পাকিস্তানের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে কীভাবে বাংলাদেশি তরুণরা যুক্ত হচ্ছে, তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গত ছয় মাসে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে অন্তত দুই বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। একই সময়ে বাংলাদেশ পুলিশও টিটিপি বা তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পৃক্ত সন্দেহে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে।
ফলে প্রশ্ন উঠছে—কোন পথে, কীভাবে এবং কার প্রভাবে বাংলাদেশের যুবকরা পাকিস্তানের এই জঙ্গি নেটওয়ার্কে প্রবেশ করছে?
পাকিস্তানে বাংলাদেশিদের মৃত্যু-
গত শুক্রবার পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী সশস্ত্র সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) বিরুদ্ধে অভিযান চালায়। সরকারি তথ্যমতে, এতে সংগঠনটির অন্তত ১৭ জন সদস্য নিহত হয়। নিহতদের মধ্যে একজন বাংলাদেশি তরুণকে শনাক্ত করা হয়, যার নাম ফয়সাল এবং বাড়ি মাদারীপুরে। এর কয়েক মাস আগে, এপ্রিল মাসে উত্তর ওয়াজিরিস্তানে সামরিক অভিযানে আহমেদ জুবায়ের নামে আরেক বাংলাদেশি নিহত হন।
পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, রাজমাক এলাকায় গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালানোর সময় জুবায়ের প্রাণ হারান।
এই দুই ঘটনার পর বাংলাদেশ থেকে টিটিপিতে তরুণদের যোগদানের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে পাকিস্তানি গোয়েন্দাদের তথ্যের ভিত্তিতে গত জুলাইয়ে বাংলাদেশ পুলিশ দুজনকে গ্রেপ্তার করে, যাদের টিটিপির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকার অভিযোগ রয়েছে।
টিটিপি ও তার কার্যক্রম-
টিটিপি মূলত পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের পাঠান অধ্যুষিত এলাকায় গড়ে ওঠা বিভিন্ন মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠনের জোট। ২০০৭ সালে বাইতুল্লাহ মেহ্সুদের নেতৃত্বে ১৩টি সংগঠন একত্রিত হয়ে টিটিপি গঠন করে। শুরু থেকেই এই সংগঠন পাকিস্তানে ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ঘোষণা করে। তবে গঠনের পর থেকেই দলীয় কোন্দল এবং ভাঙনের কারণে বেশ কিছু উপদল জন্ম নেয়। ২০২০ সালে এই উপদলগুলো আবার একত্রিত হয়ে শক্তি সঞ্চয় করে।
পাকিস্তানের সাম্প্রতিক ইতিহাসে বহু ভয়াবহ হামলার পেছনে টিটিপির নাম উঠে এসেছে। মসজিদ, স্কুল, সরকারি প্রতিষ্ঠান এমনকি সেনা সদস্যদের ওপর হামলার অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। পাকিস্তান সরকার একসময় টিটিপির সঙ্গে শান্তি আলোচনায় বসার চেষ্টা করলেও ২০১৪ সালে সে উদ্যোগ তীব্র সমালোচনার মুখে ভেস্তে যায়।
এই সংগঠন শুধু পাকিস্তান থেকেই জনবল সংগ্রহ করে না; বরং বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ থেকেও রিক্রুটমেন্ট করে থাকে বলে গোয়েন্দা সূত্রগুলো জানায়। এর সাম্প্রতিক প্রমাণ হলো বাংলাদেশি দুই তরুণের পাকিস্তানে মৃত্যুর ঘটনা।
বাংলাদেশ থেকে যোগদানের পথ-
বাংলাদেশে আটক হওয়া সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যে উঠে এসেছে, টিটিপিতে যোগ দিতে প্রথমে তারা সৌদি আরব বা দুবাইয়ের মতো দেশে যায়। ওমরাহ বা চাকরির অজুহাতে দেশ ছাড়লেও সেখান থেকে পাকিস্তান বা আফগানিস্তানে প্রবেশ করে টিটিপির নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়।
গত বছরের একটি মামলার এজাহারে বলা হয়, টিটিপির বাংলাদেশ শাখার নেতৃত্বে রয়েছেন ইঞ্জিনিয়ার ইমরান হায়দার নামের একজন ব্যক্তি। তিনি সংগঠনের হয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণে তরুণদের উদ্বুদ্ধ করেন, তাদের সংঘবদ্ধ করেন এবং জঙ্গি মতাদর্শে দীক্ষিত করেন। পুলিশের ধারণা, এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমেই বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরব বা দুবাই হয়ে পাকিস্তানে তরুণরা পাঠানো হচ্ছে।
গ্রেপ্তার ও মামলার তথ্য-
বাংলাদেশে টিটিপির সদস্য সন্দেহে আটক দুজনকে গত জুলাইয়ে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। এর একজনকে ২ জুলাই ঢাকার সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে একটি দোকান থেকে এবং অন্যজনকে ১৪ জুলাই নারায়ণগঞ্জ থেকে আটক করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দায়ের করা হয়।
মামলায় উল্লেখ করা হয়, আটকরা ২০২৪ সালের ১৮ অক্টোবর ঢাকা ছেড়ে সৌদি আরব গিয়েছিলেন। ওমরাহ সম্পন্ন না করেই তারা পাকিস্তানে যান। সেখান থেকে আফগানিস্তানে প্রবেশ করেন। কয়েক দিনের মধ্যে একজন আবার পাকিস্তান হয়ে দেশে ফেরেন, কিন্তু অপরজন উত্তর ওয়াজিরিস্তানে অভিযানে নিহত হন। নিহতের নাম আহমেদ জুবায়ের, যিনি যুবরাজ নামেও পরিচিত ছিলেন।
এজাহারে আরও বলা হয়, ইমরান হায়দারের নেতৃত্বে বাংলাদেশে টিটিপির একটি নেটওয়ার্ক সক্রিয়। এর মূল কাজ হলো তরুণদের ইসলামী খিলাফতের দাওয়াত পৌঁছে দেওয়া এবং জিহাদে অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ করা।
পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটক একজন এই তথ্যও দেয় যে, আরো কয়েকজন তরুণ ইতিমধ্যেই দীক্ষিত হয়েছে এবং তারা পাকিস্তানে যেতে প্রস্তুত।
পুরোনো সম্পৃক্ততার ইতিহাস-
জঙ্গিবাদ পর্যবেক্ষক ও গবেষকরা বলছেন, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানভিত্তিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশিদের সম্পৃক্ততা নতুন নয়।
মানবাধিকার সংগঠক নূর খান লিটন বলেন, “বায়তুল মোকাররমের কাছে আমরা প্রকাশ্যে মুজাহিদ সংগ্রহের ব্যানার দেখেছি। বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় খোলাখুলিভাবে রিক্রুটমেন্টের উদাহরণ আছে। যদিও এখন অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে, কিন্তু পুরোপুরি থেমে যায়নি।”
এর আগেও জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্কীয়া নামের সংগঠনের সঙ্গে আল-কায়েদার যোগসূত্র থাকার কথা উঠে এসেছে। আল-কায়েদার সঙ্গে আবার টিটিপির সংযোগ রয়েছে। ফলে বাংলাদেশি জঙ্গিদের ওই নেটওয়ার্কে প্রবেশ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।
পাকিস্তানের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়-
পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বেশ কিছুদিন ধরে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে এসব বিষয়ে তথ্য দিয়ে আসছিল। জুলাইয়ের অভিযানে যাদের গ্রেপ্তার করা হয়, তাদের আটকের পেছনেও পাকিস্তানি সংস্থার দেওয়া তথ্য ভূমিকা রেখেছিল বলে জানিয়েছেন পুলিশের কর্মকর্তারা। গ্রেপ্তারের পরপরই বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নতুন করে তদন্ত শুরু করে। মামলায় যাদের নাম এসেছে, তাদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে তৎপরতা চলছে।
এমনকি পাকিস্তানি গণমাধ্যমও জানায়, বালোচিস্তান থেকে অন্তত ৩৫ জন বাংলাদেশিকে আটক করা হয়েছে। যদিও এ তথ্যের আনুষ্ঠানিক নিশ্চয়তা বাংলাদেশ সরকার দেয়নি।
নেটওয়ার্কের কার্যপ্রণালি-
পুলিশ ও গোয়েন্দাদের ধারণা, বাংলাদেশে টিটিপি-সংযুক্ত ব্যক্তিরা তরুণদের ধর্মীয় উগ্রবাদে দীক্ষিত করে, প্রাথমিকভাবে তাদের প্রশিক্ষণ দেয় এবং পরে বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করে। সাধারণত সৌদি আরব বা দুবাই হয়ে তারা পাকিস্তান পৌঁছায়। সেখানেই টিটিপির মূল নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযুক্ত হয়।
২০২৩ সালের জুনে ডেমরা থেকে ইমরান হায়দার ও তার স্ত্রীকে অস্ত্রসহ আটক করেছিল পুলিশ। তখন তাকে জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্কীয়ার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়। এখন আবার তার নাম টিটিপির সঙ্গে যুক্ত হয়ে আসছে।
উদ্বেগ ও ভবিষ্যৎ আশঙ্কা-
বাংলাদেশি তরুণদের এভাবে বিদেশি জঙ্গি সংগঠনে যুক্ত হওয়ার ঘটনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান বাড়ানো, সীমান্ত নজরদারি জোরদার এবং অনলাইন পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একইসঙ্গে দেশে উগ্রবাদী দীক্ষাদান বন্ধে সচেতনতামূলক কার্যক্রম ও সামাজিক উদ্যোগ জোরদার করতে হবে। কারণ স্থানীয় পর্যায়ে দীক্ষিত না হলে তরুণরা বিদেশি নেটওয়ার্কে যুক্ত হতে পারবে না।
পরিশেষে, পাকিস্তানে টিটিপির হাতে নিহত দুই বাংলাদেশি তরুণ প্রমাণ করেছে, এই নেটওয়ার্ক এখনো সক্রিয় এবং বাংলাদেশের ভেতর থেকে এর শিকড় ছড়াচ্ছে।
পুলিশি অভিযান, গোয়েন্দা নজরদারি ও সামাজিক প্রতিরোধ ছাড়া এই প্রবণতা রোধ করা কঠিন হবে। বাংলাদেশের তরুণরা যাতে আর কোনো বিদেশি সশস্ত্র সংগঠনে না জড়ায়, সে দায়িত্ব রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়কেই বহন করতে হবে।

