গাজা অভিমুখী ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’-র নৌবহর থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থানে থাকা দৃকের (Drik) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও আলোকচিত্রী শহিদুল আলম আজ শুক্রবার দুপুরে একটি ভিডিও বার্তায় জানান, তারা গাজা দিকে যাচ্ছে এবং নিজেদের অবস্থানকে তিনি ‘ফিলিস্তিন টাইম জোনে’ প্রবেশ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। শহিদুলের ওই ভিডিও বার্তাটি প্রকাশের কিছু সময়ের মধ্যেই গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার সর্বশেষ জাহাজটিও ইসরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
ভিডিও বার্তায় শহিদুল আলম বলেন, আজ ৩ অক্টোবর ২০২৫; ঝকঝকে রোদ আছে এবং তারা এখন ফিলিস্তিনি টাইম জোনে পৌঁছে গেছে—এটাই তাদের কথামত কার্যকর অবস্থান।
তিনি জানান, সুমুদ ফ্লোটিলায় যারা গড়পড়তা পথে গিয়েছিলেন, তারা আলাদা রীতিতে গিয়েছেন; আর তাদের দলটি আলাদাভাবে এগোচ্ছে। পরিকল্পনা ছিলো, যদি ফ্লোটিলার ওপর কিছু ঘটে, তাদের দলটি তখনও গাজা অভিমুখে অগ্রসর হতে পারবে।
শহিদুল ভিডিওতে বলেন, “আমরা আলাদাভাবে যাচ্ছি। এভাবেই আমাদের পরিকল্পনা ছিলো—ওদের ওপর কিছু হলেও আমরা যেন এগিয়ে যেতে পারি। জানতে পেরেছি, ইসরায়েল তাদের সব জাহাজ আটক করে দিয়েছে।”
তিনি আরো বলেন, তাদের বহরে অনেক বড় একটি জাহাজ রয়েছে এবং তাদের সঙ্গে আটটি ছোট নৌকা ছিল, যেগুলো একটু আগেই সমুদ্রে নেমেছিল। তিনি জানান, “আমরা—এই নয়টি যানবাহন—মুক্ত আছি। আমরা আজ ফিলিস্তিনি টাইম জোনে এসেছি। এখনও কিছু দূরত্ব রয়েছে, কিন্তু আজ আমরা আটটি ছোট নৌকাকে নিয়ে পার হয়ে যাব। এর পর থেকে আমাদের এই জাহাজটিই সবচেয়ে আগে থাকবে। এতে বোঝা যায়, আক্রোশটা আমাদের ওপরই পড়বে। কিন্তু আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ—গাজা পর্যন্ত যাব এবং কোনো বাধা মেনে নেব না।”
শহিদুল স্পষ্ট করে জানান, তাদের উদ্দেশ্য কেবল ত্রাণ배송 নয়; তারা ‘অবরোধ ভাঙা’ কে মূল লক্ষ্য হিসেবে নিয়েছে। তিনি বলেন, “সুমুদ ফ্লোটিলায় যে নৌকাগুলো ছিল, তাদের দায়িত্ব ছিল ত্রাণ পৌঁছে দেয়া। আমরা ত্রাণের নামে যাচ্ছি না—আমরা একটি অবৈধ অবরোধ ভাঙতে যাচ্ছি।”
ভিডিও বার্তায় তিনি আরও বলেন, জাহাজে অনেকে রয়েছেন—সংক্ষিপ্তভাবে তিনি বলেন, অনেক সাংবাদিক, চিকিৎসক এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্মী রয়েছে—তারা সবাই গাজার জনগণের পাশে দাঁড়াতে যাচ্ছেন এবং ইসরায়েলি বাহিনীর হামলার প্রতিবাদ জানাবেন।
শহিদুল উল্লেখ করেন, গত রাতে মেডিসিন স্যাঁ ফ্রন্টিয়ার্স (Médecins Sans Frontières, MSF)–এর ১৪ জন চিকিৎসককে হত্যা করা হয়েছে—এই হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে কোন প্রমাণসাপন্ন প্রতিক্রিয়া তিনি দেখতে পাননি এবং তাই নাগরিকরা এগিয়ে এসে কাজ করবে বলে জানান।
ভিডিওর ক্যাপশনে শহিদুল আলম লিখেছেন, তাদের জাহাজে ৯৬ জন রয়েছেন; তাদের মধ্যে ৮২ জনই গণমাধ্যমকর্মী ও চিকিৎসাবিদ—শুধু আয়োজক, ফ্লোটিলা কো-অর্ডিনেশন কমিটির সদস্য ও ক্রু ছাড়া নয়। শহিদুল বার্তায় বারবার জোর দিয়ে বলেছেন, তারা শান্তিপূর্ণভাবে গাজায় পৌঁছে মানবিক সহায়তা পৌঁছে দিতে চায় না বরং ‘অবরোধ ভাঙা’ লক্ষ্য করেই এগিয়ে যাচ্ছে এবং প্রয়োজন হলে মোকাবিলা চালাবেই।
শহিদুলের ভিডিও বার্তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পরই সরকারি-মহল ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এই ফ্লোটিলার গতিবিধি আর ইসরায়েলি প্রতিক্রিয়া নিয়ে ব্যাপক খবর ছড়িয়ে পড়ে। এর কিছুক্ষণ পরই জানা যায়, গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার সর্বশেষ জাহাজটিও—পোল্যান্ড পতাকাবাহী ‘ম্যারিনেট’—ইসরায়েলি নৌবাহিনীর হাতে এসেছে। এই জাহাজটিতে ছয়জন ক্রু ছিলেন। এর আগেই ফ্লোটিলার অন্য সব জাহাজ ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়; ফলে শহিদুল এবং তাদের বহরকে মোটিভেট করা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের মধ্যে দিয়ে সামুদ্রিক সংঘর্ষ বা বাধার মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
শহিদুলের কথায় এবং ফ্লোটিলার উদ্যোগে অংশ নেওয়া আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের বক্তব্যে স্পষ্ট, তারা তাদের অবস্থান ধর্মঘটের ভঙ্গিতে—তারা মনে করেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব যথেষ্ট কার্যকরভাবে মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক মানবিক আইন রক্ষা করছে না। সেই অভিমত থেকেই তারা স্বাধীন নাগরিক উদ্যোগে ইসরায়েলি অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করছে।
এ প্রসঙ্গে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা নীতি ও আন্তর্জাতিক বিধি-নীতির বাস্তবায়ন নিয়ে তাত্ক্ষণিকভাবে নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগ উঠেছে। আন্তর্জাতিক জলসীমা, নৌন নিরাপত্তা, মানবিক ত্রাণ পরিবহনের আইনি অবস্থা ও মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর ভূমিকা—এসব বিষয়ে আগাম দিনগুলোতে দ্রুত বিবৃতি ও কূটনৈতিক আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে।

