বিশ্বজুড়ে আলোচিত নোবেল শান্তি পুরস্কারের ঘোষণা ঘনিয়ে এসেছে। আগামী শুক্রবার জানা যাবে কে পাচ্ছেন ২০২৫ সালের মর্যাদাপূর্ণ এই পুরস্কার। আর এবার সেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জে ট্রাম্প। দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানজনক এই স্বীকৃতি অর্জনের আকাঙ্ক্ষা তাঁর। পুরস্কারের ঘোষণার সময় যত এগিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে ট্রাম্পের প্রচেষ্টা।
সম্প্রতি তিনি ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যকার প্রায় দুই বছরব্যাপী গাজা যুদ্ধের অবসানে নিজের প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনাকে নোবেলের সঙ্গে যুক্ত করেছেন।
ট্রাম্প বরাবরই নিজেকে “চুক্তির কারিগর” ও “বিশ্ব মধ্যস্থতাকারী” হিসেবে তুলে ধরেন। তাঁর বিশ্বাস, ২০২০ সালের আব্রাহাম চুক্তি থেকে শুরু করে সর্বশেষ “গাজা শান্তি চুক্তির রোডম্যাপ”—সবই তাঁকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের যোগ্য করে তোলে। তবে আন্তর্জাতিক কূটনীতিবিদ ও নোবেল প্রক্রিয়া বিশ্লেষকদের মতে, তাঁর প্রকাশ্য প্রচারণা বরং পুরস্কার পাওয়ার পথে বাধা তৈরি করছে।
আত্মবিশ্বাসী ট্রাম্পের নোবেল প্রচারণা-
হোয়াইট হাউসে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ট্রাম্প দাবি করে আসছেন, তাঁর পররাষ্ট্রনীতির সাফল্য অনেক পূর্বসূরির চেয়েও বড়। গত মাসে জাতিসংঘের এক বৈঠকে তিনি বলেন, “সবাই বলে, আমার নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়া উচিত।” তাঁর বক্তব্যে আত্মবিশ্বাস যেমন স্পষ্ট, তেমনি নোবেল কমিটির প্রতি হতাশাও লুকানো নেই।
ট্রাম্পের মতে, তাঁর নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র সাতটি সংঘাতের অবসান ঘটিয়েছে, আর গাজা যুদ্ধের শান্তি হলে সেটি হবে তাঁর “অষ্টম সাফল্য”।
এক বক্তৃতায় তিনি ব্যঙ্গ করে বলেন, “আমি এত কিছু করলাম, অথচ নোবেল পেলাম না। তারা দেবে এমন কাউকে, যে কিছুই করেনি।” ওবামার মতো তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীরা পুরস্কার পেলেও নিজের যোগ্যতা স্বীকৃতি পায়নি—এ অভিযোগ ট্রাম্পের বহুদিনের। নোবেল জয়ের আকাঙ্ক্ষা তাঁর এখন কেবল ব্যক্তিগত গর্ব নয়, রাজনৈতিক প্রচারণার অংশও হয়ে উঠেছে।
গাজা শান্তি পরিকল্পনা: নোবেল আকাঙ্ক্ষার নতুন যুক্তি-
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক শান্তি প্রচেষ্টা মূলত গাজা যুদ্ধ ঘিরে। ইসরায়েল ও হামাসের সংঘাত যখন তৃতীয় বছরে, তখন তিনি ঘোষণা দেন নতুন শান্তি পরিকল্পনার। এতে বলা হয়, গাজা থেকে ধাপে ধাপে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার, বন্দিদের মুক্তি এবং আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে পুনর্গঠন হবে। তিন ধাপে বাস্তবায়নের এই প্রস্তাবে প্রথমে হামাসের হাতে থাকা জিম্মিদের মুক্তি, এরপর আংশিক সেনা প্রত্যাহার এবং শেষে আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় পুনর্গঠন—এই তিনটি স্তর নির্ধারণ করা হয়েছে।
ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইসরায়েল ইতিমধ্যেই প্রাথমিক প্রত্যাহারে সম্মত হয়েছে। তবে যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা তাঁর প্রস্তাবের পক্ষে নয়। প্রস্তাব ঘোষণার দিনই গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত হয় ৬৬ ফিলিস্তিনি। হামাস অস্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে আগ্রহ দেখালেও নিরস্ত্রীকরণের শর্ত মানেনি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের প্রস্তাব উচ্চাভিলাষী হলেও বাস্তবায়নের পথে রাজনৈতিক বাধা, সামরিক অনিশ্চয়তা ও পারস্পরিক অবিশ্বাস বড় অন্তরায়।

নোবেল মনোনয়নের জটিল প্রক্রিয়া-
প্রতি বছর নরওয়ের পার্লামেন্টের নিযুক্ত পাঁচ সদস্যের কমিটি শান্তি পুরস্কার বিজয়ী নির্বাচন করেন। মনোনয়নের প্রক্রিয়া পুরোপুরি গোপন থাকে এবং কমিটির আলোচনা ৫০ বছর পর্যন্ত প্রকাশ করা হয় না। রাষ্ট্রপ্রধান, সংসদ সদস্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও পূর্ববর্তী বিজয়ীরা প্রার্থী মনোনয়ন দিতে পারেন।
চলতি বছরে মোট ৩৩৮ জন মনোনীত হয়েছেন, যদিও খুব অল্প কয়েকজনের নাম প্রকাশ্যে এসেছে। ট্রাম্পের নাম প্রতি বছরই তালিকায় থাকে। এবার নিউইয়র্কের রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য ক্লাউডিয়া টেনি তাঁকে মনোনীত করেছেন। ২০২০ সালের আব্রাহাম চুক্তিতে তাঁর নেতৃত্বের স্বীকৃতি হিসেবেই এই মনোনয়ন। তবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু, পাকিস্তান ও কম্বোডিয়ার নেতাদের মনোনয়ন সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ায় বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।
পাকিস্তান ও কম্বোডিয়ার পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ভারত ও থাইল্যান্ডের সঙ্গে সামরিক উত্তেজনা প্রশমনে ট্রাম্প ভূমিকা রেখেছেন। তবে ইউক্রেনীয় এক সংসদ সদস্য রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বিষয়ে তাঁর নীরবতায় ক্ষুব্ধ হয়ে নিজের দেওয়া মনোনয়ন প্রত্যাহার করেন।
নেপথ্যের লবিং ও কূটনৈতিক তৎপরতা-
নোবেল পুরস্কারের পেছনে ট্রাম্পের প্রচেষ্টা এখন একধরনের আন্তর্জাতিক লবিং অভিযানে পরিণত হয়েছে। তাঁর মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূত স্টিভ উইটকফ নরওয়েজীয় কমিটিকে “বাস্তবতা স্বীকার” করে ট্রাম্পের কৃতিত্ব স্বীকারের আহ্বান জানিয়েছেন। ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহল নরওয়ের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেছেন। এমনকি ট্রাম্প নিজেও নরওয়ের অর্থমন্ত্রী জেনস স্টলটেনবার্গের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছেন। তাঁর পক্ষে করপোরেট বিশ্ব থেকেও সমর্থন এসেছে।
ফাইজারের প্রধান নির্বাহী আলবার্ট বুরলা বলেছেন, ট্রাম্পের “অপারেশন ওয়ার্প স্পিড” উদ্যোগ কোভিড টিকা তৈরির গতি বাড়িয়েছে—যা বৈশ্বিক শান্তি ও মানবকল্যাণের উদাহরণ হতে পারে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রকাশ্য প্রচারণা ও কূটনৈতিক চাপ উল্টো ফল দিতে পারে। কারণ নোবেল কমিটি সব সময়ই রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে স্বাধীন সিদ্ধান্তে অটল থাকতে চায়।
ট্রাম্পের সম্ভাবনা কেন ক্ষীণ-
আন্তর্জাতিক কূটনীতিবিদরা একমত—ট্রাম্পের পুরস্কার জয়ের সম্ভাবনা খুবই সীমিত। নোবেল কমিটি সাধারণত এমন ব্যক্তিকে বেছে নেয়, যিনি দীর্ঘমেয়াদী শান্তি ও স্থিতিশীলতার প্রতীক।
হেনরি জ্যাকসন সোসাইটির গবেষক থিও জেনুর মতে, ট্রাম্পের সংঘাতমুখী বক্তব্য ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রতি সংশয় নোবেলের মানদণ্ডের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
জেনু বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে ট্রাম্পের অবিশ্বাসও তাঁর অবস্থান দুর্বল করে। নোবেল কমিটি এখন জলবায়ু নীতিকেও বৈশ্বিক শান্তির অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। “অতীতের বিজয়ীরা সেতুবন্ধন তৈরি করেছেন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়িয়েছেন—কিন্তু ট্রাম্পের নীতি বিভাজন সৃষ্টি করে” বলেন তিনি।
অসলো পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিচালক নিনা গ্রেগারও একমত। তাঁর মতে, ট্রাম্পের প্রকাশ্য প্রচারণা কমিটিকে আরও সতর্ক করে তুলবে। “কমিটি রাজনৈতিক চাপের কাছে নত হয় না। তাই এই বছর তাঁর পুরস্কার পাওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম” বলেন গ্রেগার।

পুরনো বিতর্কের ছায়া-
নোবেল শান্তি পুরস্কার কখনো বিতর্কমুক্ত ছিল না। ২০০৯ সালে দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ৯ মাস পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এই পুরস্কার পান, যা নিয়ে বিশ্বজুড়ে সমালোচনা শুরু হয়। পরবর্তীতে নোবেল কমিটির সাবেক সচিব গেইর লুন্ডেস্টাড তাঁর স্মৃতিকথায় স্বীকার করেন, ওবামার কূটনৈতিক উদ্যোগকে উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যেই সে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তবে প্রত্যাশিত ফল আসেনি।
এই অভিজ্ঞতা থেকেই কমিটি এখন আরও সতর্ক। বিশ্লেষকরা মনে করেন, বর্তমান কমিটি এমন কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চাইবে না, যা রাজনৈতিক প্রভাবিত বলে মনে হতে পারে—বিশেষত মার্কিন প্রেসিডেন্টের ক্ষেত্রে। ট্রাম্পও ওবামার উদাহরণ টেনে দাবি করেন, “যদি আমার নাম ওবামা হতো, আমি ১০ সেকেন্ডেই নোবেল পেতাম।”
অন্যান্য সম্ভাব্য প্রার্থী-
নোবেল নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বেটিং সংস্থার তালিকায় ট্রাম্প তৃতীয় স্থানে আছেন। সবচেয়ে এগিয়ে আছেন প্রয়াত রুশ বিরোধীদলীয় নেতা অ্যালেক্সেই নাভালনির স্ত্রী ইউলিয়া নাভালনায়া।
এছাড়া সুদানের গৃহযুদ্ধ মোকাবিলায় কাজ করা মানবিক সংস্থাগুলোকেও সম্ভাব্য প্রার্থী ধরা হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, এসব পূর্বাভাস সাধারণত বাস্তব ফলাফলের সঙ্গে মেলে না।
সর্বশেষ সরকারপ্রধান হিসেবে ২০১৯ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পান ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ। পরে তাঁর দেশ ভয়াবহ গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে—যা সেই পুরস্কারের যৌক্তিকতা নিয়েই প্রশ্ন তোলে। এই অভিজ্ঞতা থেকেও নোবেল কমিটি সম্ভবত আরও সংযত থাকবে।
নরওয়ের কূটনৈতিক সংকট-
নোবেল কমিটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন হলেও নরওয়ে সরকারের কূটনৈতিক অবস্থান কখনো কখনো পরোক্ষ প্রভাব ফেলে। গাজা যুদ্ধ নিয়ে সাম্প্রতিক নীতিগত পার্থক্যের কারণে ওয়াশিংটনের সঙ্গে নরওয়ের সম্পর্কে টানাপড়েন বেড়েছে। নরওয়ের সার্বভৌম তহবিল সম্প্রতি ইসরায়েলি ও মার্কিন কিছু কোম্পানি থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করেছে, যার পর যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে পুরস্কার না দেওয়া কূটনৈতিকভাবে বিব্রতকর হতে পারে।
তবু কমিটি বরাবরই স্বাধীন সিদ্ধান্তে অবিচল থেকেছে। তারা রাজনৈতিক চাপ এড়িয়ে বৈশ্বিক শান্তির প্রকৃত বার্তা বহন করতে চায়।
শেষ প্রশ্ন: পাবেন কি ট্রাম্প?
নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রথম দেওয়া হয় ১৯০১ সালে। বিজয়ী পান সনদ, স্বর্ণপদক ও ১১ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনা—প্রায় ১১.৯ লাখ মার্কিন ডলার। কিন্তু এর চেয়ে বড় পুরস্কার হলো বৈশ্বিক মর্যাদা ও ঐতিহাসিক স্বীকৃতি।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য এটি কেবল একটি পদক নয়; বরং তাঁর বৈদেশিক নীতি ও “বিশ্ব পুনর্গঠনকারী নেতা” হিসেবে ভাবমূর্তি প্রমাণের বিষয়। তবু আন্তর্জাতিক সমাজের বিশ্লেষণ বলছে, শান্তি পুরস্কার পেতে তাঁর পথ এখনো দীর্ঘ। আগামী শুক্রবার নরওয়ের স্থানীয় সময় দুপুর ১২টায় বিশ্ব জানতে পারবে—ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের মরিয়া প্রচেষ্টা সফল হয় কি না।
তথ্যসূত্র: অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, ব্লুমবার্গ, এএফপি, নিউইয়র্ক টাইমস

