যুদ্ধক্ষেত্রে নতুন অস্ত্রের আবির্ভাব প্রায়ই পুরোনো প্রতিরক্ষা কৌশলকে অকার্যকর করে দেয়। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের ক্রমাগত বিবর্তনও সেই বাস্তবতারই উদাহরণ। এবার রাশিয়ার নতুন প্রজন্মের জেটচালিত ‘গেরান-৫’ ড্রোন ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষার সামনে এমন এক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, যেখানে কম খরচের ড্রোন প্রতিহত করতে ব্যয় করতে হচ্ছে তুলনামূলক অনেক দামি অস্ত্র।
গেরান পরিবারের শিকড় ইরানি শাহেদ ড্রোন প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত হলেও নতুন জেটচালিত সংস্করণগুলো আগের প্রপেলারচালিত মডেল থেকে অনেকটাই আলাদা। বিশেষ করে গেরান-৫কে সামরিক বিশ্লেষকেরা ড্রোন ও স্বল্পমূল্যের ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যবর্তী এক নতুন ধরনের অস্ত্র হিসেবে দেখছেন।
আগের গেরান বা শাহেদ মডেলে পিস্টন ইঞ্জিন ও প্রপেলার ব্যবহার করা হলেও নতুন জেটচালিত সংস্করণে ছোট টার্বোজেট ইঞ্জিন যুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে গতি ও উচ্চতায়।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ গবেষক ক্যাটেরিনা বন্ডারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গেরান-৫ ঘণ্টায় প্রায় ৬০০ কিলোমিটার পর্যন্ত গতিতে উড়তে পারে। এর কার্যকর উচ্চতা প্রায় ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার মিটার এবং সংস্করণভেদে পাল্লা প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার থেকে ৯৫০ কিলোমিটারের বেশি হতে পারে।
এখানেই ইউক্রেনের জন্য তৈরি হয়েছে নতুন সমস্যা।
পুরোনো প্রতিরক্ষার হিসাব পাল্টে গেছে
যুদ্ধের শুরুর দিকে রাশিয়া বিপুলসংখ্যক শাহেদ-শ্রেণির প্রপেলারচালিত ড্রোন ব্যবহার শুরু করলে ইউক্রেন তুলনামূলক সস্তা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলে।
মোবাইল ফায়ারিং টিম, ভারী মেশিনগান, স্বল্পপাল্লার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং ইন্টারসেপ্টর ড্রোন ব্যবহার করে একপর্যায়ে এসব ড্রোনের বিরুদ্ধে ৯০ শতাংশের বেশি সফলতার দাবি করা হয়েছিল।
কিন্তু গেরান-৫ সেই সমীকরণে বড় পরিবর্তন এনেছে।
পুরোনো ড্রোনগুলো তুলনামূলক ধীরগতির হওয়ায় ভূমি থেকে মেশিনগান কিংবা ছোট ইন্টারসেপ্টর ড্রোন দিয়ে ধাওয়া করে ধ্বংস করা সম্ভব হতো। নতুন জেটচালিত ড্রোন দ্রুতগতিতে এবং অনেক বেশি উচ্চতায় উড়তে পারায় সেই সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
এনডিটিভির প্রতিবেদনে উদ্ধৃত বিশ্লেষকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ব্যবহৃত অনেক ইউক্রেনীয় ইন্টারসেপ্টর ড্রোনের সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ কিলোমিটার। অন্যদিকে গেরান-৫ প্রায় ৬০০ কিলোমিটার গতিতে চলতে পারে। ফলে পেছন থেকে ধাওয়া করে একে আটকানো অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব হচ্ছে না।
ইউক্রেনের বিমানবাহিনীর একজন উপকমান্ডারও জানিয়েছেন, নতুন ড্রোনগুলোর গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এগুলো নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় উড়তে পারে; অর্থাৎ অপারেটরের নির্দেশনায় উড্ডয়নের সময় রুট ও উচ্চতা পরিবর্তনের সক্ষমতা রয়েছে।
সস্তা অস্ত্র ঠেকাতে দামি ক্ষেপণাস্ত্র
গেরান-৫-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব শুধু এর গতি নয়, বরং যুদ্ধের অর্থনীতিতেও।
আগের শাহেদ ড্রোনের বিরুদ্ধে তুলনামূলক কম খরচের প্রতিরক্ষা ব্যবহার করা সম্ভব হলেও দ্রুতগতির জেটচালিত ড্রোন ঠেকাতে ইউক্রেনকে অনেক ক্ষেত্রে ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র, বিমান থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র কিংবা আরও উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ারের বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, জেটচালিত রুশ ড্রোনের গতি বৃদ্ধির কারণে ইউক্রেনের ওপর সারফেস-টু-এয়ার, ম্যানপ্যাড এবং এয়ার-টু-এয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের চাপ বাড়ছে। এতে সীমিত আকাশ প্রতিরক্ষা গোলাবারুদের মজুতেও চাপ তৈরি হচ্ছে।
অর্থাৎ আক্রমণকারী পক্ষ যদি তুলনামূলক কম খরচে বিপুলসংখ্যক ড্রোন তৈরি করতে পারে, কিন্তু সেগুলো ঠেকাতে প্রতিরক্ষাকারী পক্ষকে প্রতিবার অনেক বেশি দামের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে যুদ্ধের অর্থনৈতিক ভারসাম্যও বদলে যেতে পারে।
সংখ্যাই হয়ে উঠছে বড় অস্ত্র
গেরান-৫ ঘিরে রাশিয়ার কৌশলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সংখ্যার ব্যবহার।
শুধু একটি দ্রুতগতির ড্রোন প্রতিরক্ষা ভেদ করবে কি না, সেটিই এখানে মূল বিষয় নয়। বরং একই সময়ে বিভিন্ন দিক থেকে বিপুলসংখ্যক ড্রোন পাঠানো হলে রাডার, ইন্টারসেপ্টর, ক্ষেপণাস্ত্র এবং প্রতিরক্ষা কর্মীদের ওপর একযোগে চাপ পড়ে।
এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রাশিয়া জেটচালিত ড্রোনের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিপুলসংখ্যক ড্রোন একসঙ্গে ব্যবহারের ফলে উচ্চ হারে সেগুলো প্রতিহত করা গেলেও কিছু ড্রোন প্রতিরক্ষা ভেদ করার সম্ভাবনা থেকে যায়।
এই কৌশলের ফলে শুধু প্রতিপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাই ব্যস্ত থাকে না, বরং ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত, প্রতিরক্ষা কর্মীদের সক্ষমতা এবং ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো মেরামতের ওপরও ধারাবাহিক চাপ সৃষ্টি হয়।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোও লক্ষ্যবস্তু
রাশিয়ার ড্রোন হামলার আরেকটি উদ্দেশ্য ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর দীর্ঘস্থায়ী চাপ সৃষ্টি করা।
বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা, গ্যাস অবকাঠামো, প্রতিরক্ষা উৎপাদন কেন্দ্র এবং সামরিক রসদ ব্যবস্থায় বারবার হামলা হলে ক্ষয়ক্ষতি মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় সময় কমে যায়।
একই সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে বিমান হামলার সতর্কতা চালু থাকায় সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ওপরও মানসিক চাপ তৈরি হয়। বিশ্লেষকেরা একে প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ধীরে ধীরে ক্ষয় করার কৌশল হিসেবে দেখছেন।
পাল্টা প্রযুক্তির খোঁজে ইউক্রেন
নতুন হুমকির বিপরীতে ইউক্রেনও দ্রুতগতির ও তুলনামূলক কম খরচের নতুন ইন্টারসেপ্টর তৈরির চেষ্টা করছে।
১৫ সেপ্টেম্বর ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানান, জেটচালিত রুশ ড্রোন প্রতিহত করার জন্য তৈরি একটি নতুন ইন্টারসেপ্টরের সফল পরীক্ষা চালানো হয়েছে। তবে নতুন প্রযুক্তিকে আরও উন্নত করার প্রয়োজন রয়েছে বলে জানিয়েছেন ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু প্রতিটি ড্রোনকে আকাশে ধ্বংস করার ওপর নির্ভর করলে ব্যয় ও অস্ত্রের মজুতের সমস্যার সমাধান হবে না। এ কারণে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে ব্যাহত করা এবং সামরিক উৎপাদন অবকাঠামোর ওপর চাপ তৈরির মতো বৃহত্তর কৌশল নিয়েও আলোচনা চলছে।
ভবিষ্যতের যুদ্ধের নতুন বার্তা
গেরান-৫-এর গুরুত্ব তাই শুধু ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
এই অস্ত্র দেখাচ্ছে, অত্যাধুনিক ও অত্যন্ত ব্যয়বহুল ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং প্রচলিত কমদামি ড্রোনের মাঝখানে নতুন একটি অস্ত্রশ্রেণি তৈরি হচ্ছে—যেখানে তুলনামূলক কম খরচ, দ্রুতগতি, দীর্ঘ পাল্লা এবং ব্যাপক উৎপাদন একসঙ্গে পাওয়া যাচ্ছে।
সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে গেরান-৫কে এমন একটি ‘কম খরচের ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রসদৃশ’ অস্ত্র হিসেবেও বর্ণনা করা হয়েছে, যা আক্রমণ ও প্রতিরক্ষার অর্থনৈতিক হিসাব পাল্টে দিতে পারে।
আর এখানেই ভবিষ্যতের আকাশযুদ্ধের সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি সামনে আসছে—হামলাকারী যদি কম খরচে শত শত দ্রুতগতির অস্ত্র তৈরি করতে পারে, তাহলে প্রতিরক্ষাকারী দেশ কি প্রতিটি লক্ষ্যবস্তুর পেছনে বহু গুণ বেশি দামের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যয় করে দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারবে?
গেরান-৫ হয়তো এককভাবে যুদ্ধের ফল নির্ধারণ করবে না। তবে এটি দেখিয়ে দিচ্ছে, ভবিষ্যতের আকাশ প্রতিরক্ষায় শুধু সবচেয়ে আধুনিক অস্ত্র থাকাই যথেষ্ট হবে না; বিপুলসংখ্যক কম খরচের আক্রমণ মোকাবিলা করার অর্থনৈতিক ও শিল্প সক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

