সৌদি আরবের কাছে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির প্রস্তাব ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। তাদের আশঙ্কা, সৌদি আরবের সঙ্গে সামরিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে চীন অত্যাধুনিক এই যুদ্ধবিমানের প্রযুক্তিগত নকশা ও তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। বুধবার মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস।
এর মধ্যেই সৌদি আরবের কাছে ৪৮টি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির প্রস্তাব মার্কিন কংগ্রেসে পাঠিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। বৃহস্পতিবার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, প্রস্তাবিত এই চুক্তির মূল্য প্রায় ২৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। যুদ্ধবিমান বিক্রির আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া এগিয়ে যাওয়ায় মার্কিন নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের মধ্যে চীনের সম্ভাব্য প্রযুক্তি সংগ্রহ নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
সৌদি আরবের কাছে এফ-৩৫ বিক্রির আলোচনা শুরু হয়েছিল ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে। সে সময় সম্ভাব্য চুক্তির বিষয়টি সামনে আসার পরও একই ধরনের নিরাপত্তা উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন মার্কিন কর্মকর্তারা।
চীনের প্রযুক্তি সংগ্রহের আশঙ্কা
মার্কিন কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, চীন একদিকে গুপ্তচরবৃত্তির মাধ্যমে এবং অন্যদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে বিদ্যমান সামরিক ও নিরাপত্তা অংশীদারত্বকে কাজে লাগিয়ে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের প্রযুক্তি ও নকশা সংগ্রহের চেষ্টা করতে পারে।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পেন্টাগনের একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে এফ-৩৫ প্রযুক্তি সংরক্ষণের স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিয়েও সতর্ক করা হয়েছে। এতে সুপারিশ করা হয়েছে, এসব স্থাপনায় প্রবেশাধিকার শুধু মার্কিন ও সৌদি নাগরিকদের মধ্যে সীমিত রাখা উচিত।
প্রতিবেদনের বিশ্লেষকেরা আরও একটি বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সৌদি আরব চীনের সামরিক বাহিনী এবং তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সাধারণ যোগাযোগ সীমিত করতে কতটা প্রস্তুত হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। বিশেষ করে এফ-৩৫ প্রযুক্তি সুরক্ষার ক্ষেত্রে এ ধরনের যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন মার্কিন কর্মকর্তারা।
এ ছাড়া সৌদি আরবের টেলিযোগাযোগ ও রাউটার অবকাঠামো থেকে চীনা নির্মাতাদের তৈরি সরঞ্জাম সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে রিয়াদ সম্মত হবে কি না, সেই প্রশ্নও তুলেছেন গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বিশ্লেষকেরা।
ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য নেই
এফ-৩৫ চুক্তি ও চীনের সম্ভাব্য প্রযুক্তি সংগ্রহের আশঙ্কা নিয়ে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের কাছে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর, পেন্টাগন এবং ওয়াশিংটনে অবস্থিত সৌদি আরবের দূতাবাস।
অন্যদিকে, এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে হোয়াইট হাউস ও চীনা দূতাবাসের কাছে পাঠানো অনুরোধেরও তাৎক্ষণিক কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
ইসরায়েলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব নিয়েও উদ্বেগ
সৌদি আরবের কাছে এফ-৩৫ বিক্রির সম্ভাব্য চুক্তি শুধু চীনকে ঘিরে মার্কিন নিরাপত্তা উদ্বেগই বাড়াচ্ছে না, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
২০২৫ সালে সৌদি আরবের সঙ্গে এফ-৩৫ বিক্রির আলোচনা শুরুর সময়ও দ্য নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছিল, চুক্তিটি মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র দেশ হিসেবে ইসরায়েল এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান পরিচালনা করছে। ২০২৪ সালের অক্টোবর এবং ২০২৫ সালের জুনে ইরানের বিরুদ্ধে চালানো বিমান হামলাতেও ইসরায়েল এই যুদ্ধবিমান ব্যবহার করেছে।
১৯৭৩ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকেরা মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে আসছেন।
মার্কিন কংগ্রেসের নীতির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এমন নিশ্চয়তা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে যে, ইসরায়েল যেন যেকোনো ‘বিশ্বাসযোগ্য প্রচলিত সামরিক হুমকি’ মোকাবিলা করে তা পরাজিত করতে সক্ষম হয়। একই সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতে ইসরায়েলের ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের মাত্রা সর্বনিম্ন রাখার সক্ষমতাও নিশ্চিত করার কথা রয়েছে।
ফলে সৌদি আরবের কাছে এফ-৩৫ বিক্রির প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে একদিকে চীনের কাছে অত্যাধুনিক মার্কিন সামরিক প্রযুক্তি পৌঁছানোর সম্ভাবনা নিয়ে ওয়াশিংটনের উদ্বেগ থাকবে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ভারসাম্য এবং ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের নীতিও আলোচনায় থাকবে।

