ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ চললেও যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান রাজনীতিতে এখন থেকেই ২০২৮ সালের হিসাব শুরু হয়ে গেছে। প্রশ্নটি সরল, কিন্তু তার রাজনৈতিক তাৎপর্য গভীর: ট্রাম্পের পর দলকে নেতৃত্ব দেবেন কে? বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, নাকি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও? এই প্রশ্ন এখন শুধু ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিষয় নয়। এটি রিপাবলিকান পার্টির ভবিষ্যৎ চরিত্র, আদর্শিক অবস্থান এবং বৈদেশিক নীতির দিকনির্দেশনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প ব্যক্তিগত আলোচনায় তার মিত্র ও উপদেষ্টাদের কাছে উত্তরসূরি নিয়ে জানতে চেয়েছেন—জেডি, নাকি মার্কো। এই ছোট প্রশ্নের ভেতরেই বড় রাজনৈতিক সংকেত লুকিয়ে আছে। কারণ ভ্যান্স ও রুবিও দুজনই ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ হলেও তারা রিপাবলিকান রাজনীতির দুই আলাদা ধারাকে প্রতিনিধিত্ব করেন। একজন বেশি জনতাবাদী, জাতীয়তাবাদী এবং যুদ্ধবিরোধী ভাবধারার প্রতিনিধি। অন্যজন বেশি প্রশাসনিক, বৈদেশিক নীতিতে সক্রিয় এবং তুলনামূলকভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতির মুখ। রয়টার্স জানিয়েছে, ২০২৮ সালের নির্বাচন সামনে রেখে দুজনকেই সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জেডি ভ্যান্সের শক্তি হলো তার ভিত্তি। তিনি ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ রাজনীতির সঙ্গে নিজেকে দৃঢ়ভাবে যুক্ত করেছেন। দীর্ঘ যুদ্ধ, বিদেশে সামরিক হস্তক্ষেপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক দায়বদ্ধতা নিয়ে তার অবস্থান বরাবরই সতর্ক। ইরান সংঘাতের ক্ষেত্রেও তিনি তুলনামূলকভাবে সংযত ভূমিকা নিয়েছেন বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে মার্কো রুবিও ট্রাম্পের কঠোর বৈদেশিক অবস্থানকে প্রকাশ্যে সমর্থন করেছেন এবং প্রশাসনের অন্যতম দৃশ্যমান মুখ হয়ে উঠেছেন।
এই পার্থক্যই তাদের রাজনৈতিক লড়াইকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। ভ্যান্স রিপাবলিকান দলের সেই অংশকে আকর্ষণ করেন, যারা যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি সংঘাতে জড়াতে চায় না। তারা ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের সেই দিকটিকে গুরুত্ব দেয়, যেখানে বড় নতুন যুদ্ধ শুরু হয়নি। রুবিও বরং এমন ভোটার ও ক্ষমতাকেন্দ্রের কাছে গ্রহণযোগ্য হচ্ছেন, যারা শক্তিশালী বৈদেশিক অবস্থান, দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং প্রশাসনিক দক্ষতাকে নেতৃত্বের বড় গুণ হিসেবে দেখেন।

সিপ্যাকের সাম্প্রতিক জরিপে ভ্যান্স এখনো এগিয়ে। সেখানে ১ হাজার ৬০০-এর বেশি অংশগ্রহণকারীর মধ্যে প্রায় ৫৩ শতাংশ তাকে ২০২৮ সালের রিপাবলিকান মনোনয়নের পছন্দ হিসেবে বেছে নিয়েছেন। রুবিও পেয়েছেন ৩৫ শতাংশ। তবে এখানে বড় পরিবর্তন হলো, আগের বছর ভ্যান্সের সমর্থন ছিল ৬১ শতাংশ, আর রুবিওর ছিল মাত্র ৩ শতাংশ। অর্থাৎ ভ্যান্স এখনও সামনে থাকলেও রুবিওর উত্থান দ্রুত এবং লক্ষণীয়।
ইউগভের ৮ থেকে ১৩ এপ্রিল ২০২৬ জরিপেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা যায়। রিপাবলিকান ও রিপাবলিকানমনা স্বতন্ত্র ভোটারদের মধ্যে ৬৩ শতাংশ বলেছেন, তারা জেডি ভ্যান্সকে ২০২৮ সালের রিপাবলিকান প্রাইমারিতে বিবেচনা করতে পারেন। একই প্রশ্নে মার্কো রুবিওর পক্ষে বলেছেন ৪২ শতাংশ। এই জরিপে ২ হাজার ১৮৯ জন প্রাপ্তবয়স্ক মার্কিন নাগরিক অংশ নেন।
ভ্যান্সের জন্য সুবিধা হলো, তিনি এখন ভাইস প্রেসিডেন্ট। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এই পদ নিজেই ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্ট প্রার্থিতার একটি বড় মঞ্চ। কিন্তু এই পদই আবার তার জন্য ঝুঁকিও তৈরি করছে। প্রশাসনের জনপ্রিয়তা কমলে তার প্রভাব সরাসরি ভ্যান্সের ওপর পড়ে। নিউজউইকের প্রতিবেদনে সিএনএনের বিশ্লেষণ উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ভ্যান্সের নেট অনুমোদন হার এক পর্যায়ে মাইনাস ১৮-তে নেমেছে। একই পর্যায়ে আধুনিক কালের অন্যান্য ভাইস প্রেসিডেন্টদের তুলনায় এটি দুর্বল অবস্থান হিসেবে দেখানো হয়েছে।
রুবিওর অবস্থান আলাদা। তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট নন, কিন্তু পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে বৈদেশিক নীতি, জাতীয় নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক সংকটের কেন্দ্রে রয়েছেন। রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, ইরান সংঘাত, ভেনেজুয়েলা এবং অন্যান্য উচ্চঝুঁকির বৈদেশিক বিষয়ে তার ভূমিকা তাকে প্রশাসনের ভেতরে দৃশ্যমান করেছে। ফলে তিনি শুধু ট্রাম্পের অনুগত নন, বরং একজন কার্যকর নীতিনির্ধারক হিসেবেও নিজেকে তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছেন।
তবে রুবিওর দুর্বলতাও স্পষ্ট। রিপাবলিকান দলের কট্টর জনতাবাদী অংশ তাকে সহজে বিশ্বাস করে না। তাদের চোখে রুবিও একসময় পুরোনো রক্ষণশীল রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ছিলেন। তিনি ২০১৬ সালেও ট্রাম্পের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। পরে ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামত করলেও সন্দেহ পুরোপুরি দূর হয়নি। রিপাবলিকান ঘাঁটির একাংশ মনে করে, রুবিও যুদ্ধনীতি ও বৈদেশিক হস্তক্ষেপে বেশি আগ্রহী। ইরান সংঘাত দীর্ঘ হলে এই অভিযোগ তার বিরুদ্ধে আরও জোরালো হতে পারে।
ভ্যান্সের সমস্যাটি ভিন্ন। তার প্রতি ট্রাম্পভিত্তিক ভোটারদের আবেগ আছে, কিন্তু তার গ্রহণযোগ্যতা সব স্তরে সমান নয়। তিনি অনেক সময় তীক্ষ্ণ, সংঘাতপ্রবণ এবং আদর্শিকভাবে কঠোর হিসেবে দেখা দেন। এতে মাগা ঘাঁটির একটি অংশ উজ্জীবিত হয়, কিন্তু সাধারণ নির্বাচনে মধ্যমপন্থী বা অনিশ্চিত ভোটারদের কাছে তার আবেদন সীমিত হতে পারে। ২০২৮ সালে রিপাবলিকান প্রার্থীকে শুধু দলীয় প্রাইমারি জিতলেই হবে না; জাতীয় নির্বাচনে বিস্তৃত ভোটারগোষ্ঠীকেও আকর্ষণ করতে হবে।
ট্রাম্প এখনো কাউকে প্রকাশ্যে উত্তরসূরি ঘোষণা করেননি। রয়টার্সের ফেব্রুয়ারি ২০২৬ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি ভ্যান্স ও রুবিও দুজনকেই প্রশংসা করেছেন এবং এই বিতর্কে সরাসরি পক্ষ নিতে চাননি। তিনি এমন ইঙ্গিতও দিয়েছেন যে, ভ্যান্স ও রুবিও একই টিকিটে থাকলে তা শক্তিশালী হতে পারে।
এই অবস্থান ট্রাম্পের রাজনৈতিক কৌশলের সঙ্গে যায়। তিনি সাধারণত সম্ভাব্য উত্তরসূরিদের মধ্যে প্রতিযোগিতা জীবিত রাখেন। এতে সবাই তার প্রতি অনুগত থাকে, আবার কেউ অতিরিক্ত শক্তিশালী হয়ে স্বাধীন ক্ষমতাকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে না। ভ্যান্স জানেন, ট্রাম্পের আনুষ্ঠানিক সমর্থন ছাড়া তার পথ কঠিন হতে পারে। রুবিওও জানেন, ট্রাম্পের আস্থা হারালে তার দ্রুত উত্থান থেমে যেতে পারে।
ইরান যুদ্ধ এই লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয়ে উঠেছে। সংঘাত দ্রুত ও ট্রাম্পের পক্ষে সুবিধাজনকভাবে শেষ হলে রুবিও বলতে পারবেন, কঠোর অবস্থান ফল দিয়েছে। এতে তিনি স্থির, দৃঢ় এবং কার্যকর রাষ্ট্রনায়কের ভাবমূর্তি পাবেন। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘ হলে, জ্বালানির দাম বাড়লে বা জনমত আরও নেতিবাচক হলে ভ্যান্সের সতর্ক অবস্থান বেশি গ্রহণযোগ্য হতে পারে। রয়টার্সও এই সংঘাতের ফলাফলকে ভ্যান্স ও রুবিওর ২০২৮ সম্ভাবনার সঙ্গে যুক্ত করেছে।
সুতরাং লড়াইটি কেবল দুই ব্যক্তির নয়। এটি রিপাবলিকান দলের আত্মপরিচয়ের লড়াই। ভ্যান্স জিতলে দল আরও সরাসরি জনতাবাদী, জাতীয়তাবাদী এবং সামরিক হস্তক্ষেপবিরোধী পথে যেতে পারে। রুবিও এগিয়ে গেলে দল ট্রাম্পের কঠোর নীতি ধরে রাখলেও তা আরও প্রাতিষ্ঠানিক, প্রশাসনিক এবং আন্তর্জাতিকভাবে সক্রিয় রূপ পেতে পারে।
শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ের ওপর। প্রথমত, ট্রাম্প কার দিকে ঝুঁকবেন। দ্বিতীয়ত, ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের ফল কেমন হয়। তৃতীয়ত, ইরানসহ বড় বৈদেশিক সংকটগুলো কীভাবে শেষ হয়। এখন পর্যন্ত ভ্যান্স সংখ্যায় এগিয়ে, কিন্তু রুবিও গতিতে এগোচ্ছেন। আর রাজনীতিতে অনেক সময় বর্তমান অবস্থানের চেয়ে গতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
২০২৮ এখনো দূরে। কিন্তু রিপাবলিকান পার্টির ভেতরে ভবিষ্যতের যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। ভ্যান্সের হাতে আছে ট্রাম্পের জনতাবাদী উত্তরাধিকার। রুবিওর হাতে আছে প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও দ্রুত বাড়তে থাকা গ্রহণযোগ্যতা। ট্রাম্পের পর রিপাবলিকান রাজনীতি কোন পথে যাবে, তার উত্তর সম্ভবত এই দুই নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে।
সিভি/এইচএম

