বিশ্ব রাজনীতির অস্থিরতা এখন শুধু কূটনৈতিক টেবিলে সীমাবদ্ধ নেই। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে রাষ্ট্রগুলোর বাজেট, অগ্রাধিকার এবং নিরাপত্তা পরিকল্পনায়। ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে সামরিক ব্যয় নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। স্টকহোমভিত্তিক শান্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপ্রি সোমবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ওই বছর বৈশ্বিক সামরিক ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ২ লাখ ৯০ হাজার কোটি ডলারে। বাস্তব হিসাবে এটি আগের বছরের তুলনায় ২ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি।
এই বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে সামরিক ব্যয় বাড়ার ধারাটি টানা ১১ বছর ধরে অব্যাহত থাকল। অর্থাৎ বিশ্ব অর্থনীতি নানা চাপের মুখে থাকলেও নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় কমেনি। বরং অনেক দেশ যুদ্ধ, সীমান্ত উত্তেজনা, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ভবিষ্যৎ সংঘাতের আশঙ্কাকে সামনে রেখে সামরিক সক্ষমতা বাড়িয়েছে। ২০২৫ সালে সামরিক ব্যয় বিশ্বের মোট উৎপাদনের ২ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছায়, যা ২০০৯ সালের পর সর্বোচ্চ মাত্রা।
এই চিত্রের মধ্যে সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় কমলেও বৈশ্বিক ব্যয় কমেনি। সাধারণত যুক্তরাষ্ট্র সামরিক ব্যয়ের হিসাবে সবার ওপরে থাকে। ২০২৫ সালেও দেশটি শীর্ষ অবস্থান ধরে রাখে। তবে ওই বছর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যয় ৭ দশমিক ৫ শতাংশ কমে ৯৫ হাজার ৪০০ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। সিপ্রির তথ্য অনুযায়ী, ইউক্রেনের জন্য নতুন আর্থিক সামরিক সহায়তা অনুমোদন না হওয়াই এই কমতির প্রধান কারণ। এর আগের তিন বছরে যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা হিসেবে মোট ১২ হাজার ৭০০ কোটি ডলার দিয়েছিল।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় কমে যাওয়াকে স্থায়ী পরিবর্তন হিসেবে দেখছে না সিপ্রি। প্রতিষ্ঠানটির মূল্যায়ন অনুযায়ী, এই হ্রাস স্বল্পস্থায়ী হতে পারে। ২০২৬ সালের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে অনুমোদিত সামরিক ব্যয় আবারও ১ লাখ কোটি ডলারের বেশি হতে যাচ্ছে। এমনকি পরবর্তী প্রস্তাবগুলো পাস হলে ২০২৭ সালে এই ব্যয় আরও বড় আকার নিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাময়িক কমতি পুষিয়ে দিয়েছে ইউরোপ ও এশিয়ার দ্রুত বাড়তে থাকা সামরিক ব্যয়। ২০২৫ সালে ইউরোপে সামরিক ব্যয় ১৪ শতাংশ বেড়ে ৮৬ হাজার ৪০০ কোটি ডলারে পৌঁছায়। ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব, রাশিয়ার সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর পুনরায় অস্ত্রসজ্জার প্রবণতা এই বৃদ্ধির বড় কারণ। সিপ্রির ভাষ্য অনুযায়ী, ইউরোপে এই ব্যয় বৃদ্ধিই ২০২৫ সালে বৈশ্বিক সামরিক ব্যয় বাড়ার প্রধান চালিকা শক্তি ছিল।
রাশিয়া ও ইউক্রেন—দুই দেশই যুদ্ধের চাপে নিজেদের সামরিক ব্যয় বাড়িয়েছে। ২০২৫ সালে রাশিয়ার সামরিক ব্যয় ৫ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে ১৯ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছায়। অন্যদিকে ইউক্রেনের সামরিক ব্যয় ২০ শতাংশ বেড়ে ৮ হাজার ৪১০ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। ইউক্রেনের ক্ষেত্রে এই ব্যয় দেশটির মোট উৎপাদনের ৪০ শতাংশের সমান, যা যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপকে স্পষ্টভাবে দেখায়।
এশিয়া ও ওশেনিয়াতেও সামরিক ব্যয় দ্রুত বেড়েছে। ২০২৫ সালে এই অঞ্চলের মোট সামরিক ব্যয় দাঁড়ায় ৬৮ হাজার ১০০ কোটি ডলারে, যা আগের বছরের তুলনায় ৮ দশমিক ১ শতাংশ বেশি। এটি ২০০৯ সালের পর এই অঞ্চলে সবচেয়ে বড় বার্ষিক বৃদ্ধি। চীন ২০২৫ সালে সামরিক ব্যয় ৭ দশমিক ৪ শতাংশ বাড়িয়ে ৩৩ হাজার ৬০০ কোটি ডলারে নিয়ে যায়। এর মাধ্যমে চীনের সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির ধারা টানা ৩১ বছর ধরে চলেছে।
সামরিক ব্যয়ের শীর্ষ তিন দেশ ছিল যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া। ২০২৫ সালে এই তিন দেশের সম্মিলিত ব্যয় ছিল ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি ডলার, যা বৈশ্বিক সামরিক ব্যয়ের ৫১ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান দেখায়, সামরিক শক্তির বড় অংশ এখনো কয়েকটি বৃহৎ শক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত। তবে একই সঙ্গে মধ্যম শক্তির দেশগুলোও নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে প্রতিরক্ষা খাতে বেশি অর্থ ঢালছে।
ভারতও ২০২৫ সালে সামরিক ব্যয় বাড়িয়েছে। সিপ্রির তথ্য অনুযায়ী, ভারত ওই বছর বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম সামরিক ব্যয়কারী দেশ ছিল। দেশটির সামরিক ব্যয় ৮ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে ৯ হাজার ২১০ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। পাকিস্তানের সামরিক ব্যয়ও ১১ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ১৯০ কোটি ডলারে পৌঁছায়। দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা বাস্তবতায় এই প্রবণতা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক ব্যয়ের চিত্র ছিল কিছুটা ভিন্ন। অঞ্চলটির মোট সামরিক ব্যয় ২০২৫ সালে আনুমানিক ২১ হাজার ৮০০ কোটি ডলারে দাঁড়ায়, যা আগের বছরের তুলনায় মাত্র ০ দশমিক ১ শতাংশ বেশি। ইসরায়েলের সামরিক ব্যয় ৪ দশমিক ৯ শতাংশ কমে ৪ হাজার ৮৩০ কোটি ডলারে নামে। তবে এই ব্যয় ২০২২ সালের তুলনায় এখনো ৯৭ শতাংশ বেশি। ইরানের সামরিক ব্যয়ও টানা দ্বিতীয় বছর কমে ৭৪০ কোটি ডলারে দাঁড়ায়।
এই পুরো চিত্র একটি বড় বাস্তবতা সামনে আনে। বিশ্ব এখন উন্নয়ন, জলবায়ু, স্বাস্থ্য বা দারিদ্র্য হ্রাসের মতো অগ্রাধিকারের পাশাপাশি নিরাপত্তা প্রশ্নে ক্রমেই বেশি অর্থ ব্যয় করছে। অনেক রাষ্ট্র মনে করছে, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় সামরিক প্রস্তুতি বাড়ানো ছাড়া তাদের সামনে বিকল্প নেই। কিন্তু এই প্রবণতার বিপরীত দিকও আছে। সামরিক বাজেট যত বড় হয়, সামাজিক খাতে বিনিয়োগের ওপর চাপ তত বাড়তে পারে।
সিপ্রির বিশ্লেষণ বলছে, চলমান যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং বহু দেশের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক ব্যয়ের লক্ষ্য বিবেচনায় এই বৃদ্ধি ২০২৬ সাল জুড়ে এবং তার পরও চলতে পারে। তাই ২০২৫ সালের সামরিক ব্যয়ের রেকর্ড শুধু একটি বছরের হিসাব নয়। এটি বিশ্ব ব্যবস্থার গভীর অনিশ্চয়তারও একটি স্পষ্ট সংকেত।
সিভি/এইচএম

