মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাব এবার সরাসরি পড়তে যাচ্ছে বৈশ্বিক পণ্যবাজারে। বিশ্বব্যাংকের নতুন পূর্বাভাস বলছে, ২০২৬ সালে বিশ্ববাজারে সামগ্রিক পণ্যমূল্য গড়ে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাপ তৈরি হবে জ্বালানি, সার ও শিল্পে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ ধাতুর বাজারে।
আজ মঙ্গলবার ওয়াশিংটন থেকে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ‘কমোডিটি মার্কেটস আউটলুক’ প্রতিবেদনে এই আশঙ্কার কথা জানানো হয়। সংস্থাটি বলছে, যুদ্ধ ঘিরে তৈরি হওয়া অস্থিরতায় জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। এর প্রভাব ইতোমধ্যে বিশ্ববাজারে পড়তে শুরু করেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালে জ্বালানির দাম প্রায় ২৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর এবারই সবচেয়ে বড় মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন এবং জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলার কারণে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ বড় ধাক্কায় পড়েছে।
বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, বিশ্বে সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৩৫ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যায়। সাম্প্রতিক সংকটের কারণে বিশ্বে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ব্যারেল তেলের সরবরাহ কমে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, চলতি বছরের এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বছরের শুরুর তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি ছিল। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের গড় দাম ৮৬ ডলারে পৌঁছাতে পারে। গত বছর যা ছিল ৬৯ ডলার।
তবে সংস্থাটি মনে করছে, মে মাসের মধ্যে বড় ধরনের সরবরাহ সংকট কিছুটা কমে আসতে পারে এবং ২০২৬ সালের শেষ দিকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হতে পারে। এই হিসাব ধরেই বর্তমান পূর্বাভাস তৈরি করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, যুদ্ধ আরও দীর্ঘ হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। সে ক্ষেত্রে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৫ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এর প্রভাব পড়বে সার, বিদ্যুৎ এবং বিকল্প জ্বালানির বাজারেও।
বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ও ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিক্স বিভাগের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ইন্দরমিত গিল বলেন, যুদ্ধের প্রভাব ধাপে ধাপে পুরো বিশ্ব অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দিচ্ছে। প্রথমে জ্বালানির দাম বাড়ছে, এরপর খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ছে এবং শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। এতে সুদের হারও বাড়বে এবং ঋণ আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে।
তিনি আরও বলেন, এর সবচেয়ে বড় চাপ পড়বে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর। কারণ তাদের আয়ের বড় অংশই খাদ্য ও জ্বালানি খাতে ব্যয় হয়। একই সঙ্গে ঋণের চাপে থাকা উন্নয়নশীল দেশগুলোও বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপে পড়বে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালে সারের দাম গড়ে ৩১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। এর মধ্যে ইউরিয়া সারের দাম ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং ভবিষ্যতে খাদ্য উৎপাদনও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির তথ্য তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলমান সংঘাত দীর্ঘ হলে আরও প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য সংকটে পড়তে পারে।
অন্যদিকে অ্যালুমিনিয়াম, তামা ও টিনের মতো শিল্পে ব্যবহৃত ধাতুর দামও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। ডেটা সেন্টার, বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে চাহিদা বাড়ায় এসব ধাতুর বাজারে নতুন চাপ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তায় নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের চাহিদাও বাড়ছে। ফলে মূল্যবান ধাতুর গড় দাম ৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংক আরও বলছে, মূল্যবৃদ্ধির কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতি বাড়বে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাবে। ২০২৬ সালে এসব দেশে গড় মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। একই সময়ে উন্নয়নশীল অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি নেমে আসতে পারে ৩ দশমিক ৬ শতাংশে।

