রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ময়দানে হঠাৎ করেই পাল্টে গেছে দৃশ্যপট। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিরক্ষার অবস্থানে থাকা কিয়েভ এখন ক্রমে আক্রমণাত্মক কৌশল গ্রহণ করছে। আর এর পেছনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান বদল বড় ভূমিকা রেখেছে।
সম্প্রতি নিউইয়র্কে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ও ট্রাম্পের মধ্যে একান্ত বৈঠক হয়েছে। বৈঠক শেষে ট্রাম্প প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন— “ইউক্রেন এখন যুদ্ধ জেতার অবস্থানে রয়েছে।” একসময় যে জেলেনস্কিকে তিনি অসহায় নেতা ভেবেছিলেন, সেই নেতাই এবার তাকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে “ভালো খবর” শুনিয়েছেন।

যুদ্ধক্ষেত্রের পাল্টা হাওয়া
রাশিয়া গত কয়েক মাস ধরে প্রতিদিন গড়ে এক হাজারের মতো সৈন্য হারাচ্ছে— এমন দাবি ইউক্রেনের। পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও বলছে, ফেব্রুয়ারি ২০২২ থেকে শুরু হওয়া পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসনে এখন পর্যন্ত রাশিয়ার ক্ষয়ক্ষতির সংখ্যা এক মিলিয়নেরও বেশি। অথচ এত প্রাণহানির বিনিময়ে রাশিয়া এ বছর ইউক্রেনের মাত্র অর্ধ শতাংশ এলাকা দখল করতে পেরেছে।
ডোনেৎস্কের পোকরভস্ক শহরের দিকে রাশিয়ার আকস্মিক অগ্রযাত্রা কিছুদিনের জন্য কিয়েভকে চাপে ফেলেছিল। কিন্তু ইউক্রেনের বিশেষ বাহিনী পাল্টা আক্রমণে তা ঠেকিয়ে দেয়। জেলেনস্কি ট্রাম্পকে জানালেন, তার বাহিনী অন্তত এক হাজার রুশ সেনাকে ঘিরে ফেলেছে। যদিও জায়গাটির নাম প্রকাশ করেননি, তবে ধারণা করা হচ্ছে দোব্রোপিলিয়া দিকের অভিযানকেই ইঙ্গিত করেছেন তিনি।
ইউক্রেনের যুদ্ধ পর্যবেক্ষক প্ল্যাটফর্ম ডিপস্টেট মানচিত্রে নতুন অগ্রগতি দেখিয়েছে। খুচরিভ ইয়ার গ্রামের কাছে একটি বড় রুশ ঘাঁটি এখন চারদিকে ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে। কাছাকাছি নিকানোরিভকাও মুক্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। শুধু সেপ্টেম্বর মাসেই ইউক্রেন ২২৪ বর্গমাইল এলাকা মুক্ত করেছে।

রাশিয়ার জ্বালানি খাতে বড় ধাক্কা
ফ্রন্টলাইনের যুদ্ধের বাইরে ইউক্রেন এখন রাশিয়ার অর্থনীতির মূল ভিত্তি—তেল শোধনাগারগুলোকে লক্ষ্য করছে। আগস্ট থেকে অন্তত ১৬টি রুশ রিফাইনারিতে হামলা হয়েছে। এতে প্রতিদিন এক মিলিয়ন ব্যারেল তেল প্রক্রিয়াজাত ক্ষমতা ব্যাহত হচ্ছে।
ফলাফল স্পষ্ট—রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। ক্রিমিয়া, দূরপ্রাচ্য ও ভলগা নদী অঞ্চলে প্রথমে ঘাটতি দেখা দেয়। পরে মস্কো-সেন্ট পিটার্সবার্গ মহাসড়ক পর্যন্ত দীর্ঘ সারির ছবি ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক মাধ্যমে। অনেক জায়গায় পাম্প বন্ধ, আবার কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরও গাড়িচালকরা জ্বালানি পাচ্ছেন না।
এই চাপ কেবল অর্থনীতিকে দুর্বল করছে না, বরং জনঅসন্তোষও বাড়াচ্ছে। কিয়েভ বিশ্বাস করছে—এমন পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত পুতিনকে আলোচনার টেবিলে আসতে বাধ্য করবে।

ট্রাম্পের ভূমিকায় কূটনৈতিক পালাবদল
রাশিয়ার তেল রপ্তানি নিয়ন্ত্রণে ট্রাম্প নিজেই সক্রিয় হয়েছেন। ভারত সস্তা রুশ তেল কিনছে বলে দেশটিকে অতিরিক্ত শুল্কে চাপ দিয়েছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নও দ্রুত রুশ জ্বালানি আমদানি বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে হোয়াইট হাউসের চাপে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে এটি নিজের কৌশলের সফলতার প্রমাণ। তার সন্তুষ্টিই ইউক্রেন ও ইউরোপের জন্য সুখবর। কারণ আমেরিকার হাতে থাকা প্যাট্রিয়ট এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম বা হিমারস রকেট লঞ্চারের মতো অস্ত্র কিয়েভের জন্য জীবনরক্ষার সমান। ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটে ইতোমধ্যে ট্রাম্পকে রাজি করিয়েছেন ইউরোপীয় অর্থায়নে এসব সরবরাহ অব্যাহত রাখতে। ইউরোপীয় দেশগুলো প্রায় দুই বিলিয়ন ডলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা বাড়তে বাড়তে ৯০ বিলিয়ন পর্যন্ত যেতে পারে বলে আশা জেলেনস্কির।
রাশিয়ার অর্থনীতির পতন
রাশিয়ার অর্থনীতি ক্রমেই সংকটে ডুবে যাচ্ছে। রুবলের মান এখনো যুদ্ধ-পূর্ব অবস্থায় ফিরতে পারেনি। সরকারি হিসেবে জিডিপি প্রবৃদ্ধি এ বছর নামিয়ে আনা হয়েছে ১ শতাংশে। বাজেট ঘাটতি ৫০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা রপ্তানি কমার কারণে আরও বাড়বে।
অন্যদিকে, ইউক্রেন নিজস্ব অস্ত্র উৎপাদনে জোর দিচ্ছে। ড্রোন উৎপাদনে তারা দ্রুত অগ্রগতি করেছে। এমনকি দেশীয়ভাবে তৈরি ফ্লেমিংগো নামের ক্রুজ মিসাইলও পরীক্ষাধীন, যা কাগজে-কলমে ১,৮০০ মাইল পর্যন্ত উড়তে সক্ষম।
সমীকরণ বদলাচ্ছে
কিছুদিন আগেও ট্রাম্প জেলেনস্কিকে বলেছিলেন—“তোমার হাতে কোনো কার্ড নেই।” কিন্তু বাস্তবতা বদলেছে। ছোট ছোট সাফল্য, রাশিয়ার অর্থনৈতিক চাপ, ইউক্রেনের নতুন কৌশল আর ট্রাম্পের সমর্থন—সব মিলে কিয়েভের হাতে এখন অনেক শক্তিশালী অবস্থান।
যুদ্ধের শেষ ফলাফল এখনও অজানা। তবে এক জিনিস স্পষ্ট—সময় ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা পেলে ইউক্রেন হয়তো এবার সত্যিই খেলার নিয়ম পাল্টে দিতে পারবে।

