জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনে (ইউএনজিএ) গত এক সপ্তাহ ধরে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল গাজা ও ফিলিস্তিন। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা রাষ্ট্রপ্রধানরা বক্তৃতায়, নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে, পাশ্বচরিত অনুষ্ঠানে কিংবা সংবাদ সম্মেলনে ইসরায়েলের আগ্রাসন বন্ধ ও একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি তুলেছেন।
কিন্তু নিউইয়র্কে এই সব উচ্চকিত বক্তব্যের মাঝেই গাজায় ইসরায়েলি সেনাদের বোমা ও গুলি চলছেই। জাতিসংঘ অধিবেশনের সপ্তাহেই নিহত হয়েছেন অন্তত ৬৬১ জন ফিলিস্তিনি, ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে গাজার প্রধান নগরী।
বিশ্লেষকরা বলছেন—কেবল বক্তব্য বা কূটনৈতিক প্রতীকী পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। অনেক দেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিলেও, বাস্তবে ফিলিস্তিনিদের জীবনে কোনো সুরক্ষা আসছে না। মানবাধিকারকর্মীরা তাই এখন ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দাবি করছেন।
অস্ত্রের প্রবাহ বন্ধ না হলে পরিবর্তন অসম্ভব
হেগ গ্রুপ নামে একটি দেশগুলোর জোটের নির্বাহী কর্মকর্তা বর্ষা গান্ডিকোটা-নেলুতলা বলেন, “পরিস্থিতি প্রতিদিন খারাপ হচ্ছে, কারণ ইসরায়েল এখনও অবাধে অস্ত্র পাচ্ছে। গণহত্যার যন্ত্রের অর্থনৈতিক শক্তি দুর্বল হয়নি। বরং তা প্রতিদিন আরও বাড়ছে।”
এই হেগ গ্রুপের বৈঠকে লাতিন আমেরিকা, ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশ একসঙ্গে বসে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে জ্বালানি নিষেধাজ্ঞা ও অস্ত্র সরবরাহ বন্ধের মতো পদক্ষেপের প্রস্তাব আলোচনা করেছে।
ফিলিস্তিন স্বীকৃতি: প্রতীক নাকি বাস্তব?
জাতিসংঘ অধিবেশনে অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের মতো পশ্চিমা দেশগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে। একদিকে এটি ফিলিস্তিনিদের জন্য দীর্ঘ সংগ্রামের প্রতীকী বিজয় হলেও, অন্যদিকে অনেকেই বলছেন এই স্বীকৃতির পরেই দেশগুলো থেমে যাবে কিনা, সেটাই বড় প্রশ্ন।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দফতরের বাইরে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া মামুন হোসেইন বলছিলেন, “৭৮ বছরের গণহত্যা ও জাতিগত নিপীড়নের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনি জনগণের দৃঢ়তা আজ বিশ্বকে ফিলিস্তিন স্বীকৃতিতে বাধ্য করেছে। কিন্তু শুধু স্বীকৃতি দিলে হবে না, তাদের হাতে ক্ষমতা আছে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার, চাপ সৃষ্টির। অথচ সেটা করছে না কেউ।”
আগ্রাসনের বিস্তার: গাজা থেকে লেবানন ও ইরান পর্যন্ত
গাজায় গণহত্যা চালানোর পাশাপাশি ইসরায়েল পশ্চিম তীর দখল আরও বাড়িয়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন, কাতার এমনকি ইরানেও হামলা চালিয়েছে। টিউনিশিয়ার একটি বন্দর থেকে গাজায় যাওয়ার পথে একটি মানবিক সাহায্যবাহী জাহাজে হামলার জন্যও ইসরায়েলকেই সন্দেহ করা হচ্ছে।
আলজেরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আহমেদ আত্তাফ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের এক বৈঠকে স্পষ্ট করে বলেন, “গাজায় যা চলছে, তা একটি পূর্ণাঙ্গ ধ্বংসযুদ্ধ। আন্তর্জাতিক সমাজ যদি ইসরায়েলকে থামাতে ব্যর্থ হয়, তাহলে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতাই বিপন্ন হবে।”
‘এখনও আমরা সেখানে পৌঁছাইনি’
জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএর প্রধান ফিলিপ লাজারিনি জানিয়েছেন, নিউইয়র্কে প্রচুর সমর্থন ও নিন্দা শোনা যাচ্ছে, কিন্তু সেটি গাজার মাটিতে বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারছে না। তাঁর ভাষায়, “আসল প্রশ্ন হলো—কীভাবে এই বক্তব্যগুলো বাস্তবে প্রভাব ফেলবে? আমরা এখনও সেখানে পৌঁছাতে পারিনি।”
তিনি আরও বলেন, গাজার সংকট এত ভয়াবহ হয়ে উঠেছে মূলত ইসরায়েলের দীর্ঘস্থায়ী দোষমুক্তি এবং ফিলিস্তিনিদের জীবনের অবমূল্যায়নের কারণে।
নিন্দার বহিঃপ্রকাশ
শুক্রবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জাতিসংঘের মঞ্চে উঠতেই ৫০টিরও বেশি দেশের প্রতিনিধিরা হল ত্যাগ করেন। একই সময়ে ৩৪ দেশের প্রতিনিধিরা হেগ গ্রুপ বৈঠকে বসে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য নতুন পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করেন।
গান্ডিকোটা-নেলুতলার মতে, “যতক্ষণ না আন্তর্জাতিকভাবে সমন্বিত উদ্যোগে ইসরায়েলের অস্ত্র ও সম্পদের যোগান বন্ধ করা যায়, ততক্ষণ কোনো পরিবর্তন আসবে না। আমাদের লক্ষ্য হলো—দেশে দেশে এই আন্দোলন ছড়িয়ে দেওয়া, যতক্ষণ না ইসরায়েলের কাছে মৃত্যুর অস্ত্র পৌঁছানো সম্পূর্ণ অসম্ভব হয়ে পড়ে।”

