নিজের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে যখন হাজার হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করছে কাতার, তখন একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি কিনছে দেশটি। আপাতদৃষ্টিতে এই সিদ্ধান্তকে পরস্পরবিরোধী মনে হতে পারে। কিন্তু পারস্য উপসাগরীয় সংকটের মধ্যে দোহার কূটনৈতিক অবস্থান বুঝতে এই সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিচ্ছে। বিদেশ থেকে গ্যাস কেনার ফলে কাতারএনার্জি এমন কিছু এলএনজি পাবে, যা রস লাফান বন্দর থেকে ট্যাংকার বের হতে না পারলেও অন্য বন্দর থেকে বিক্রি করা সম্ভব। তবে যেসব ক্রেতার সঙ্গে কাতারের চুক্তিতে নির্দিষ্ট করে রস লাফান বন্দর থেকে গ্যাস সরবরাহের শর্ত রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এই কৌশল খুব বেশি কাজে আসবে না।
এই নিবন্ধে বিশ্লেষণ করা হয়েছে, একটি শান্তিচুক্তি হলে এক সপ্তাহের মধ্যে কাতারের জ্বালানি খাতে কী কী পুনরুদ্ধার সম্ভব, ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো মেরামতে কেন কয়েক বছর লাগবে এবং এর মধ্যবর্তী সময়ে এশিয়া ও ইউরোপের ক্রেতারা যেসব সিদ্ধান্ত নেবেন, তা কীভাবে কাতারের জন্য তাৎক্ষণিক রাজস্ব ক্ষতির চেয়েও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
হরমুজের ওপর নির্ভর করছে কাতারের পরবর্তী এলএনজি চালান ও সম্প্রসারণ পরিকল্পনা
গত অক্টোবরে কাতারের জ্বালানিমন্ত্রী সাদ শেরিদা আল-কাবি তাঁর দেশের গ্যাসশিল্পের পুনরুদ্ধারে কত সময় লাগতে পারে, সে বিষয়ে দুটি ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে শান্তিচুক্তি হলে এবং পর্যাপ্ত ট্যাংকার পাওয়া গেলে কাতারএনার্জির যেসব তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, সেগুলো এক সপ্তাহের মধ্যেই চালু করা সম্ভব। অন্যদিকে মার্চে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত দুটি উৎপাদন লাইন মেরামত করতে প্রায় তিন বছর লাগবে।
পারস্য উপসাগরীয় সংকটে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে চাওয়া কাতার সরকারের জন্য এই সময়ের হিসাব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে কী ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব এবং দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হলেও কোন কাজগুলো সম্পন্ন করতে আরও কয়েক বছর লাগবে, তা এর মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়।
কাতারের ক্রেতাদের কাছে পুনরুদ্ধারের বিষয়টি আরও বাস্তবিক। কোনো বিদ্যুৎ বা জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে জানতে হয়, নির্ধারিত চাহিদা পূরণে এলএনজির চালান সময়মতো পৌঁছাবে কি না। না পৌঁছালে বিকল্প উৎস থেকে কখন গ্যাস কিনতে হবে, সেটিও তাদের বিবেচনায় রাখতে হয়। অন্যদিকে দোহায় বসে আরেক মাসের সংঘাতের অর্থনৈতিক ব্যয় হিসাব করার সময় সরকারকে ভাবতে হচ্ছে, একই ক্রেতা পরবর্তী সরবরাহ চুক্তির ক্ষেত্রে কী সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
তাৎক্ষণিক ক্ষতি হলো, বন্দর থেকে কোনো চালান বের হতে না পারলে সেই বিক্রির আয় হারানো। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি আরও বড়। কাতারের গ্যাস কিনতে আগ্রহী কোনো ক্রেতা যদি ভবিষ্যতে দেশটি থেকে কম গ্যাস কেনার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে সেই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা অনেক কঠিন হবে।
ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কাতারের ক্ষয়ক্ষতি
হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে কোনো এলএনজি চালানের উৎসের দিকে ফিরে তাকালে কাতারের ঝুঁকির ভৌগোলিক বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গ্যাসের উৎস উত্তরাঞ্চলীয় গ্যাসক্ষেত্র বা নর্থ ফিল্ড। এটি ইরানের সঙ্গে ভাগাভাগি করা একটি বিশাল সমুদ্রের নিচের গ্যাসক্ষেত্র। ইরানের অংশটি দক্ষিণ পার্স নামে পরিচিত।
কাতারের অংশের গ্যাস সমুদ্রের নিচ থেকে উত্তোলনের পর রস লাফান শিল্পনগরীতে আনা হয়। সেখানে প্রক্রিয়াজাত করে তরলীকৃত করা হয়, যাতে জাহাজে করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাঠানো যায়। এই পুরো কার্যক্রম একটি শিল্পনগরীতে কেন্দ্রীভূত করার ফলে কাতার বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এলএনজি রপ্তানিকারক হয়ে উঠেছে। কিন্তু এর ফলে হাজার হাজার মাইল দূরের বিভিন্ন দেশের ক্রেতাদের একই উৎপাদন অবকাঠামো এবং একই সামুদ্রিক পথের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
গত ১৮ ও ১৯ মার্চ ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় রস লাফানের দুটি এলএনজি উৎপাদন ইউনিট ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এগুলো ট্রেন-৪ ও ট্রেন-৬ নামে পরিচিত। দুটি ইউনিটের সম্মিলিত বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ১ কোটি ২৮ লাখ টন এলএনজি। যুদ্ধের আগে কাতারের মোট এলএনজি রপ্তানি সক্ষমতার প্রায় ১৭ শতাংশ ছিল এই দুটি ইউনিটের উৎপাদন।
মার্চে কাতারএনার্জি জানিয়েছিল, এই ক্ষয়ক্ষতির কারণে বছরে প্রায় ২০ বিলিয়ন বা ২ হাজার কোটি ডলারের রাজস্ব হারাতে পারে দেশটি। তবে ক্ষতির প্রভাব শুধু এলএনজি উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ ছিল না। কনডেনসেট ও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই হামলায় কাতারএনার্জি ও শেল পরিচালিত পার্ল গ্যাস-টু-লিকুইডস (জিটিএল) স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে একটি হামলার ঘটনায় একই শিল্পাঞ্চলনির্ভর একাধিক জ্বালানি ব্যবসা ক্ষতির মুখে পড়ে।
সংঘাতের বৃহত্তর অর্থনৈতিক প্রভাব জুনের মধ্যেই কাতারএনার্জির আর্থিক হিসাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে প্রতিষ্ঠানটির নিট মুনাফা কমে দাঁড়ায় ১৫ বিলিয়ন কাতারি রিয়ালে। আগের বছরের একই সময়ে এই অঙ্ক ছিল ৪৮ বিলিয়ন রিয়াল। অর্থাৎ মুনাফা কমেছে ৬৯ শতাংশ। একই সময়ে রাজস্ব কমেছে ৩৫ শতাংশ।
এখানে দুটি হিসাবের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ১৫ বিলিয়ন রিয়ালের মুনাফা এবং ৩৫ শতাংশ রাজস্ব হ্রাস হলো ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে পুরো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থার প্রতিফলন। অন্যদিকে ২০ বিলিয়ন ডলারের অঙ্কটি ক্ষতিগ্রস্ত উৎপাদন অবকাঠামোর কারণে সম্ভাব্য বার্ষিক রাজস্ব ক্ষতির হিসাব। সংঘাতের কারণে কাতারের সামগ্রিক অর্থনীতিতে কতটা ক্ষতি হয়েছে, তা আলাদাভাবে নিরূপণ করা কঠিন। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ২০২৬ সালে কাতারের প্রকৃত মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ৮ দশমিক ৬ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে।
নতুন কারখানা প্রস্তুত হলেও গ্যাস নিতে পারবে না ক্রেতারা
দোহার সংকটের সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ পাওয়া যায় রস লাফানেই। অক্টোবরের শুরুতে প্রকল্পটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, নর্থ ফিল্ড ইস্ট সম্প্রসারণ প্রকল্পের প্রথম নতুন উৎপাদন লাইন নভেম্বরেই কারিগরিভাবে চালুর জন্য প্রস্তুত হতে পারে।
তবে ওই মাসের শেষ দিকে জ্বালানিমন্ত্রী আল-কাবি জানান, ২০২৭ সালের প্রথম প্রান্তিকে এটি চালুর প্রত্যাশা করছেন তিনি। যদিও উৎপাদন শুরুর বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তিচুক্তির ওপর নির্ভর করছে।
এ ধরনের বৃহৎ প্রকল্পের ক্ষেত্রে এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৌশলীরা তাঁদের কাজ শেষ করতে পারেন, সরবরাহকারীরা প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি পৌঁছে দিতে পারেন এবং কারখানার পরীক্ষামূলক কার্যক্রমও সম্পন্ন হতে পারে। কিন্তু প্রথম বাণিজ্যিক চালান কবে পাঠানো যাবে, তা নির্ভর করছে এমন পরিস্থিতির ওপর, যা কারখানার প্রকৌশলীদের নিয়ন্ত্রণে নেই।
যুদ্ধের মধ্যেও সম্প্রসারণ পরিকল্পনা থেকে সরে আসেনি কাতার। যুদ্ধের আগে রস লাফানে দেশটির বার্ষিক এলএনজি উৎপাদন সক্ষমতা ছিল প্রায় ৭ কোটি ৭০ লাখ টন। নর্থ ফিল্ড ইস্ট, সাউথ ও ওয়েস্ট প্রকল্পের মাধ্যমে এই সক্ষমতা বাড়িয়ে ১৪ কোটি ২০ লাখ টনে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
অক্টোবরে আল-কাবি জানান, এসব প্রকল্পের সব চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে এবং ঘোষিত কোনো প্রকল্পই বাতিল করা হয়নি। নতুন উৎপাদন লাইনটি চালু হলে জাহাজ চলাচলের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর হারানো উৎপাদনের একটি অংশ পূরণ করা সম্ভব হবে। তবে পরবর্তী পর্যায়ের প্রকল্পগুলোর বাণিজ্যিক লক্ষ্য আরও বড়। আগামী কয়েক দশক ধরে ক্রেতারা কাতারের কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেশি গ্যাস কিনবেন বলে প্রত্যাশা করছে দোহা। কিন্তু একই সময়ে ক্রেতারা নতুন করে হিসাব করছেন, হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে আসা গ্যাসের ওপর তাঁরা কতটা নির্ভর করতে চান।
এ ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে কাতারের কাছ থেকে এলএনজি কিনে আসা কোনো জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত বিবেচনা করা যেতে পারে। প্রতিষ্ঠানটি কাতারের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখতে চাইতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলো মেরামত হবে বলেও তাদের প্রত্যাশা থাকতে পারে। তারপরও পরবর্তী দফায় গ্যাস কেনার সময় তারা অন্য কোনো সরবরাহকারীকে বেছে নিতে পারে।
অন্য কোনো রপ্তানিকারকের সঙ্গে দ্বিতীয় একটি চুক্তি থাকলে উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ার সময় বিকল্প বন্দর থেকে গ্যাস পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। ফলে কাতার দীর্ঘদিনের কোনো ক্রেতাকে ধরে রাখতে পারলেও সেই ক্রেতার ভবিষ্যৎ ব্যবসার একটি অংশ হারাতে পারে।
এটি সরাসরি চুক্তি বাতিলের মতো দৃশ্যমান ক্ষতি নয়। বরং ধীরে ধীরে এর প্রভাব পড়বে। কাতারের নতুন উৎপাদন লাইনগুলো চালু হওয়ার পর ক্রেতারা কত পরিমাণ গ্যাস কেনার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, তার মধ্য দিয়েই এই ঝুঁকি প্রকাশ পাবে।
বিশ্বের শীর্ষ গ্যাস রপ্তানিকারকদের একটি হয়েও কেন যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি কিনছে কাতার
কাতারএনার্জির সাম্প্রতিক পদক্ষেপ থেকে বোঝা যায়, প্রতিষ্ঠানটির বাণিজ্যিক বিভাগও বিকল্প বন্দরের গুরুত্ব বুঝতে পারছে। অক্টোবরে আল-কাবি নিশ্চিত করেন, ভবিষ্যতে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য উৎপাদক দেশের কাছ থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে এলএনজি কিনছে।
ভবিষ্যতে কোনো সংকটের কারণে কাতারের ট্যাংকারগুলো উপসাগর থেকে বের হতে না পারলে এবং একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দাম বেড়ে গেলে অন্য দেশ থেকে কেনা এলএনজি বিক্রি করে কাতারএনার্জি আয় করতে পারবে। প্রতিষ্ঠানটির বাণিজ্যিক কার্যক্রমের জন্য এই কৌশলের সুবিধা স্পষ্ট।
উপসাগরের বাইরে অন্য কোনো বন্দরে আগে থেকেই মজুত থাকা বা সরবরাহের জন্য প্রস্তুত গ্যাস তখন বিশেষভাবে মূল্যবান হয়ে উঠবে, যখন রস লাফান থেকে গ্যাস বাজারে পৌঁছানো সবচেয়ে কঠিন হবে।
তবে এই কৌশলেরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কাতারএনার্জির দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তির শর্তেই সেই সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট। আল-কাবি ব্যাখ্যা করেছেন, প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘমেয়াদি ক্রেতাদের সঙ্গে করা চুক্তিতে কোন টার্মিনাল থেকে গ্যাসের চালান জাহাজে তুলতে হবে এবং কোন গন্তব্যে পৌঁছে দিতে হবে, তা নির্দিষ্ট করে উল্লেখ থাকে।
এই শর্ত অনুযায়ী, রস লাফান থেকে গ্যাস সরবরাহের বাধ্যবাধকতা থাকলে কাতারএনার্জি শুধু যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেনা গ্যাস পাঠিয়ে সেই চুক্তি পূরণ করতে পারে না।
বিশ্ববাজারে গ্যাসকে একটি অবাধে কেনাবেচা করা পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা হলেও বাস্তবে সরবরাহ চুক্তির এসব শর্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কাতারএনার্জির বাণিজ্যিক বিভাগের জন্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে গ্যাস কেনা বিকল্প আয় তৈরির সুযোগ। কিন্তু কাতারের সঙ্গে চুক্তি করা কোনো ক্রেতার কাছে মূল প্রশ্নটি একই থেকে যায়—নির্ধারিত সময়ে কাতার থেকে গ্যাসের চালান পাওয়া যাবে কি না।
কূটনীতির মাধ্যমে কী অর্জন করতে পারে দোহা
ইরানের সঙ্গে কাতারের সম্পর্কের কারণে এই প্রশ্নটি দোহার জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশ একই গ্যাসক্ষেত্রের বিপরীত অংশ থেকে গ্যাস উত্তোলন করে। অন্যদিকে কাতারের গ্যাসবাহী জাহাজগুলোকে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাতে যে সামুদ্রিক পথ ব্যবহার করতে হয়, সেই পথের পাশে রয়েছে ইরান।
মার্চের হামলার পরও তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগের পথ বন্ধ করেনি দোহা। আল-কাবি অক্টোবরে জানান, যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে সম্ভাব্য তেল ও গ্যাস সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করতে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরানের ভারপ্রাপ্ত পেট্রোলিয়ামমন্ত্রীর সঙ্গে দুবার বৈঠক করেছেন তিনি।
রাজনৈতিক পরিস্থিতির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত থাকলেও এই আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার বাস্তব কারণ রয়েছে কাতারের। কারণ, দেশটির পরবর্তী পর্যায়ের গ্যাস উন্নয়ন কার্যক্রম এমন এক ভূরাজনৈতিক পরিবেশে এগোবে, যেখানে ইরান গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার ও প্রতিবেশী হিসেবে থেকে যাবে।
শান্তিচুক্তি হলে দোহা খুব দ্রুতই কিছু বাস্তব সুবিধা পেতে পারে। নিরাপদে জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করা গেলে এবং পর্যাপ্ত ট্যাংকার পাওয়া গেলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি এমন উৎপাদন স্থাপনাগুলো চালু করে যুদ্ধের আগের উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ৮৩ শতাংশে ফিরে যাওয়া সম্ভব। একই সঙ্গে ক্রেতারাও আবার নির্ধারিত চালান অনুযায়ী গ্যাস পাওয়ার পরিকল্পনা করতে পারবেন। নর্থ ফিল্ড ইস্টের প্রথম উৎপাদন লাইনটি বাজারে গ্যাস সরবরাহের জন্য আরও স্পষ্ট পথ পাবে।
তবে সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্তটি নিতে হবে সেই জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে, যারা আগামী ২০ বছরের জন্য কোথা থেকে গ্যাস কিনবে, তা নির্ধারণ করছে। তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হবে, প্রথম ট্যাংকারটি হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে আসার পরও নিয়মিত গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত থাকবে কি না।
এ কারণেই কাতারের জন্য এমন একটি চুক্তি করা জরুরি, যা শুধু তাৎক্ষণিকভাবে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং দীর্ঘমেয়াদে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা ও জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তাও দেবে। কারণ, কাতারের সামনে এখন শুধু হারানো রাজস্ব পুনরুদ্ধারের চ্যালেঞ্জ নয়, বরং ভবিষ্যতের এলএনজি বাজারে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার প্রশ্নও রয়েছে।
- ডঃ উমুদ শোকরি: পিএইচডি একজন জ্যেষ্ঠ পররাষ্ট্র নীতি উপদেষ্টা, জ্বালানি কৌশলবিদ এবং গালফ স্টেট অ্যানালিটিক্স (জিএসএ)-এর একজন উপদেষ্টা। সূত্র: মিডল ইস্ট মনিটর

