আফগানিস্তানের বাগরাম বিমানঘাঁটি ঘিরে ফের উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে দাবি করেছেন, আফগানিস্তানের তালেবান সরকারকে অবশ্যই এই ঘাঁটি ওয়াশিংটনের হাতে ফিরিয়ে দিতে হবে। অথচ পাঁচ বছর আগেই তারই স্বাক্ষর করা চুক্তির ভিত্তিতেই আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনাদের প্রত্যাহার সম্পন্ন হয়েছিল।
ট্রাম্পের হুমকি
গত ১৮ সেপ্টেম্বর লন্ডনে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সঙ্গে এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, “আমরা বাগরাম ফেরত চাই। আমরা বিনা মূল্যে ওটা দিয়ে দিয়েছি, এটা ভুল ছিল।”
দুই দিন পর নিজের প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যাল-এ আরও কঠোর সুরে তিনি লেখেন, “যদি আফগানিস্তান বাগরাম ঘাঁটি তাদের কাছে ফিরিয়ে না দেয় যারা এটি নির্মাণ করেছিল, তাহলে ভয়াবহ কিছু ঘটবে।”
তালেবান অবশ্য স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে—বাগরাম ফেরত দেওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।
বাগরামের ইতিহাস
কাবুল থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই ঘাঁটির ইতিহাস জটিল ও রক্তাক্ত। সোভিয়েতরা ১৯৫০-এর দশকে এটি তৈরি করে, পরে ১৯৭৯ সালের আগ্রাসনের পর দীর্ঘ এক দশক তাদের দখলে রাখে। সোভিয়েতদের পতনের পর ঘাঁটি হাতে যায় নর্দার্ন অ্যালায়েন্সের, এরপর তালেবানের নিয়ন্ত্রণে যায়।

২০০১ সালে আফগানিস্তানে ন্যাটো হস্তক্ষেপের পর বাগরাম পরিণত হয় মার্কিন সামরিক অভিযানের কেন্দ্রবিন্দুতে। এক সময় এখানে ১০ হাজার সেনা অবস্থান করত। ঘাঁটিতে ছিল হাসপাতাল, কারাগার, সৈন্যদের আবাসন, এমনকি পিৎজা হাট আর সাবওয়ের মতো মার্কিন ফাস্টফুড দোকানও। তবে এই কারাগার কুখ্যাত ছিল নির্যাতন আর মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য।
২০২১ সালে মার্কিন সেনারা সরে যাওয়ার সময় অস্ত্র ও সরঞ্জামের বড় অংশ ধ্বংস করলেও অনেক কিছু ফেলে রেখে যায়। পরবর্তীতে সেগুলোর অনেকটাই তালেবানের হাতে চলে যায়।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই ঘাঁটি?
ট্রাম্প বারবার অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান ছেড়ে যাওয়ার সময় বিশাল অস্ত্রভাণ্ডার ফেলে রেখে গিয়েছিল। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের আসল আগ্রহ বাগরামের ভৌগোলিক অবস্থান এবং প্রতীকী গুরুত্বে।
বাগরাম আফগানিস্তানের সবচেয়ে বড় এয়ারবেস, যেখানে বড় আকারের সামরিক বিমান অবতরণ সম্ভব। এটি নিয়ন্ত্রণ মানে আকাশপথে গোটা অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করা। বিশেষ করে চীনের দিক থেকে এর কৌশলগত মূল্য বেড়েছে বহুগুণ। বাগরাম থেকে চীনের সীমান্ত মাত্র ৮০০ কিলোমিটার দূরে, আর জিনজিয়াংয়ের ক্ষেপণাস্ত্র কারখানার দূরত্ব প্রায় ২,৪০০ কিলোমিটার।
এই কারণেই ট্রাম্প দাবি করছেন—চীনের পারমাণবিক অস্ত্র কারখানার কাছাকাছি অবস্থান করার জন্য বাগরাম এখন আগের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ।
তালেবানের প্রত্যাখ্যান
তালেবান বলেছে, ২০২০ সালের দোহা চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, তারা আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না। তালেবান মুখপাত্র হামদুল্লাহ ফিত্রাত সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, “আমেরিকাকে তাদের অঙ্গীকারের প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে হবে।”
বিশ্লেষকরা বলছেন, তালেবান বাগরাম ছাড়তে রাজি হবে না, কারণ সেটি তাদের জন্য মর্যাদা ও স্বাধীনতার প্রতীক। বিদেশি সেনাদের উপস্থিতি তাদের আন্দোলনের মূল দর্শনের বিরোধী, যা সরাসরি তাদের অস্তিত্বকেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল কী হতে পারে?
তবে ট্রাম্পের দাবি পুরোপুরি সামরিক উদ্দেশ্যের নয় বলেও মনে করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ। বাগরামকে সামনে এনে হয়তো তিনি বড় কোনো সমঝোতা চাইছেন। যেমন—তালেবানের হাতে থাকা অস্ত্র ফেরত দেওয়া কিংবা বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করা।
ওয়াশিংটনের কিছু বিশ্লেষকের মতে, এ ধরনের চাপ আসলে আলোচনার দরজা খোলা রাখার কৌশলও হতে পারে। আফগানিস্তান আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি চাইছে, আর যুক্তরাষ্ট্র চাইছে কৌশলগত সুবিধা।
প্রশ্ন হলো, ট্রাম্প কি সত্যিই বাগরাম ফেরত পেতে পারবেন?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি বাস্তবে অত্যন্ত কঠিন। লজিস্টিক জটিলতা, রাজনৈতিক প্রতিরোধ এবং তালেবানের অভ্যন্তরীণ সংকট—সবকিছু মিলিয়ে এ ধরনের পদক্ষেপ সফল হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
তবু একটি বিষয় স্পষ্ট—বাগরাম শুধু একটি সামরিক ঘাঁটি নয়; এটি এখন ক্ষমতার প্রতীক, আঞ্চলিক কৌশল আর বিশ্ব রাজনীতির হিসাব-নিকাশে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে।

