুড়ে পুঁজিবাজার ও আর্থিক ব্যবস্থার প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থায় মারাত্মক ধস নামতে পারে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা তাঁকে এই উপলব্ধিতে পৌঁছে দিয়েছে যে বিশ্বের অনেক দেশেই উন্নত এআই মডেল তৈরি, প্রকাশ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণকাঠামো এখনো গড়ে ওঠেনি। এই ঘাটতি শুধু আর্থিক খাত নয়, সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্যও গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করছে।
সম্প্রতি শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি মার্কিন এআই প্রতিষ্ঠানের অগ্রণী মডেলগুলোর ওপর বিভিন্ন নিরাপত্তা পরীক্ষা চালানো হয়েছে। এসব পরীক্ষায় কিছু ক্ষেত্রে নিরাপত্তাব্যবস্থা এড়িয়ে যাওয়া বা লঙ্ঘনের ঘটনা সামনে এসেছে, যা বৃহত্তর পরিসরে সম্ভাব্য ঝুঁকির একটি ইঙ্গিত বলে মনে করছেন তিনি। তাঁর পরামর্শ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তি সেবাদাতা কোম্পানিগুলোকে নিজেদের নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বল দিকগুলো আগেভাগে চিহ্নিত করার পাশাপাশি কোনো আক্রমণ বা বিপর্যয়ের পর দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। পাশাপাশি একাধিক প্রতিষ্ঠান একই যৌথ প্রযুক্তি অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল থাকলে সেখানে কোনো বিপর্যয় ঘটলে তা যেন গোটা আর্থিক ব্যবস্থায় ছড়িয়ে না পড়ে, সে জন্য আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন তিনি।
তবে তাঁর উদ্বেগের তালিকা শুধু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাতেই সীমাবদ্ধ নেই। রাষ্ট্রীয় ঋণবাজারের ভঙ্গুরতা, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের অতিরিক্ত ঋণনির্ভর লেনদেন এবং সম্পদের অতিমূল্যায়নজনিত ঝুঁকির কথাও তুলে ধরেছেন তিনি। বিশেষত এআই-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কোম্পানি ও খাতে অতিরিক্ত মূলধন প্রবাহের কারণে যেকোনো সময় বাজারে বড় ধরনের সংশোধন বা অস্থিরতা দেখা দিতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।
এই সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে জি-টোয়েন্টি সম্মেলন, যেখানে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতির দেশগুলোর অর্থমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রধান ও শীর্ষ নীতিনির্ধারকরা বৈশ্বিক অর্থনীতির নানা অগ্রাধিকার ও সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে আলোচনায় বসছেন। এমন এক সময়েই উন্নত এআই প্রযুক্তির সম্ভাব্য সাইবার ঝুঁকি নিয়ে এই সতর্কবার্তা নতুন করে বৈশ্বিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তি যত দ্রুত এগোচ্ছে, নিয়ন্ত্রক কাঠামো তৈরির গতি তার চেয়ে অনেক পিছিয়ে আছে— আর এই ব্যবধানই ভবিষ্যতে বৈশ্বিক আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তার উৎস হয়ে দাঁড়াতে পারে।

