হারেৎজের অনুসন্ধান—
ইরানে ক্ষমতাচ্যুত শাহের পুত্র রেজা পাহলভীকে ঘিরে একটি বিস্তৃত ডিজিটাল প্রভাব ক্যাম্পেইন পরিচালিত হচ্ছে, যার মূল উৎস ইসরায়েল। ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় সমর্থনপ্রাপ্ত এক বেসরকারি সংস্থার অর্থায়নে ফার্সি ভাষায় পরিচালিত এই ক্যাম্পেইনের তথ্য উঠে এসেছে ইসরায়েলি দৈনিক হারেৎজ ও দ্য মার্কার-এর যৌথ অনুসন্ধানে।
প্রচারণার মূল উদ্দেশ্য হলো রেজা পাহলভীর জনপ্রিয়তা বাড়ানো এবং ইরানে শাহের রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিকে শক্তিশালী করা। এতে শতাধিক ভুয়া সামাজিক মাধ্যম অ্যাকাউন্ট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)–নির্ভর ছবি ও ভিডিও ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব অ্যাকাউন্টে ইরানি নাগরিক পরিচয় ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে প্রচারণা অভ্যন্তরীণ বলে মনে হয়।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত ইরানের শেষ শাহের পুত্র রেজা পাহলভী ২০২৩ সালের শুরুতে ইসরায়েলে প্রথম আনুষ্ঠানিক সফর করেন। তখনকার ইসরায়েলি গোয়েন্দা মন্ত্রী ও বর্তমান বিজ্ঞানমন্ত্রী গিলা গামলিয়েল তাকে ‘ইরানের ক্রাউন প্রিন্স’ হিসেবে অভিহিত করেন এবং সফরটিকে দুই দেশের জনগণের মধ্যে বন্ধুত্বের প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করেন।
পাহলভী সফরকালে বলেন, “ইরানের পরিবর্তন আসবে অহিংস প্রতিরোধের মাধ্যমে, তবে আন্তর্জাতিক সহায়তা ছাড়া তা সম্ভব নয়।” তার এই বক্তব্য ইসরায়েল সফরের যৌক্তিকতা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
তবে ইরানের অভ্যন্তরে পাহলভীর প্রতি জনসমর্থন সীমিত। অনেক ইরানি তার পিতার শাসনকালকে দুর্নীতি ও দমননীতির প্রতীক হিসেবে দেখেন। ইসরায়েলি বিশ্লেষক রাজ জিমিটের মতে, অধিকাংশ ইরানি পরিবর্তন চাইলেও তারা রাজতন্ত্রে ফিরতে চান না।
তার ভাষায়, “ইসরায়েল পাহলভীর প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন দেখিয়ে বরং আয়াতুল্লাহ খামেনির যুক্তিকে শক্তিশালী করছে যে, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে পুনরায় এক ক্লায়েন্ট রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়।”
হারেৎজ ও দ্য মার্কার-এর অনুসন্ধান অনুযায়ী, যুদ্ধাবস্থার সময় ইসরায়েলি সোশ্যাল মিডিয়া ক্যাম্পেইনগুলো আরো সক্রিয় হয়ে ওঠে। এক্স (টুইটার) ও ইনস্টাগ্রামে শতাধিক ভুয়া অ্যাকাউন্ট থেকে পাহলভী ও গামলিয়েলের পক্ষে প্রচারণা চালানো হয়, ব্যবহার করা হয় হ্যাশট্যাগ #KingRezaPahlavi।
কানাডার ইউনিভার্সিটি অব টরন্টোর গবেষণা সংস্থা সিটিজেন ল্যাব পৃথকভাবে ফার্সি ভাষায় পরিচালিত আরেকটি ইসরায়েলি নেটওয়ার্ক শনাক্ত করেছে। ৫০টিরও বেশি ভুয়া অ্যাকাউন্টের এই নেটওয়ার্ক ইসরায়েল সরকারের পক্ষে সক্রিয় ছিল বলে তাদের ধারণা। সেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ভিডিও ও ভুয়া সংবাদ ছড়ানো হয়।
সিটিজেন ল্যাব জানায়, নেটওয়ার্কটি ২০২৩ সালে সক্রিয় হয় এবং ২০২৪ সালের জুনে ইরানের এভিন কারাগারে ইসরায়েলি হামলার আগেই বিস্ফোরণসংক্রান্ত পোস্ট করতে শুরু করে। এতে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, ভুয়া অ্যাকাউন্টগুলোর পেছনের ব্যক্তিরা ঘটনার আগাম তথ্য জানত।
এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই নেটওয়ার্কের একটি ভিডিওতে আয়াতুল্লাহ খামেনিকে হিটলারের সঙ্গে তুলনা করে একটি এআইনির্ভর ব্যঙ্গচিত্র তৈরি করা হয়, যা পরবর্তীতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে এখন প্রভাব বিস্তারের লড়াই কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, ডিজিটাল জগতেও তীব্র আকার ধারণ করেছে। ইরান যেখানে ইসরায়েলবিরোধী প্রচারণা চালায়, সেখানে ইসরায়েলও পাল্টা তথ্যযুদ্ধের কৌশল নিচ্ছে।
সিটিজেন ল্যাবের গবেষক আলবার্তো ফিত্তারেল্লি বলেন, “গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর উচিত স্বৈরশাসনের মতো প্রভাব বিস্তারের ক্যাম্পেইনে না জড়ানো। কারণ, এ ধরনের প্রচারণা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তথ্য ও প্রযুক্তিকে ভয়াবহভাবে বিকৃত করছে।”

