ইউরোপে ২০২৫ সালের এই গ্রীষ্মটি রেকর্ড করা সবচেয়ে ভয়াবহ গরমের একটি। তাপমাত্রা অনেক জায়গায় ৪৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়েছে, যার ফলে দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে এবং হাজারো মানুষের মৃত্যু হয়েছে, বিশেষ করে বয়স্কদের মধ্যে।
লন্ডনের গ্রানথাম ইনস্টিটিউট ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড দ্য এনভায়রনমেন্টের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে—এই অতিরিক্ত মৃত্যুর প্রায় ৬৮ শতাংশই সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঘটেছে। হিসাব বলছে, এ বছর ইউরোপে গরমজনিত মোট ২৪,৪০০ জনের মৃত্যু ঘটেছে, এর মধ্যে প্রায় ১৬,৫০০ মৃত্যুর পেছনে দায়ী জলবায়ু পরিবর্তন।
মানুষসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা ক্রমেই বাড়ছে, আর তার প্রভাব পড়ছে দাবানলে। শুধু স্পেনেই এ বছর ৩৮০ হাজার হেক্টর জমি পুড়ে গেছে—যা দেশটির বার্ষিক গড় ক্ষতির চার গুণ বেশি এবং আয়তনে সিঙ্গাপুরের পাঁচ গুণ বড়। পর্তুগালে জ্বলেছে ২৮০ হাজার হেক্টর জমি, যা লুক্সেমবার্গের চেয়েও বেশি। ফ্রান্স, ইতালি, গ্রিস, আলবেনিয়া এবং তুরস্কেও ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড হয়েছে।
স্পেন ছিল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশ। আগস্টে টানা ১৬ দিনের ভয়াবহ তাপপ্রবাহে সেখানে ১,১০০ জনের বেশি মানুষ মারা যায়, সরকারি হিসাবে।
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো
গবেষণায় জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অতিরিক্ত মৃত্যুর সংখ্যা এভাবে উঠে এসেছে:
-
ইতালি – ৪,৫৯৭
-
স্পেন – ২,৮৪১
-
জার্মানি – ১,৪৭৭
-
ফ্রান্স – ১,৪৪৪
-
যুক্তরাজ্য – ১,১৪৭
-
রোমানিয়া – ১,০৬৪
-
গ্রিস – ৮০৮
-
বুলগেরিয়া – ৫৫২
-
ক্রোয়েশিয়া – ২৬৮
রাজধানীগুলোতে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে রোম (৮৩৫), এথেন্স (৬৩০) এবং প্যারিসে (৪০৯)।
কেন এত মৃত্যু?
শহরগুলোতে কংক্রিট ও অ্যাসফল্টের আধিক্য গরমকে আটকে রাখে। যানবাহন ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের তাপও যুক্ত হয়ে শহুরে তাপমাত্রাকে আরও ভয়াবহ করে তোলে।
এ বছরের আগস্টে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে তৈরি হয়েছিল ভয়াবহ “হিট ডোম” ও “হিট প্লুম”, যা উত্তর আফ্রিকা ও আইবেরিয়ান উপদ্বীপ থেকে গরম বাতাস টেনে এনে ইউরোপের গ্রীষ্মকে আরও তীব্র করে তোলে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বদের মধ্যে মৃত্যু হার সবচেয়ে বেশি—মোট মৃত্যুর ৮৫ শতাংশ। বয়সজনিত রোগ ও দূষণের প্রভাব গরমে তাদের আরও বেশি ঝুঁকিতে ফেলে।
গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, এই পরিসংখ্যান আসলে কেবল এক-তৃতীয়াংশ ইউরোপীয় জনসংখ্যার তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। বাস্তবে মৃত্যুর সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে। সরকারি হিসাব সাধারণত মাসের পর মাস পরে প্রকাশিত হয়, অনেক সময় প্রকাশই পায় না।
গবেষকদের ভাষায়, “অতিরিক্ত তাপ হলো নীরব ঘাতক।”
বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন—শহরে আরও বেশি সবুজ (গাছপালা, পার্ক, ছাদবাগান) এবং নীল (হ্রদ, নদী, জলাধার) জায়গা তৈরি করতে হবে। এগুলো গরমের সময়ে মানুষকে আশ্রয় দেওয়ার মতো ঠান্ডা পরিবেশ তৈরি করে।
এ ছাড়া সময়মতো সতর্কতা জারি, কাজের সময় ও জীবনযাত্রার ধরনে সাময়িক পরিবর্তন, এবং কার্যকর “হিট-হেলথ অ্যাকশন প্ল্যান” নেওয়া জরুরি। এতে গরমের সময়ে কে কী দায়িত্ব নেবে তা স্পষ্ট থাকবে এবং দীর্ঘমেয়াদে মানুষকে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হবে।

