শৈশবের পরিচিত এক দৃশ্য—পানিতে থইথই করা ধানক্ষেত। কিন্তু প্লেটে ভাত পরিবেশনের আগে সেই সবুজ ক্ষেতের নিচে জমে থাকে বিপুল পরিমাণ পানির খরচের এক গোপন হিসাব। ঠিক এই সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যেই এগিয়ে এসেছে ভারতের অন্যতম শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আইআইটি মাদ্রাজ।
প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, তারা এখন কাজ করছেন এমন এক নিখুঁত কৃষিপদ্ধতি নিয়ে, যেখানে ধান বা আখের মতো ফসল উৎপাদনে ন্যূনতম পরিমাণ পানি ব্যবহার করেই ফলন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
ভারতের কৃষিক্ষেত্রের একটি বড় অথচ কম আলোচিত সমস্যা হলো ধান চাষের প্রচলিত পদ্ধতি। আগাছা দমনের জন্য দীর্ঘ সময় ক্ষেত পানিতে ডুবিয়ে রাখা হয়, যা খাদ্য উৎপাদনের সবচেয়ে পানিসাশ্রয়ী নয় এমন পদ্ধতিগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত।
গবেষণায় উঠে এসেছে, প্রতি কেজি ধান উৎপাদনে দেশটিতে গড়ে দেড় হাজার থেকে দুই হাজার লিটার পানি ব্যয় হয়। পাঞ্জাব ও হরিয়ানার মতো অঞ্চলে, যেখানে কৃষকরা মূলত ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল, সেখানে এই পরিমাণ আরও বেড়ে দুই হাজার দুইশ সত্তর থেকে দুই হাজার ছয়শ বাহাত্তর লিটার পর্যন্ত পৌঁছায়। দেশের মোট ব্যবহৃত স্বাদু পানির প্রায় নব্বই শতাংশই কৃষিকাজে ব্যয় হয়, যার একটি বড় অংশ চলে যায় ধান ও আখের মতো পানি-চাহিদাসম্পন্ন ফসলের পেছনে।
এই সমস্যার সমাধানে আইআইটি মাদ্রাজের একটি নিজস্ব প্রযুক্তি উদ্ভাবন কেন্দ্র সেন্সর, নেটওয়ার্ক এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করছে, যা নিখুঁত কৃষিপদ্ধতির মূল হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে কানাডার একাধিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ কর্মশালাও আয়োজন করেছে এই গবেষণা কেন্দ্র।
এই পদ্ধতির মূলমন্ত্র হলো একটি ফসলকে ঠিক প্রয়োজনীয় পরিমাণ পানিই দেওয়া, এক ফোঁটাও বেশি নয়। মাটিতে বসানো সেন্সর আর্দ্রতা পরিমাপ করে জানিয়ে দেয় ক্ষেতে সত্যিই পানির প্রয়োজন আছে কিনা। এর পাশাপাশি ড্রিপ ইরিগেশন পদ্ধতিতে সরাসরি শিকড়ে মাপা পানি পৌঁছে দেওয়া হয়, আর স্যাটেলাইট ও ড্রোনের মাধ্যমে ক্রমাগত ক্ষেতের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হয়।
বিজ্ঞানীদের মতে, ধানের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে কার্যকর হতে পারে এমন একটি পদ্ধতি, যেখানে ক্ষেতকে সব সময় পানির নিচে না রেখে মাঝেমধ্যে হালকা শুকিয়ে নেওয়া হয়। এই কৌশলে ফলন কমানো ছাড়াই পানির ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।
বিশ্বে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারের দিক থেকে ভারত শীর্ষস্থানে রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাড়তে থাকা উষ্ণতা পানি সংকটকে আরও তীব্র করে তুলছে। এমন পরিস্থিতিতে একশ কোটির বেশি জনসংখ্যার এই দেশটির জন্য নিখুঁত কৃষিপদ্ধতির প্রয়োগ এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে। আইআইটি মাদ্রাজের মতো প্রতিষ্ঠান যদি ধানক্ষেতে এই প্রযুক্তি সফলভাবে প্রয়োগ করতে পারে, তবে তার প্রকৃত সাফল্য পরিমাপ করা হবে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের পরিবর্তনের মাধ্যমেই।

