গবেষকদের একটি বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের প্রস্তুত করা এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে ক্লাস্টার যুদ্ধাস্ত্রের আঘাতে অন্তত ১ হাজার ৬৩ জন নিহত বা আহত হয়েছেন, যা এ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি বার্ষিক হতাহতের ঘটনাগুলোর অন্যতম। সূত্র: আল-জাজিরা
মঙ্গলবার প্রকাশিত ক্লাস্টার মুনিশন কোয়ালিশনের বার্ষিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, এসব হতাহত মানুষের বড় অংশই বেসামরিক নাগরিক। নিহত ও আহতদের মধ্যে অন্তত ৩৪ জন শিশু রয়েছে। আফগানিস্তান, কম্বোডিয়া, ইরাক, লাওস, লেবানন, মিয়ানমার, রাশিয়া, সিরিয়া এবং ইউক্রেনে ক্লাস্টার যুদ্ধাস্ত্রের কারণে মৃত্যু ও আহত হওয়ার ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে টানা চতুর্থ বছরের মতো ইউক্রেনে ক্লাস্টার যুদ্ধাস্ত্রের কারণে সবচেয়ে বেশি হতাহতের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। দেশটিতে সংঘটিত হতাহতের সংখ্যা বিশ্বব্যাপী মোট হতাহতের প্রায় ৮৭ শতাংশ।
ক্লাস্টার মুনিশন কোয়ালিশন জানিয়েছে, প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে, কারণ অনেক ঘটনা যথাযথভাবে নথিভুক্ত করা সম্ভব হয় না। এর আগে ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর ক্লাস্টার যুদ্ধাস্ত্রে সর্বোচ্চ ১ হাজার ১৭২ জন নিহত বা আহত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়।
ক্লাস্টার যুদ্ধাস্ত্র মূলত একাধিক ছোট বিস্ফোরক বহনকারী অস্ত্র, যা বিস্ফোরণের সময় বিস্তৃত এলাকায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বোমা ছড়িয়ে দেয়। এসব অস্ত্র নির্বিচারে বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে এবং বেসামরিক মানুষের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করে। বিস্ফোরণের পরও অনেক অবিস্ফোরিত অংশ দীর্ঘ সময় ধরে এলাকায় পড়ে থাকতে পারে, যা পরবর্তী সময়ে প্রাণহানির কারণ হয়।
অসলো প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি ক্লাস্টার যুদ্ধাস্ত্র সংক্রান্ত কনভেনশন ২০১০ সালে কার্যকর হয়। নরওয়ে ও কয়েকটি দেশ এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিতর্কিত এই অস্ত্র থেকে বেসামরিক জনগণকে সুরক্ষা দেওয়ার লক্ষ্যে একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়।
এই কনভেনশন অনুযায়ী ক্লাস্টার যুদ্ধাস্ত্রের ব্যবহার, উৎপাদন এবং মজুত নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বর্তমানে চুক্তিটির ১১২টি পক্ষরাষ্ট্র এবং ১২টি স্বাক্ষরকারী দেশ রয়েছে। চলতি বছরের মার্চে লিথুয়ানিয়া এই কনভেনশন থেকে প্রত্যাহার করে, যা ছিল চুক্তি থেকে সরে যাওয়া প্রথম এবং একমাত্র দেশ।
ক্লাস্টার মুনিশন কোয়ালিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান, মিয়ানমার, রাশিয়া, থাইল্যান্ড, ইউক্রেন এবং কনভেনশনের সদস্য দেশ মালি ক্লাস্টার যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহার করেছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, যদিও এসব দাবির সবগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তবুও ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র, আফগানিস্তানে পাকিস্তান, ইসরায়েলে হুথি বাহিনী এবং লেবাননে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে ক্লাস্টার যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহারের খবর পাওয়া গেছে।
চীন, ভারত, ইসরায়েল, মিয়ানমার, উত্তর কোরিয়া, পোল্যান্ড, রোমানিয়া, রাশিয়া এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় নতুন করে ক্লাস্টার যুদ্ধাস্ত্র উৎপাদনের প্রমাণ পাওয়া গেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে আরও বলা হয়েছে, প্রাপ্ত তথ্য থেকে ধারণা করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতে ক্লাস্টার যুদ্ধাস্ত্রের নতুন উৎপাদনের পরিকল্পনা করছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কনভেনশন চালুর পর প্রথমবারের মতো গত ডিসেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে চুক্তিটিকে সমর্থনকারী বার্ষিক প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেয় যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া।
ক্লাস্টার মুনিশন কোয়ালিশনের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গত বছর মার্কিন বৈদেশিক সহায়তায় কমে যাওয়ার কারণে ক্লাস্টার যুদ্ধাস্ত্রের অবশিষ্টাংশ অপসারণ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে ২০২৫ সাল নাগাদ অন্তত ১১৭ জন নিহত বা আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

