যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সম্পর্ককে বহু বছর ধরে “বিশেষ সম্পর্ক” বলা হয়। কিন্তু এই সম্পর্ক সব সময় মসৃণ ছিল না। ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে দুই দেশ একসঙ্গে দাঁড়িয়েছে। আবার কিছু সংকটে তাদের অবস্থান হয়েছে ভিন্ন। রাজা চার্লস তৃতীয়ের চার দিনের যুক্তরাষ্ট্র সফর সেই পুরোনো সম্পর্ককে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। যুক্তরাজ্যের যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান টার্নার এই সফরকে দুই মিত্র দেশের “অনন্য বন্ধুত্ব” নতুন করে জোরদার করার উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে সফরটি এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন ওয়াশিংটন ও লন্ডনের সম্পর্কে স্পষ্ট অস্বস্তি দেখা যাচ্ছে।
সোমবার শুরু হওয়া এই সফরের পেছনে কূটনৈতিক সৌজন্য থাকলেও বাস্তবতা আরও জটিল। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সমালোচনা করেছেন। তাঁর অভিযোগ, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানে যুক্তরাজ্য যথেষ্ট সহায়তা করছে না। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে স্টারমারের অবস্থান ওয়াশিংটনের পছন্দ হয়নি।
সংঘাত শুরু হওয়ার কয়েক দিন পর স্টারমার প্রথমে ইরানে হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানান। এরপর ট্রাম্প তাঁকে “উইনস্টন চার্চিল নন” বলে মন্তব্য করেন। এই মন্তব্য শুধু ব্যক্তিগত সমালোচনা নয়; এটি দুই দেশের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যও প্রকাশ করে। যুক্তরাষ্ট্র কখনও কখনও তার ঘনিষ্ঠ মিত্রদের কাছ থেকে নিঃশর্ত সমর্থন প্রত্যাশা করে। কিন্তু যুক্তরাজ্য এখন আগের মতো সরাসরি সব মার্কিন সিদ্ধান্তের পাশে দাঁড়াতে চায় না।
ইতিহাস দেখলে বোঝা যায়, এই টানাপোড়েন নতুন নয়। যুক্তরাষ্ট্র ১৭৭৬ সালে ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। পরে ১৮১২ সালের যুদ্ধেও দুই পক্ষ মুখোমুখি হয়েছিল। তবু পরবর্তী সময়ে তারা বড় কৌশলগত মিত্রে পরিণত হয়। বিশেষ করে বিংশ শতাব্দীতে এই সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়। তবে ঘনিষ্ঠতা মানেই মতবিরোধহীনতা নয়। বরং অনেক সময় বড় মিত্রতার ভেতরেই বড় চাপ তৈরি হয়।
১৯৪০ থেকে ১৯৪৪ সাল ছিল দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে শক্তিশালী অধ্যায়গুলোর একটি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় লন্ডন ও ওয়াশিংটন নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে। তারা সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে মিলে মিত্রশক্তির যুদ্ধকৌশল গড়ে তোলে। এই সময়ে “আগে জার্মানি” নীতি গ্রহণ করা হয়। অর্থাৎ সাম্রাজ্যবাদী জাপানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের আগে নাৎসি জার্মানিকে পরাজিত করাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
১৯৪১ সালের মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট ঋণ-ইজারা আইন অনুমোদন করেন। এই আইনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র যুক্তরাজ্যসহ মিত্রশক্তিকে যুদ্ধসামগ্রী ও সামরিক সরঞ্জাম দেয়। তখনও যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধে প্রবেশ করেনি। ১৯৪১ সালের ডিসেম্বরের আগে ওয়াশিংটনের এই সহায়তা লন্ডনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এটি প্রমাণ করে, দুই দেশের সম্পর্ক শুধু ভাষা বা সংস্কৃতির মিলের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল না; বরং নিরাপত্তা ও কৌশলগত প্রয়োজনও ছিল এর কেন্দ্রে।
তবে ১৯৫৬ সালের সুয়েজ সংকট এই সম্পর্কের বড় ধাক্কা হয়ে আসে। মিসরের প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসের সুয়েজ খাল জাতীয়করণ করলে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও ইসরায়েল গোপনে সামরিক পদক্ষেপ নেয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রকে বিষয়টি জানানো হয়নি। প্রেসিডেন্ট ডুইট আইজেনহাওয়ার এতে ক্ষুব্ধ হন। তিনি আশঙ্কা করেন, সোভিয়েত ইউনিয়ন এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র তখন জাতিসংঘে আক্রমণ নিন্দা করে প্রস্তাবের পক্ষে অবস্থান নেয়। শুধু তা-ই নয়, ওয়াশিংটন তার ইউরোপীয় মিত্রদের আর্থিক সহায়তা বন্ধের হুঁশিয়ারিও দেয়। কয়েক দিনের মধ্যেই সংঘাত থেমে যায়। এই ঘটনা ব্রিটেনকে বুঝিয়ে দেয়, সাম্রাজ্যিক ক্ষমতার পুরোনো যুগ শেষ হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ছাড়া আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে লন্ডনের একক সামরিক পদক্ষেপ টেকসই নয়।
১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধেও দুই দেশের সম্পর্ক পরীক্ষা দেয়। আর্জেন্টিনা ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জে হামলা চালালে যুক্তরাজ্য যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা চায়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে সরাসরি সহায়তা দিতে রাজি হয়নি। কারণ আর্জেন্টিনাও তখন ওয়াশিংটনের মিত্র ছিল। প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারকে শান্তি আলোচনার পরামর্শ দেন। এমনকি দ্বীপগুলোর যৌথ নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাবও সামনে আসে।
থ্যাচার এই প্রস্তাব মানেননি। যুক্তরাজ্য ১০ সপ্তাহের যুদ্ধের পর দ্বীপগুলো পুনর্দখল করে। পরে যুক্তরাষ্ট্র লজিস্টিক সহায়তা দেয়। এই পর্ব দেখায়, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য একই শিবিরে থাকলেও তাদের আঞ্চলিক কৌশল সব সময় এক নয়। ওয়াশিংটন কখনও বৈশ্বিক ভারসাম্য দেখে সিদ্ধান্ত নেয়, আর লন্ডন কখনও জাতীয় মর্যাদা ও ভূখণ্ডের প্রশ্নে কঠোর অবস্থান নেয়।
১৯৯৪ সালে উত্তর আয়ারল্যান্ড ইস্যু দুই দেশের সম্পর্কে আরেকটি সংবেদনশীল মুহূর্ত তৈরি করে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন সিন ফেইন নেতা গেরি অ্যাডামসকে ৪৮ ঘণ্টার ভিসা দেন। তিনি নিউইয়র্কে একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে যান। লন্ডন এই ভিসার বিরোধিতা করেছিল। যুক্তরাজ্যের ধারণা ছিল, অ্যাডামস আইরিশ রিপাবলিকান আর্মির সঙ্গে যুক্ত। সংগঠনটি যুক্তরাজ্য ও আয়ারল্যান্ডে হামলা চালিয়েছিল এবং তাকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে দেখা হতো।
ভিসা দেওয়ার পর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী জন মেজর কয়েক সপ্তাহ ক্লিনটনের ফোন ধরেননি বলে পরে আইরিশ কূটনীতিক শন ডনলন জানান। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এই সিদ্ধান্ত উত্তর আয়ারল্যান্ড শান্তি প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে সাহায্য করে। এর ফল হিসেবে ১৯৯৮ সালের গুড ফ্রাইডে চুক্তির পথ সুগম হয়। অর্থাৎ তাৎক্ষণিক কূটনৈতিক অস্বস্তি কখনও কখনও দীর্ঘমেয়াদি শান্তির সুযোগ তৈরি করতে পারে।
১৯৯৮ থেকে ১৯৯৯ সালের কসোভো যুদ্ধকে অনেকে যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্য সহযোগিতার বড় উদাহরণ হিসেবে দেখেন। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সেখানে মতভেদ ছিল। কসোভোতে জাতিগত আলবেনীয়দের বিরুদ্ধে সার্ব বাহিনীর সহিংসতা, জাতিগত নিধন এবং প্রায় ১০ লাখ মানুষের বাস্তুচ্যুতি পশ্চিমা শক্তিগুলোকে চাপের মুখে ফেলে। তখন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার সামরিক হস্তক্ষেপের পক্ষে জোরালো অবস্থান নেন।
ব্লেয়ার চেয়েছিলেন, প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন আরও কঠোর পদক্ষেপ নিন। স্থলবাহিনী পাঠানোর সম্ভাবনাও আলোচনায় আসে। কিন্তু ক্লিনটন এ বিষয়ে সতর্ক ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র মূলত সীমিত ন্যাটো বিমান হামলার পক্ষে ছিল। যুক্তরাজ্যের উদ্বেগ ছিল, শুধু আকাশ হামলা দিয়ে সার্ব বাহিনীকে থামানো নাও যেতে পারে। শেষ পর্যন্ত ৭৮ দিনের ন্যাটো বোমা হামলার পর যুদ্ধ থামে। এখানে দুই দেশ একই লক্ষ্য চাইলেও পদ্ধতি নিয়ে ভিন্ন চিন্তা করেছিল।
২০০৩ সালের ইরাক আক্রমণ দুই দেশের ঘনিষ্ঠ সামরিক ও রাজনৈতিক সমন্বয়ের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের পরিকল্পনাকে শক্তভাবে সমর্থন করেন। ২০০৩ সালের মার্চে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন আক্রমণে ব্রিটিশ বাহিনী অংশ নেয়। যুক্তরাজ্য তখন ওয়াশিংটনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র ছিল।
ব্রিটেন হাজার হাজার সেনা এবং গোয়েন্দা সহায়তা দেয়। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাজ্যের ভেতরে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি করে। ফ্রান্স ও কানাডার মতো কয়েকটি মার্কিন মিত্র আক্রমণের বিরোধিতা করে। যুক্তরাজ্যের বহু মানুষও যুদ্ধের বিপক্ষে ছিল। লন্ডনে ১০ লাখের বেশি মানুষ প্রতিবাদে রাস্তায় নামে। ফলে ইরাক যুদ্ধ দেখায়, সরকারী মিত্রতা জনমতের সমর্থন ছাড়াই এগোতে পারে, কিন্তু তার রাজনৈতিক মূল্য অনেক বড়।
২০১১ সালের লিবিয়া যুদ্ধের পরও দুই দেশের মধ্যে মতভেদ সামনে আসে। মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতন ও মৃত্যুর পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা লিবিয়া-পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় মিত্রদের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। ২০১৬ সালের এক সাক্ষাৎকারে তিনি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের সমালোচনা করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, সামরিক হস্তক্ষেপের পরবর্তী কাজগুলোতে যথেষ্ট মনোযোগ দেওয়া হয়নি।
এই পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পশ্চিমা সামরিক হস্তক্ষেপে যুদ্ধ জেতা আর স্থিতিশীল রাষ্ট্র গড়া এক বিষয় নয়। লিবিয়া তার বড় উদাহরণ। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য সামরিক অভিযানে একসঙ্গে থাকলেও যুদ্ধ-পরবর্তী দায়িত্ব ভাগাভাগি নিয়ে তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়।
বর্তমান উত্তেজনাও এই দীর্ঘ ইতিহাসের ধারাবাহিকতা। রাজা চার্লস তৃতীয়ের সফর কূটনৈতিকভাবে বন্ধুত্বের বার্তা দেয়। কিন্তু ট্রাম্প ও স্টারমারের মতবিরোধ দেখায়, “বিশেষ সম্পর্ক” এখন আর স্বয়ংক্রিয় সমর্থনের সম্পর্ক নয়। যুক্তরাজ্য তার নিজস্ব রাজনৈতিক হিসাব, জনমত, নিরাপত্তা স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক আইন বিবেচনা করছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এখনো আশা করে, তার ঘনিষ্ঠ মিত্ররা সংকটকালে দ্রুত পাশে দাঁড়াবে।
এই সম্পর্কের শক্তি এখানেই যে মতবিরোধ থাকা সত্ত্বেও দুই দেশ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয় না। আবার দুর্বলতাও এখানেই যে পুরোনো ঐতিহাসিক ঘনিষ্ঠতা নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার চাপ সামলাতে সব সময় যথেষ্ট নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, সুয়েজ, ফকল্যান্ড, উত্তর আয়ারল্যান্ড, কসোভো, ইরাক ও লিবিয়া—প্রতিটি অধ্যায় দেখায়, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সম্পর্ক একই সঙ্গে সহযোগিতা, চাপ, নির্ভরতা এবং প্রতিযোগিতার মিশ্রণ।
তাই রাজা চার্লস তৃতীয়ের এই সফর শুধু আনুষ্ঠানিক সৌজন্য নয়। এটি এক পুরোনো মিত্রতার নতুন পরীক্ষা। প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য কি আবারও তাদের সম্পর্ককে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারবে? নাকি “বিশেষ সম্পর্ক” শুধু ইতিহাসের একটি সুন্দর শব্দবন্ধ হয়ে থাকবে? বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, সম্পর্ক এখনো গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু আগের মতো সরল নয়। বন্ধুত্ব আছে, স্বার্থও আছে। আর আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শেষ পর্যন্ত এই দুইয়ের ভারসাম্যই মিত্রতার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে।
সিভি/এইচএম

