প্রায় সাত মাস ধরে চলা ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুত কমে গেছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মহাপরিদর্শক প্লাত্তে বি. মোরিংয়ের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। সূত্র: সিবিএস
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় গত মঙ্গলবার প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে। এতে বলা হয়েছে, অস্ত্র ও গোলাবারুদের ঘাটতির প্রধান কারণ হলো ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ইরানে পরিচালিত মার্কিন সামরিক অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’।
বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রতিবেদনে প্লাত্তে বি. মোরিং বলেন, ‘অপারেশন এপিক ফিউরির সময় মার্কিন বাহিনী বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ ব্যবহার করেছে। এর ফলে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা পূরণ করতে প্রতিরক্ষা শিল্পের ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে। তবে খুব দ্রুত এই ঘাটতি পূরণ হওয়ার সম্ভাবনা কম।’
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সংঘাত চলাকালে মার্কিন বাহিনী চারটি এফ-১২ যুদ্ধবিমান, একটি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান, সাতটি কেসি-১৩৫ ট্যাংকার এবং ৩০টি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন হারিয়েছে।
অভিযানে ব্যয় ৩ হাজার ৩৪০ কোটি ডলার
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র আর্থিক ব্যয়ের হিসাবও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ইরানে পরিচালিত অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ৩৪০ কোটি ডলার।
এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ, প্রায় ২ হাজার ২৩০ কোটি ডলার, ব্যয় হয়েছে অস্ত্র ও গোলাবারুদ ব্যবহারে।
ইরান যুদ্ধের কারণে মার্কিন সামরিক ভাণ্ডারে ঘাটতির বিষয়টি এর আগেও আলোচনায় এসেছিল। তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বরাবরই এ ধরনের আশঙ্কাকে অস্বীকার করে আসছেন। কয়েক সপ্তাহ আগেও তিনি দাবি করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ‘কার্যত অফুরন্ত’ গোলাবারুদ রয়েছে।
সোমবার ট্রাম্প নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে ইতিহাসের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও উন্নত ও অত্যাধুনিক অস্ত্র তৈরি করছে।
প্রথম ২৪ ঘণ্টায় হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান শুরুর প্রথম ২৪ ঘণ্টায় মার্কিন বাহিনী ১ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে। তবে পরবর্তী সময়ে এমন বড় আকারের হামলা চালানো হয়নি।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংঘাতের সময় কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ইরাক, ওমান ও জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটির শত শত ভবন ও স্থাপনা ইরানি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।
তবে এসব ঘাঁটির ক্ষয়ক্ষতির ব্যয় প্রতিবেদনের মোট হিসাবের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। কারণ, সব স্থাপনা পুনর্নির্মাণ করা হবে কি না এবং এর খরচ কে বহন করবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
এ ছাড়া জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় হয়েছে ৭ কোটি ৯২ লাখ ডলার। এর মধ্যে সরকারি কর্মী ও তাদের পরিবার, মার্কিন নাগরিক এবং যোগ্য তৃতীয় দেশের নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়ার খরচ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইরাক, কুয়েত, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থিত মার্কিন কূটনৈতিক স্থাপনাগুলোর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ১৮ কোটি ৪০ লাখ ডলার।
অস্ত্র উৎপাদন বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
সম্প্রতি মার্কিন অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান লকহিড মার্টিনের আরকানসাসের উৎপাদন কেন্দ্রে প্রবেশের অনুমতি পেয়েছিল সিবিএসের ‘সানডে মর্নিং’ অনুষ্ঠান। এই কেন্দ্রেই তৈরি হচ্ছে ‘প্যাট্রিয়ট’ আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের সর্বশেষ সংস্করণ।
ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার জন্য ব্যবহৃত এই ক্ষেপণাস্ত্রের প্রতিটির দাম প্রায় ৪০ লাখ ডলার। লকহিড মার্টিন বর্তমানে বছরে প্রায় ৭৫০টি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন করছে।
যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মতো পর্যাপ্ত অস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রের কাছে রয়েছে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের মার্ক ক্যানসিয়ান বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা রয়েছে। তবে চীনের মতো বড় শক্তির সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে গেলে পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
তিনি বলেন, ‘চীনের সঙ্গে যুদ্ধ হলে হয়তো এক মাসের জন্য পর্যাপ্ত গোলাবারুদ সরবরাহ করা সম্ভব হবে। কিন্তু দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থ মাসে তা ধরে রাখা হবে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ।’

