ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ বিশ্বব্যাপী তার সাফল্য, দক্ষতা এবং কখনও কখনও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য পরিচিত। তাদের অভিযানের ধরন নানা—সফল অপহরণ, গোপনীয় তৎপরতা, লক্ষ্যবস্তু হত্যাযজ্ঞ এবং কখনও কখনও ব্যর্থতা যা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করে।
সাম্প্রতিক সময়ে লেবাননের হেজবুল্লাহ সদস্যদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের অভিযানের খবর সামনে এসেছে। জানা গেছে, হেজবুল্লাহর সদস্যরা যেসব তারহীন যোগাযোগের যন্ত্র যেমন পেজার ব্যবহার করেন, মোসাদ তাৎপর্যপূর্ণভাবে তা ব্যবহার করে বিস্ফোরক হামলা চালিয়েছে। এই আধুনিক নজরদারি পদ্ধতি ব্যবহার করে বহু মানুষকে হত্যা করা হয়েছে এবং কয়েক হাজার লোক আহত হয়েছেন। লেবাননের সরকার ইসরায়েলকে এই হামলার দায়ী করে ‘অপরাধমূলক আগ্রাসন’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। হেজবুল্লাহ পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, হামলাটি ছিল ‘ন্যায্য প্রতিশোধ’।

ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি। তবে কিছু গণমাধ্যম জানিয়েছে, মন্ত্রিসভার নির্দেশে দেশটির মন্ত্রীরা এ ঘটনায় মন্তব্য না করার জন্য সতর্ক করা হয়েছে। এই ঘটনা ইঙ্গিত দেয় যে, মোসাদ হেজবুল্লাহর কর্মকাণ্ডের ওপর নজর রাখছে এবং এটি চলমান সংঘর্ষের অংশ হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি এই হামলায় ইসরায়েল সত্যিই দায়ী হয়, তাহলে এটি তাদের সবচেয়ে বিস্ময়কর এবং প্রভাবশালী অভিযানের একটি হিসেবেই বিবেচিত হবে। একই সঙ্গে এটি মোসাদের অতীত সফল ও জটিল অভিযানগুলোর স্মৃতি উদ্দীপিত করে।

মোসাদের অতীতের গুরুত্বপূর্ণ অভিযান-
নাৎসি অফিসার অ্যাডলফ আইকম্যানের অপহরণ:
১৯৬০ সালে আর্জেন্টিনায় নাৎসি অফিসার অ্যাডলফ আইকম্যানকে অপহরণ করা মোসাদের অন্যতম সাফল্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রায় ৬০ লক্ষ ইহুদি হত্যা করা হয়েছিল এবং আইকম্যান ‘হলোকাস্ট’-এর প্রধান স্থপতিদের একজন ছিলেন।
অপহরণের আগে তিনি ধরা পড়ার সম্ভাবনা এড়িয়ে নানা দেশে আশ্রয় নিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনায় অবস্থান করতে শুরু করলে ১৪ জন মোসাদ এজেন্টের দল তাকে খুঁজে বের করে ইসরায়েলে নিয়ে আসে। সেখানে আইকম্যানের বিচার অনুষ্ঠিত হয় এবং তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। এই অভিযান কেবল মোসাদের দক্ষতা নয়, বরং আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের প্রতীক হিসেবেও দেখা হয়।

এন্টাবি অভিযান:
উগান্ডার এন্টাবি অভিযানকে ইসরায়েলের সবচেয়ে সফল সামরিক অভিযান বলা হয়। ১৯৭৬ সালে ‘পপুলার ফ্রন্ট ফর দ্য লিবারেশন অফ প্যালেস্টাইন’-এর দুই সদস্য এবং তাদের দুই জার্মান সহযোগী একটি প্যারিসগামী বিমান হাইজ্যাক করে। বিমানে প্রায় ২৫০ যাত্রী ছিল, যার মধ্যে ১০৩ জন ইসরায়েলি।
মোসাদ গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করে এবং ইসরায়েলি কমান্ডো বাহিনী অভিযান চালিয়ে বিমানটিকে উগান্ডায় পৌঁছানোর পর ১০০ জন জিম্মিকে সফলভাবে উদ্ধার করে। এ ঘটনায় তিনজন জিম্মি, বিমানের হাইজ্যাকার, কয়েকজন উগান্ডার সৈন্য এবং ইসরায়েলের বিশেষ বাহিনীর কর্মকর্তা ইয়োনাতান নেতানিয়াহুর মৃত্যু হয়। এন্টাবি অভিযান মোসাদের পরিকল্পনা ও সামরিক কৌশলের এক অনন্য উদাহরণ।

‘অপারেশন ব্রাদার্স’:
১৯৮০-এর দশকের গোড়ার দিকে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মেনাহেম বেগিনের নির্দেশে মোসাদ সুদানে ৭০০০ এরও বেশি ইথিওপিয়ান ইহুদিকে ইসরায়েলে গোপনে পাচার করে। এ অভিযানের জন্য একটি নকল ডাইভিং রিসোর্ট স্থাপন করা হয়, যা গুপ্ত ঘাঁটির কাজ করত।
এজেন্টরা দিনব্যাপী হোটেলের কর্মীর ছদ্মবেশ ধারণ করতেন এবং রাতের অন্ধকারে ইথিওপিয়ান ইহুদিদের ইসরায়েলে নিয়ে যেতেন। এই অভিযান কমপক্ষে পাঁচ বছর ধরে চলেছিল। পরে যখন তথ্য প্রকাশ্যে আসে, মোসাদ এজেন্টরা সুদান থেকে নিরাপদে সরে আসে।

মিউনিখ অলিম্পিকস অপহরণ:
১৯৭২ সালের মিউনিখ অলিম্পিকসে ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী ‘ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর’ ইসরায়েলি দলের দুই সদস্যকে হত্যা করে এবং নয়জনকে বন্দী করে। পশ্চিম জার্মান পুলিশের ব্যর্থ উদ্ধার অভিযান পরবর্তীতে জিম্মিদের হত্যার দিকে নিয়ে যায়।
মোসাদ এরপর ‘প্যালেস্টিনিয়ান লিবারেশন অর্গানাইজেশন’-এর একাধিক সদস্যকে নিশানা করে। মাহমুদ হামশারিকে প্যারিসে একটি অ্যাপার্টমেন্টে বিস্ফোরক বসিয়ে হত্যা করা হয়। হামলার ফলে গুরুতর আহত হন তিনি, এক পা হারান এবং পরে মৃত্যুবরণ করেন।

ইয়াহিয়া আয়াশ:
১৯৯৬ সালে হামাসের বোমা প্রস্তুতকারক ইয়াহিয়া আয়াশকে মোবাইল ফোনে ৫০ গ্রাম বিস্ফোরক বসিয়ে হত্যা করা হয়। ইয়াহিয়া হামাসের সামরিক শাখার প্রধান নেতা ছিলেন। এই হত্যাকাণ্ড মোসাদের উচ্চ প্রযুক্তির ব্যবহার এবং লক্ষ্যবস্তুনির্ধারণের ক্ষমতার পরিচায়ক।

মাহমুদ আল-মাভুহ হত্যা:
২০১০ সালে হামাসের সিনিয়র নেতা মাহমুদ আল-মাভুহকে দুবাইয়ে একটি হোটেলে হত্যা করা হয়। প্রাথমিকভাবে স্বাভাবিক মৃত্যু মনে হলেও ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনায় হত্যাকারী দল সনাক্ত করা হয়। পদ্ধতিটি বৈদ্যুতিক শক এবং শ্বাসরোধের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। এ ঘটনায় সংযুক্ত আরব আমিরাত কূটনৈতিকভাবে ক্ষুব্ধ হয়, তবে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ তাদের ‘অস্পষ্টতা’ বজায় রাখে।
ব্যর্থ অভিযান-
মোসাদের সব অভিযান সফল হয়নি। কিছু বড় ব্যর্থতার মধ্যে উল্লেখযোগ্য:

খালেদ মেশাল হত্যার ব্যর্থ চেষ্টার ঘটনা:
১৯৯৭ সালে হামাসের নেতা খালেদ মেশালকে জর্ডানে বিষ প্রয়োগ করে হত্যা করার চেষ্টা ব্যর্থ হয়। এ ঘটনায় ইসরায়েলকে প্রতিষেধক সরবরাহ করতে বাধ্য করা হয়। এই ব্যর্থতার কারণে জর্ডান ও ইসরায়েলের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
হামাস নেতা মাহমুদ আল-জাহারকে লক্ষ্য করে বিমান হামলা:
২০০৩ সালে গাজায় মাহমুদ আল-জাহারের বাসভবন ধ্বংস করা হয়। যদিও আল-জাহার রক্ষা পায়, তার স্ত্রী, সন্তানসহ কয়েকজন নিহত হন। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সামরিক কার্যক্রমের বিপদ স্পষ্ট হয়।

‘লাভন অ্যাফেয়ার’:
১৯৫৪ সালে মিশরে ‘অপারেশন সুসানাহ’ ব্যর্থ হয়। লক্ষ্য ছিল যুক্তরাজ্য ও আমেরিকার স্থাপনায় বোমা ফেলা। এই পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ায় ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিনহাস লাভনের নাম এই ঘটনার সাথে যুক্ত করা হয়।
ইয়োম কিপ্পুর যুদ্ধ:
১৯৭৩ সালে মিশর ও সিরিয়া আক্রমণ চালালে ইসরায়েল প্রস্তুত ছিল না। দুই ফ্রন্টে আক্রমণের কারণে প্রাথমিকভাবে অনেক ক্ষতি হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরবরাহে সাহায্য করলেও যুদ্ধ চূড়ান্তভাবে ২৫ অক্টোবর শেষ হয়।

সাতই অক্টোবর ২০২৩-এর হামলা:
৫০ বছর পর, ৭ই অক্টোবর ২০২৩-এ হামাসের আকস্মিক আক্রমণে ইসরায়েল সমস্যায় পড়ে। হামলার ফলে প্রায় ১২০০ জন নিহত হয়, যাদের বেশিরভাগই বেসামরিক নাগরিক। আরও ২৫১ জনকে জিম্মি করে গাজায় নেওয়া হয়। ইসরায়েলের প্রতিরোধ ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ পায় এবং সংঘাতের মাত্রা বাড়ে, যার ফলে ৪০,০০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়।
মোসাদের ইতিহাসে সফল ও ব্যর্থ অভিযানগুলোর এই সংকলন প্রমাণ করে, ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা প্রতিরক্ষা, প্রতিশোধ এবং কূটনৈতিক প্রভাব বজায় রাখতে কতটা জটিল ও নির্ভুল কার্যক্রম চালাতে পারে। এই সংস্থা কেবল হত্যাকাণ্ড বা অপহরণে সীমাবদ্ধ নয়, বরং আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করে।

