মধ্যপ্রাচ্যের ছয়টি উপসাগরীয় দেশে ভ্রমণের ক্ষেত্রে বড় সুখবর আসতে চলেছে। ইউরোপের শেনজেন ভিসার মতো একটি একক ভিসা চালুর চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি)। ‘জিসিসি গ্র্যান্ড ট্যুরিস্ট ভিসা’ নামের এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে একটিমাত্র ভিসা ব্যবহার করেই ঘুরে আসা যাবে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, বাহরাইন, কাতার, ওমান ও কুয়েত। গত ৬ সেপ্টেম্বর সৌদি আরবের রিয়াদে অনুষ্ঠিত ‘সিকিউরিটি অ্যান্ড হিস্ট্রি ডায়ালগ ২০২৬’ সম্মেলনে জিসিসি মহাসচিব জাসেম মোহাম্মদ আল-বুদাইউই এই খবর নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেছেন, প্রস্তাবিত এই ভিসা খুব শিগগিরই আলোর মুখ দেখবে।
এই ভিসাটি কীভাবে কাজ করবে? জিসিসি মহাসচিব জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক পর্যটকরা একটি মাত্র ভিসা নিয়েই ছয়টি দেশে ভ্রমণ করতে পারবেন, ঠিক যেমনটি ইউরোপের শেনজেন ভিসায় একটি ভিসায় ২৭টি দেশে যাতায়াতের সুবিধা পাওয়া যায়। ভিসাটি সম্পূর্ণ ইলেকট্রনিক হবে। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, এর মেয়াদ ৩০ থেকে ৯০ দিন পর্যন্ত হতে পারে এবং খরচ হতে পারে ১০০ থেকে ১৫০ মার্কিন ডলারের মধ্যে। তবে ভিসাটি ঠিক কবে থেকে চালু হবে, চূড়ান্ত খরচ কত হবে বা আবেদন কীভাবে করতে হবে, এসব বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। জিসিসি-ভুক্ত দেশগুলোর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়গুলো এই মুহূর্তে ভিসা চালুর কারিগরি দিকগুলো চূড়ান্ত করছে। এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বছরের শেষ প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের মধ্যে একটি পাইলট প্রকল্প চালু হতে পারে। সেটি সফল হলে আগামী বছরের শুরুতে বাকি চারটি দেশ, সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত ও ওমান যোগ হবে।
এই একক ভিসার পেছনে দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে জিসিসি দেশগুলোর পর্যটনমন্ত্রীরা সর্বসম্মতভাবে একীভূত পর্যটন ভিসার প্রস্তাব অনুমোদন করেন। পরের মাসেই পরিষদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরা এই প্রস্তাব অনুমোদন দেন। এরপর দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় ভিসা চালুর প্রস্তুতি এগিয়েছে। পাশাপাশি জিসিসি দেশগুলোর মধ্যে নাগরিকদের যাতায়াত সহজ করতে ‘ওয়ান-পয়েন্ট এয়ার ট্রাভেল’ নামে আরেকটি প্রকল্পও চালু হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন এই প্রকল্পের প্রথম ধাপের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু করে। এই ব্যবস্থায় যাত্রীরা বাহরাইনে পাসপোর্টের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করলে আবুধাবি, দুবাই বা শারজাহতে পৌঁছে আর অভিবাসন কর্মকর্তার ঝামেলায় পড়তে হবে না। তবে এই প্রকল্পটি মূলত জিসিসি নাগরিকদের জন্য প্রযোজ্য, আর পর্যটন ভিসাটি বিদেশি পর্যটকদের জন্য।
বাংলাদেশিদের জন্য এই খবর কতটা কাজে আসবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। সম্প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরাত বাংলাদেশিদের ভিসা প্রক্রিয়ায় কঠোরতা আরোপ করেছে, যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা নেই, বাস্তবে নতুন ভিসার অনুমোদন পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। কাজেই এই নতুন ভিসা চালু হলে প্রথমেই বুঝতে হবে, বাংলাদেশিদের জন্য এর আবেদন প্রক্রিয়া কতটা সহজ হবে। কারণ একক ভিসা ব্যবস্থায় একটি দেশের অনুমোদন পেলে অন্যগুলোতেও যাওয়া যাবে, এই সুবিধাটি বাংলাদেশিদের জন্যও প্রযোজ্য হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। জিসিসি মহাসচিব জানিয়েছেন, ভিসাটি মূলত পর্যটন ও আত্মীয়-স্বজন দেখতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যাবে।
এই উদ্যোগের অর্থনৈতিক তাৎপর্যও কম নয়। জিসিসি দেশগুলো তেল-নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে পর্যটন খাতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। এই ভিসা চালু হলে মধ্যপ্রাচ্যে পর্যটকদের সংখ্যা বাড়বে এবং ওই অঞ্চলের দেশগুলোর অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যায়ন আরও শক্তিশালী হবে। জিসিসি মহাসচিব আল-বুদাইউই বলেছেন, এই পদক্ষেপ উপসাগরীয় অঞ্চলের একীভূতকরণ জোরদার করবে এবং পর্যটন খাতকে আরও এগিয়ে নেবে। তবে বাংলাদেশিদের জন্য এর পুরো সুফল পেতে হলে দেশটির কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানো এবং ভিসা প্রক্রিয়ায় বিদ্যমান বাধাগুলো দূর করা জরুরি বলে মনে করছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা। কারণ ইউরোপের শেনজেন ভিসার সুবিধা থাকলেও বাংলাদেশিদের জন্য তা পেতে যে পরিমাণ কাগজপত্র ও প্রমাণ লাগে, তার তুলনায় মধ্যপ্রাচ্যের নতুন ভিসাটি কতটা সহজ হবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

