মিডল ইস্ট আই
দক্ষিণ লেবাননের আলি আল-তাহের পাহাড়কে কয়েক মাস ধরে হিজবুল্লাহ তাদের যুদ্ধকৌশলের একটি বিশেষ ব্যতিক্রম হিসেবে বিবেচনা করে আসছিল। ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে সংগঠনটি সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অবস্থান ধরে রাখার জন্য সরাসরি লড়াই এড়িয়ে চলার কৌশল নিয়েছিল। কিন্তু আলি আল-তাহেরের ক্ষেত্রে সেই অবস্থান ছিল ভিন্ন।
এই পরিবর্তন ২০২৪ সালের যুদ্ধ থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতার প্রতিফলন ছিল। ওই সময় হিজবুল্লাহর সম্মুখ সারির অবস্থান ধরে রাখার প্রচেষ্টা ব্যাপক প্রাণহানির কারণ হলেও ইসরায়েলি বাহিনীকে দক্ষিণ লেবাননের কিছু এলাকায় অগ্রসর হওয়া থেকে পুরোপুরি ঠেকানো যায়নি।
হিজবুল্লাহর চিন্তাধারার সঙ্গে পরিচিত এক কর্মকর্তা জানান, খিয়ামের মতো শহরের আশপাশে দীর্ঘস্থায়ী লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা সংগঠনটিকে আরও নমনীয় গেরিলা কৌশলের দিকে নিয়ে গেছে। এই কৌশলে যোদ্ধারা কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের সঙ্গে নিজেদের আটকে না রেখে ইসরায়েলি অগ্রগতির পরও কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা ধরে রাখার ওপর গুরুত্ব দেয়।
এমনকি বিন্ত জেবেইলকেও, যেটিকে দীর্ঘদিন ধরে “সব যুদ্ধের জননী” হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, হিজবুল্লাহর অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নে এমন কোনো অবস্থান হিসেবে দেখা হয়নি, যা শেষ যোদ্ধা পর্যন্ত ধরে রাখতেই হবে।
তবে আলি আল-তাহের ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।
জুন মাসে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার ঠিক আগে হিজবুল্লাহর এক কর্মকর্তা মিডল ইস্ট আই-কে জানিয়েছিলেন, পাহাড়টি আত্মসমর্পণ না করে “শেষ ব্যক্তি পর্যন্ত” রক্ষা করা হবে।
তিনি ওই অবস্থানকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত স্থান হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। একই সঙ্গে তিনি জোর দিয়ে বলেছিলেন, “পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে রণকৌশল ও রণনীতি পরিবর্তিত হয়।” তার মন্তব্য তখন চলমান পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রতিফলন ছিল।
এই পার্থক্যটিই পরবর্তী ঘটনাগুলো বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
আলি আল-তাহের শুধু একটি সাধারণ পাহাড় নয়। ইসরায়েলি সীমান্ত থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এবং প্রায় ৬০০ মিটার উচ্চতার এই শৈলশিরা নাবাতিয়েহ ও ইকলিম আল-তুফাহ অঞ্চলের দিকে বিস্তৃত। এটি দক্ষিণ লেবাননের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও প্রবেশপথগুলোর ওপর নজরদারির সুবিধা দেয়।
ধারণা করা হয়, এই শৈলশিরার নিচে হিজবুল্লাহর ভূগর্ভস্থ কমান্ড কাঠামো ও অস্ত্র সংরক্ষণ ব্যবস্থা রয়েছে। অন্যদিকে ইসরায়েলি বাহিনী জানিয়েছে, তারা এর নিচে ভূগর্ভস্থ পথ এবং সামরিক অবকাঠামোর সন্ধান পেয়েছে।
হুমকির দিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা
হিজবুল্লাহর এক কর্মকর্তার মতে, আলি আল-তাহেরের কৌশলগত গুরুত্ব তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল ছিল। এগুলো হলো পাহাড়ের নিচে থাকা ভূগর্ভস্থ স্থাপনা, অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ভূগর্ভস্থ অবস্থানের সঙ্গে এসব স্থাপনার সংযোগ এবং পাহাড়টির প্রাকৃতিক ভৌগোলিক সুবিধা।
তার দাবি, গত সপ্তাহে এই অবস্থানের পতন ইসরায়েলকে সামরিক হুমকির দিক পরিবর্তনের সুযোগ দিতে পারে। এতদিন হিজবুল্লাহ লিতানি নদীর উত্তরের এলাকা ব্যবহার করে উত্তর ইসরায়েলকে চাপ দেওয়ার চেষ্টা করত। এখন ইসরায়েল এমন একটি অবস্থান পেতে পারে, যেখান থেকে নাবাতিয়েহ ও ইকলিম আল-তুফাহ অঞ্চলের ওপর নজরদারি এবং চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব।
এই হিসাবই ব্যাখ্যা করে কেন জুনের যুদ্ধবিরতির পরও হিজবুল্লাহ পাহাড়টির আশপাশে লড়াই চালিয়ে গেছে। অন্যদিকে সংগঠনটি অন্যান্য এলাকায় নির্দিষ্ট অবস্থান ধরে রাখার প্রচেষ্টা থেকে অনেকটাই সরে এসেছিল।
যুদ্ধবিরতির কয়েক সপ্তাহ পরও আলি আল-তাহের এলাকা প্রতিদিন ইসরায়েলি হামলা এবং হিজবুল্লাহর ড্রোন হামলার কেন্দ্র হয়ে ওঠে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র বৃহত্তর নিরস্ত্রীকরণ চুক্তির অংশ হিসেবে হিজবুল্লাহকে ওই এলাকা লেবাননের সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তরের প্রস্তাব দেয়।
এরপর সংঘাত ধীরে ধীরে দীর্ঘস্থায়ী ও ক্ষয়িষ্ণু লড়াইয়ে রূপ নেয়।
ইসরায়েল পাহাড়টির ওপর আকাশপথে এবং সামরিক অভিযানের মাধ্যমে নজরদারি বজায় রাখে। একই সঙ্গে তারা বারবার সেখানে হামলা চালায় এবং ভূগর্ভস্থ স্থাপনার চারপাশে চাপ বাড়াতে থাকে।
আগস্টে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা আলি আল-তাহেরের আশপাশে বিমান ও স্থল অভিযান বাড়ানোর বিষয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা করেন। ইসরায়েলি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, হিজবুল্লাহ যোদ্ধারা ওই পাহাড়ের নিচের সুড়ঙ্গগুলোতে অবস্থান করছিল।
হিজবুল্লাহর জন্য কৌশলগত পরাজয়?
তবে হিজবুল্লাহর ওই কর্মকর্তা মনে করেন, পাহাড় থেকে সরে আসার বিষয়টিকে শুধু ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দাবির মাধ্যমে মূল্যায়ন করা যাবে না।
তিনি বলেন, প্রায় তিন মাস ধরে ইসরায়েলের পূর্ণ আকাশ ও অভিযানিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে পাহাড়টি অব্যাহত বোমাবর্ষণের মুখে ছিল। তবুও হিজবুল্লাহর যোদ্ধারা নিজেদের অবস্থানে টিকে ছিল।
তার মতে, শেষ পর্যন্ত সরে আসার সিদ্ধান্ত ছিল লাভ-ক্ষতির হিসাবের ফল, ওই অবস্থানের কৌশলগত গুরুত্ব অস্বীকার করা নয়।
৩ সেপ্টেম্বর ইসরায়েল আলি আল-তাহেরের ওপর “কার্যকরী নিয়ন্ত্রণ” প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়ার পর এই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানায়, তারা দুটি ভূগর্ভস্থ পথ থেকে হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের সরিয়ে দিয়েছে এবং মাটির ওপর ও নিচে উভয় জায়গায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে।
পরে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইজরায়েল কাটজ এই পদক্ষেপকে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের নিরাপত্তা বলয় শক্তিশালী করার অংশ হিসেবে তুলে ধরেন।
তবে “কার্যকরী নিয়ন্ত্রণ” শব্দটির অর্থ স্থায়ী বা পূর্ণ দখল নয়।
হিজবুল্লাহ আনুষ্ঠানিকভাবে এই দাবির বিষয়ে মন্তব্য করেনি। তবে সংগঠনের সদস্যরা পরদিন বিষয়টি অস্বীকার করে জানান, ওই পাহাড়ে কোনো ইসরায়েলি সামরিক উপস্থিতি নেই এবং তাদের যোদ্ধারা এলাকায় অবস্থান করছে ও যেকোনো অগ্রগতির প্রচেষ্টা প্রতিহত করতে প্রস্তুত।
তাই এই পরিভাষা নিয়ে বিতর্ক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইসরায়েল পাহাড়টির ওপর ও নিচে অভিযান চালানোর সক্ষমতা দেখিয়েছে, অন্যদিকে হিজবুল্লাহ চেষ্টা করছে এটিকে চূড়ান্ত কৌশলগত পরাজয় হিসেবে উপস্থাপন না করতে।
এরপর কী?
এখন মূল প্রশ্ন হলো, ইসরায়েল এই সুবিধাকে কীভাবে ব্যবহার করবে।
ইসরায়েলি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হিজবুল্লাহ নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত তারা তাদের নিরাপত্তা বলয়ের অবস্থান ধরে রাখবেন। এর ফলে আলি আল-তাহের শুধু সামরিক সাফল্য নয়, বরং লেবাননের ওপর ইসরায়েলের আলোচনার সক্ষমতার অংশ হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে হিজবুল্লাহর সামনে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ—একটি কৌশলগত অবস্থান হারানোর বিষয়টি মেনে নেওয়া, কিন্তু একই সঙ্গে লিতানি নদীর উত্তরে নিজেদের সামরিক সক্ষমতার বড় ধরনের ক্ষয় এড়ানো।
সংগঠনটির পরবর্তী পদক্ষেপ সম্ভবত পাহাড়টি দ্রুত পুনর্দখলের ওপর নির্ভর করবে না। বরং বিষয়টি নির্ভর করবে ইসরায়েল ওই অবস্থান ব্যবহার করে আশপাশের কৌশলগত এলাকাগুলোতে প্রবেশ বা আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করে কি না তার ওপর।
হিজবুল্লাহর এক কর্মকর্তা বলেন, সংগঠনের নিয়ন্ত্রণে থাকা অন্য গুরুত্বপূর্ণ পাহাড়গুলো থেকে আলি আল-তাহের সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব নয়। তার মতে, ইসরায়েল যদি এই অবস্থান ব্যবহার করে লিতানি নদীর উত্তরের এলাকাগুলোর দিকে হুমকি তৈরি করতে পারে, তবে তা হিজবুল্লাহ ও ইরানের জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করবে।
এখন মূল প্রশ্ন হলো, আলি আল-তাহেরের নিয়ন্ত্রণ হারানো কি শুধু একটি সীমিত কৌশলগত ধাক্কা হয়ে থাকবে, নাকি ইসরায়েল এই অবস্থানকে বৃহত্তর সামরিক ও রাজনৈতিক সুবিধায় রূপান্তর করতে পারবে।
এর উত্তর নির্ভর করবে ইসরায়েল পাহাড়টির অবস্থান কতটা শক্তভাবে ধরে রাখতে পারে, ভূগর্ভস্থ অবকাঠামো কতটা নিষ্ক্রিয় করতে পারে এবং হিজবুল্লাহর চলাচলের স্বাধীনতা কতটা সীমিত করতে পারে তার ওপর।
একই সঙ্গে হিজবুল্লাহকেও প্রমাণ করতে হবে, একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান থেকে সরে আসা তাদের বৃহত্তর সামরিক নেটওয়ার্কের পতনের সমান নয়।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, ইসরায়েলের ঘোষণার পরও এই প্রতিযোগিতা শেষ হয়নি।
নাবাতিয়েহর আশপাশে ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত রয়েছে। একই সময়ে ওই এলাকায় ইসরায়েলি বাহিনীর ওপর হিজবুল্লাহর হামলার খবরও পাওয়া যাচ্ছে।
সে অর্থে, পাহাড়ের ওপর কী ঘটেছে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে এর আশপাশে চলমান সংঘাত।
ইসরায়েলের ঘোষিত “কার্যকরী নিয়ন্ত্রণ” হিজবুল্লাহর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ঘিরে দীর্ঘ লড়াইয়ের একটি পর্যায়ের সমাপ্তি ঘটিয়েছে। তবে এটি হিজবুল্লাহর কৌশলগত পরাজয়, লিতানি নদীর উত্তরে ইসরায়েলের নতুন অভিযানের সূচনা, নাকি প্রচলিত যুদ্ধ থেকে আরও বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষে রূপান্তরের আরেকটি ধাপ—তা এখনো নিশ্চিত নয়।
সামরিক অর্থে পাহাড়টির নিয়ন্ত্রণ বদলেছে বলে ইসরায়েল দাবি করছে। কিন্তু দক্ষিণ লেবাননের ভূখণ্ড, ভূগর্ভস্থ নেটওয়ার্ক এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে বৃহত্তর সংঘাত এখনো চলমান রয়েছে।

