যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম রেকর্ড পর্যায়ে ওঠার মধ্যে ইউক্রেনের রুশ জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপ নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ট্রাম্প ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে রাশিয়ার ডিজেল স্থাপনা ও শোধনাগারে হামলা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর যুক্তি, এসব হামলার কারণে রাশিয়া থেকে ডিজেল সরবরাহ কমছে এবং এর প্রভাব পড়ছে বিশ্ববাজারে।
তবে বিশ্ববাজারের বর্তমান জ্বালানি সংকটকে শুধু ইউক্রেনের হামলার ফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। রাশিয়ার শোধনাগারে হামলার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, তেল সরবরাহে বিঘ্ন এবং রাশিয়ার নিজস্ব রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ—সব মিলিয়েই ডিজেলের বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালে রাশিয়া ও উপসাগরীয় অঞ্চলের ডিজেল রপ্তানি ফেব্রুয়ারি থেকে মোট প্রায় ১৬ লাখ ব্যারেল দৈনিক কমেছে।
রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামো ইউক্রেনের ড্রোন হামলার বড় লক্ষ্য হয়ে উঠেছে। সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে দেশটির ডিজেল উৎপাদনকারী বড় কয়েকটি শোধনাগারের কার্যক্রম হামলার কারণে কমেছে বা বন্ধ হয়েছে। রয়টার্সের হিসাবে, আক্রান্ত ছয়টি বড় স্থাপনা রাশিয়ার মোট ডিজেল উৎপাদনের প্রায় অর্ধেকের সঙ্গে যুক্ত। উৎপাদন কমে যাওয়ায় মস্কো অভ্যন্তরীণ বাজার স্থিতিশীল রাখতে জ্বালানি রপ্তানিতে বিধিনিষেধও বাড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তিনি প্রকাশ্যে বলেছেন, ইউক্রেন রাশিয়ার ডিজেল স্থাপনায় হামলা বন্ধ করলে বিশ্ববাজারের জ্বালানি সংকট কিছুটা কমতে পারে। কিন্তু বাজার বিশ্লেষকদের বক্তব্য হলো, রাশিয়ার শোধনাগারে হামলা বন্ধ হলেও বর্তমান সংকটের সব কারণ দূর হবে না। মধ্যপ্রাচ্যে সরবরাহের বিঘ্ন এবং রাশিয়ার রপ্তানি সীমাবদ্ধতাও বাজারে বড় প্রভাব ফেলছে।
এমন পরিস্থিতিতে রাশিয়ার জন্য একটি কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি হয়েছে। ট্রাম্প যখন বিশ্ববাজারে ডিজেলের দামের চাপ কমানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন, তখন মস্কো ইউক্রেনের হামলাকে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংকটের সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ পাচ্ছে।
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে ক্রেমলিনও বিষয়টি কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছে। ট্রাম্প রাশিয়া ও ইউক্রেনের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধের কথা বলার পর রুশ প্রেসিডেন্টের দপ্তরের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ প্রস্তাবটিকে স্বাগত জানান। তবে ইউক্রেনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিষয়টি তখনও চূড়ান্ত কোনো চুক্তিতে পরিণত হয়নি। জেলেনস্কি জানিয়েছেন, রাশিয়াও ইউক্রেনের অবকাঠামোয় হামলা বন্ধ করবে—এমন নিশ্চয়তার সঙ্গে বিষয়টি যুক্ত।
রাশিয়ার অবস্থানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নিষেধাজ্ঞা। মস্কোর বক্তব্য অনুযায়ী, শুধু শোধনাগারে হামলা বন্ধ করলেই আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হবে না; রাশিয়ার তেল ও জ্বালানি খাতের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞাও শিথিল করতে হবে। ফলে জ্বালানি সংকটকে কেন্দ্র করে নিষেধাজ্ঞা নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রও তৈরি হচ্ছে।
তবে রাশিয়া নিজেও জ্বালানি রপ্তানি সীমিত করছে। ১৬ সেপ্টেম্বরের এক প্রতিবেদনে রয়টার্স জানিয়েছে, রাশিয়া অক্টোবরের শেষ পর্যন্ত দেশীয় জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে ডিজেল রপ্তানিতে বিধিনিষেধ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে শুধু ইউক্রেনের হামলা বন্ধ হলেই রাশিয়া থেকে বিশ্ববাজারে ডিজেলের সরবরাহ দ্রুত আগের অবস্থায় ফিরবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রেও ডিজেলের দাম রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে। পরিবহন, কৃষি ও শিল্প খাতে ডিজেলের ব্যবহার বেশি হওয়ায় জ্বালানির দাম বাড়লে তা সরাসরি ব্যবসা ও ভোক্তা ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম রাজনৈতিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
এর মধ্যেই ট্রাম্পের প্রশাসন একদিকে রাশিয়ার ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে, অন্যদিকে ইউক্রেনের রুশ জ্বালানি স্থাপনায় হামলা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছে। ফলে ওয়াশিংটনের সামনে একটি কঠিন ভারসাম্যের প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক চাপ বজায় রাখা এবং একই সঙ্গে বিশ্ববাজারে জ্বালানির সরবরাহ ও দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা কীভাবে সম্ভব?
এখানেই ইউক্রেন যুদ্ধের অন্যতম বড় জটিলতা সামনে আসে। রাশিয়া বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তেল উৎপাদক ও জ্বালানি সরবরাহকারী দেশ। ফলে রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে মস্কোর ওপর চাপ বাড়তে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারেও সরবরাহ কমে দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
বর্তমান পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত। সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দরে তেল সরবরাহে সাময়িক বিঘ্ন এবং আঞ্চলিক হামলার কারণে মঙ্গলবার তেলের দাম এক লাফে বেড়েছিল। পরে সৌদি আরব ওমানের মাধ্যমে বিকল্প সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়ায় বুধবার তেলের দাম কিছুটা কমে। কিন্তু ডিজেলের বাজারে সরবরাহ সংকট এখনো তীব্র।
এ কারণে ইউক্রেনের রুশ শোধনাগারে হামলা বন্ধের সম্ভাব্য সমঝোতা বাজারে কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু সংকটের স্থায়ী সমাধান নাও হতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত শোধনাগার মেরামত, রপ্তানি অবকাঠামো পুনরুদ্ধার, নিষেধাজ্ঞা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ পরিস্থিতি—সবকিছুর ওপরই ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।
শেষ পর্যন্ত বিষয়টি শুধু ইউক্রেনের সামরিক কৌশল বা রাশিয়ার জ্বালানি উৎপাদনের প্রশ্ন নয়। এটি এমন এক অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সমীকরণ, যেখানে একটি দেশের ওপর চাপ বাড়াতে গিয়ে একই সঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। আর সেই বাস্তবতাই রাশিয়াকে ইউক্রেন যুদ্ধের বাইরে আরও একটি কৌশলগত সুবিধা নেওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে—এমনটাই বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

