মানুষ ভুল করে। এটি নতুন কোনো কথা নয়। কিন্তু রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে থাকা একজন মানুষের ভুল সাধারণ মানুষের ভুলের মতো নয়। একজন সাধারণ মানুষের ভুল হয়তো তার নিজের পরিবার, কাজ বা ব্যক্তিগত জীবনে প্রভাব ফেলে। কিন্তু একজন রাষ্ট্রপ্রধানের ভুল লাখ লাখ মানুষের জীবন, অর্থনীতি, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎকে নাড়িয়ে দিতে পারে। এ কারণেই গণতন্ত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে আলোচনা, জবাবদিহি, আইনসভা, বিচারব্যবস্থা এবং মতবিরোধের জায়গা রাখা হয়। ক্ষমতা যদি একজন মানুষের ইচ্ছার ওপর দাঁড়িয়ে যায়, তখন ভুল শুধু ভুল থাকে না; তা বিপর্যয়ে পরিণত হয়।
জোসেফ ই. স্টিগলিটজের বিশ্লেষণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এমন এক নেতা হিসেবে দেখানো হয়েছে, যিনি নিজের সিদ্ধান্তকে প্রায় প্রশ্নাতীত ক্ষমতার মতো ব্যবহার করছেন। তাঁর মতে, ট্রাম্প নিজেকে যেন একচ্ছত্র শাসকের জায়গায় কল্পনা করছেন। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্র কোনো রাজদরবার নয়। এখানে যুদ্ধ, করনীতি, বাণিজ্য, জ্বালানি, অভিবাসন বা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক—কোনোটাই ব্যক্তিগত খেয়ালের বিষয় হতে পারে না। এসব সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের জীবন, বাজারের স্থিতি, খাদ্যব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক আস্থা।
সবচেয়ে গুরুতর বিষয় হলো যুদ্ধ। কোনো দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করা রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্তগুলোর একটি। অথচ স্টিগলিটজের বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে এমন এক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে, যেখানে যথাযথ জবাবদিহি, চিন্তাভাবনা এবং ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রতি সম্মান দেখানো হয়নি। এর ফল ইতিমধ্যে ভয়াবহ। হাজারো মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, যাদের বড় অংশই সাধারণ বেসামরিক মানুষ। যুদ্ধক্ষেত্রে শুধু সৈন্য মারা যায় না; মারা যায় শিশু, নারী, শ্রমিক, চিকিৎসক, কৃষক এবং এমন মানুষ, যাদের রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই।
এই যুদ্ধ কতদিন চলবে, তা কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারে না। আরও কত মানুষ মারা যাবে, কত অবকাঠামো ধ্বংস হবে, কত পরিবার ভেঙে যাবে—এসবও অনিশ্চিত। কিন্তু অনিশ্চয়তার মধ্যেও একটি বিষয় স্পষ্ট: যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, ক্ষতি তত গভীর হবে। যুদ্ধের তাৎক্ষণিক মূল্য আছে, আবার দীর্ঘমেয়াদি মূল্যও আছে। তাৎক্ষণিক মূল্য হলো মৃত্যু, ধ্বংস ও আতঙ্ক। দীর্ঘমেয়াদি মূল্য হলো মূল্যস্ফীতি, সরবরাহব্যবস্থার ভাঙন, জ্বালানির অস্থিরতা এবং মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি।
স্টিগলিটজ বিশেষভাবে অর্থনৈতিক দিকটি সামনে এনেছেন। তাঁর মতে, ইরানকে ঘিরে এই সংঘাত শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সমস্যা নয়। এটি যুক্তরাষ্ট্র ও বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। কারণ আধুনিক অর্থনীতি একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এক অঞ্চলে যুদ্ধ শুরু হলে তার প্রভাব অন্য অঞ্চলের বাজার, জ্বালানি, খাদ্য, সার, পরিবহন এবং বিনিয়োগে পড়ে। তেল ও গ্যাস উৎপাদনকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার ধাক্কা শুধু উৎপাদক দেশে লাগে না; তা ভোক্তা দেশেও পৌঁছে যায়।
তেলের বাজার বিশেষভাবে সংবেদনশীল। ট্রাম্পের সমর্থকেরা হয়তো বলতে পারেন, যুক্তরাষ্ট্র নিজেই তেল উৎপাদন করে, তাই এ সংকটে তারা লাভবান হতে পারে। কিন্তু স্টিগলিটজ এই যুক্তিকে দুর্বল বলে মনে করেন। কারণ তেলের দাম স্থানীয়ভাবে নয়, বৈশ্বিক বাজারে নির্ধারিত হয়। তেল উৎপাদনকারী কিছু বড় কোম্পানি লাভ করতে পারে, কিন্তু সাধারণ মানুষকে বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হয়। পরিবহন খরচ বাড়ে। পণ্য পরিবহনের ব্যয় বাড়ে। শেষে বাজারে খাবার, বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ, ঋণ—সবকিছুর ওপর চাপ পড়ে।
এখানে আরেকটি বড় বিষয় হলো সার উৎপাদন। ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকটের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির একটি পার্থক্য স্টিগলিটজ তুলে ধরেছেন। তখন মূল আঘাত ছিল তেল সরবরাহে। এখন শুধু তেল বা গ্যাস নয়, বৈশ্বিক খাদ্যব্যবস্থার জন্য জরুরি সার উৎপাদনও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। সার উৎপাদন ব্যাহত হলে কৃষি খরচ বাড়বে। কৃষি খরচ বাড়লে খাদ্যের দাম বাড়বে। খাদ্যের দাম বাড়লে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ। অর্থাৎ যুদ্ধের অভিঘাত শেষ পর্যন্ত রান্নাঘর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
এই সংকট এমন সময় এসেছে, যখন বিশ্ব অর্থনীতি আগেই বহু ধাক্কা খেয়েছে। করোনা মহামারি, রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যব্যবস্থার টানাপোড়েন এবং ট্রাম্পের শুল্কনীতি বিশ্ববাজারকে অস্থির করে রেখেছে। এসব ঘটনার ফলে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। অনেক দেশে মানুষ আগেই জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে চাপে ছিল। তার ওপর নতুন যুদ্ধ আরও চাপ তৈরি করছে।
ট্রাম্প আবার ক্ষমতায় আসার আগে মূল্যস্ফীতি কমার পথে ছিল, যদিও তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর পছন্দের ২% লক্ষ্যমাত্রার ওপরে ছিল। কিন্তু শুল্কনীতি সেই কমার গতি ধীর করেছে। এরপর যুদ্ধ ও জ্বালানি অস্থিরতা মূল্যস্ফীতিকে আবার উসকে দিতে পারে। মূল্যস্ফীতি বাড়লে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সাধারণত সুদের হার বাড়ায়, অথবা সুদের হার কমানোর গতি কমিয়ে দেয়। এতে ঋণ আরও ব্যয়বহুল হয়। বাড়ি কেনা কঠিন হয়। ঋণের কিস্তি বাড়ে। ক্রেডিট কার্ডের দেনা শোধ করাও অনেকের জন্য কঠিন হয়ে ওঠে।
এটি শুধু অর্থনীতির পরিসংখ্যানের বিষয় নয়। এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বিষয়। একজন তরুণ পরিবার গড়তে চাইছে, কিন্তু বাড়ি কিনতে পারছে না। একজন শ্রমজীবী মানুষ বাজারে গিয়ে দেখছে আগের টাকায় আগের মতো পণ্য কেনা যাচ্ছে না। একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী দেখছে জ্বালানি, ভাড়া ও ঋণের খরচ বেড়ে গেছে। অর্থনীতির বড় সিদ্ধান্তগুলো শেষ পর্যন্ত মানুষের ছোট ছোট জীবনে বড় চাপ তৈরি করে।
স্টিগলিটজ আরও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি এমনিতেই ট্রাম্পের বাণিজ্য, অভিবাসন এবং রাজস্বনীতির অস্থিরতায় চাপে আছে। তাঁর মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক তথ্যকেন্দ্রে বিপুল বিনিয়োগ না থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবৃদ্ধি আরও দুর্বল দেখাত। তিনি উল্লেখ করেছেন, এ খাত যুক্তরাষ্ট্রের প্রবৃদ্ধির প্রায় এক-তৃতীয়াংশে ভূমিকা রাখছে। কিন্তু এটিও স্থায়ী নিশ্চয়তা নয়। প্রযুক্তি খাতে অতিরিক্ত উত্তেজনা কখনো কখনো বুদ্বুদের মতো ফুলে ওঠে, পরে ভেঙেও পড়ে। ফলে একদিকে যুদ্ধ ও মূল্যস্ফীতি, অন্যদিকে প্রযুক্তি খাতের অনিশ্চয়তা—দুটিই অর্থনীতিকে ঝুঁকির মধ্যে রাখছে।
ট্রাম্পের করনীতিকেও স্টিগলিটজ কঠোরভাবে সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, ধনকুবের ও বড় করপোরেশনের জন্য করছাড় যুক্তরাষ্ট্রের রাজস্বক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। সংকটের সময়ে রাষ্ট্রের হাতে যদি পর্যাপ্ত অর্থ না থাকে, তাহলে মানুষের জন্য সহায়তা দেওয়া, বাজার স্থিতিশীল রাখা, কর্মসংস্থান রক্ষা করা এবং অবকাঠামো পুনর্গঠন করা কঠিন হয়। অর্থাৎ সরকার যখন আগেই ধনীদের সুবিধা দিয়ে রাজস্ব কমিয়ে ফেলে, তখন সাধারণ মানুষের সংকটে কার্যকর সহায়তা দেওয়ার ক্ষমতাও দুর্বল হয়ে যায়।
ইউরোপও এই সংকটের বাইরে নয়। যুক্তরাষ্ট্রের পুরোনো মিত্র দেশগুলো জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহঘাটতির কারণে চাপের মুখে পড়তে পারে। ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুর সময় ইউরোপে গ্যাসের দামের সঙ্গে বিদ্যুতের দাম যুক্ত করার নীতি বড় বিতর্ক তৈরি করেছিল। স্টিগলিটজ সতর্ক করেছেন, একই ধরনের ভুল আবার করলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। তবে তিনি ইউরোপের জন্য একটি সম্ভাবনাও দেখছেন। ইউরোপ যদি যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমায়, তবে তারা নিজেদের কৌশলগত স্বাধীনতা বাড়াতে পারে। এতে স্বল্পমেয়াদে চাপ থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে ইউরোপ শক্ত অবস্থানে যেতে পারে।
এই বিশ্লেষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো দীর্ঘমেয়াদি বিশ্বব্যবস্থার প্রশ্ন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে সীমান্ত-অতিক্রমী সহযোগিতাভিত্তিক বিশ্ব গড়ার চেষ্টা হয়েছিল, তা এখন দুর্বল হয়ে পড়ছে। আন্তর্জাতিক আইন, বাণিজ্যব্যবস্থা, মানবাধিকার, সরবরাহশৃঙ্খল এবং কূটনৈতিক আস্থার ওপর যে কাঠামো দাঁড়িয়েছিল, ট্রাম্পের আমলে তা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে স্টিগলিটজ মনে করেন। যুক্তরাষ্ট্র একসময় এই ব্যবস্থার নির্মাতা ছিল। এখন সেই যুক্তরাষ্ট্রই অনেক ক্ষেত্রে তা ভাঙার দিকে এগোচ্ছে—এটাই তাঁর বড় উদ্বেগ।
চীনকে ঘিরে নতুন শীতল সংঘাত, সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা, জ্বালানিনির্ভরতার ঝুঁকি এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের দুর্বলতা মিলিয়ে বিশ্ব আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। যখন শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর নেতৃত্ব অস্থির হয়, তখন ছোট দেশ, দরিদ্র জনগোষ্ঠী এবং নির্ভরশীল অর্থনীতিগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ তারা যুদ্ধ শুরু করে না, কিন্তু যুদ্ধের দাম দেয়।
তবে স্টিগলিটজ একটি সম্ভাব্য ইতিবাচক দিকও দেখেছেন। তাঁর মতে, এই সংকট যদি বিশ্বকে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে বাধ্য করে, তাহলে সেটি বড় শিক্ষা হতে পারে। সূর্য ও বাতাসের শক্তিকে অনেকে অনিশ্চিত বলে মনে করেন। কিন্তু তাঁর যুক্তি হলো, রাজনৈতিকভাবে অস্থির নেতা, যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা এবং জ্বালানি বাজারের ধাক্কার চেয়ে নবায়নযোগ্য শক্তির পরিবর্তনশীলতা অনেক বেশি সামলানো যায়। অর্থাৎ প্রকৃতির ওঠানামা প্রযুক্তি দিয়ে সামলানো সম্ভব, কিন্তু স্বেচ্ছাচারী রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ধাক্কা সামলানো অনেক কঠিন।
শেষ পর্যন্ত এই নিবন্ধের মূল বার্তা হলো: গণতন্ত্র দুর্বল হলে ভুলের দাম বেড়ে যায়। ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ না থাকলে যুদ্ধ সহজ হয়, কিন্তু শান্তি কঠিন হয়। শুল্কনীতি, যুদ্ধনীতি, জ্বালানিনীতি ও করনীতি আলাদা আলাদা বিষয় মনে হলেও এগুলো একসঙ্গে অর্থনীতি ও সমাজকে প্রভাবিত করে। ট্রাম্পের সিদ্ধান্তগুলো তাই শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ঘটনা নয়; এগুলো বিশ্বব্যবস্থার স্থিতি, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা এবং ভবিষ্যৎ অর্থনীতির ওপর গভীর ছাপ ফেলতে পারে।
একজন নেতা ভুল করতে পারেন। কিন্তু রাষ্ট্র যদি সেই ভুল থামানোর শক্তি হারায়, তখন সংকট ব্যক্তির সীমা ছাড়িয়ে ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়। ট্রাম্পের ভুল নিয়ে স্টিগলিটজের উদ্বেগ তাই শুধু একজন প্রেসিডেন্টকে ঘিরে নয়; এটি ক্ষমতা, গণতন্ত্র, যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে এক কঠিন সতর্কবার্তা।
সিভি/এইচএম

