ইরান, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এক দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের পর এটি বন্ধ করতে তিন ধাপে সংলাপের প্রস্তাব দিয়েছে। এই প্রস্তাবে হরমুজ প্রণালির ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, যা বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি তেল সরবরাহের পথ। ইরান বলেছে, যদি যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালির ওপর অবরোধ তুলে নেয়, তবে তারা পরমাণু কর্মসূচি সম্পর্কিত আলোচনা চালানোর প্রস্তুতি নিয়ে রয়েছে।
ইরান এর পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ইসলামাবাদ সফরের সময় পাকিস্তান, মিসর, তুরস্ক, এবং কাতারের কর্মকর্তাদের সাথে এই প্রস্তাব ভাগাভাগি করেন। তবে পরমাণু সমস্যার সমাধানের জন্য ঠিক কীভাবে আলোচনা চলবে, তা নিয়ে এখনও স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা প্রদান করেনি তেহরান। যুক্তরাষ্ট্র বারবার বলেছে, ইরানকে তার পরমাণু কর্মসূচি বন্ধ করতে হবে এবং তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করতে হবে।
বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করে, যা তেল ব্যবসায়ীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রণালি বন্ধ হলে সরবরাহ শৃঙ্খলে তীব্র চাপ সৃষ্টি হয়, যার প্রভাব বিশ্বব্যাপী তেলের দাম বৃদ্ধিতে রূপান্তরিত হতে পারে। বর্তমানে, অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৯ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
ইরান জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া হলে তারা পরমাণু সমস্যার সমাধান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনা শুরু করতে প্রস্তুত। এই আলোচনা পরমাণু সমৃদ্ধকরণের সীমাবদ্ধতা, নিরাপত্তা এবং পরমাণু অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কিত হতে পারে। তবে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পরমাণু কর্মসূচির বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিলেও, ইরান বলছে যে, তাদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা চলবে।
রাশিয়া, যা এই সংকটের সময় ইরানের পাশে দাঁড়িয়ে আছে, তাদের উপর অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইরানের জনগণের স্বাধীনতা রক্ষায় তাদের প্রশংসা করেছেন এবং জানিয়েছেন, রাশিয়া তেহরানকে সব ধরনের সহায়তা প্রদান করবে। অন্যদিকে, পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে এবং ইরান তাদের প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পৌঁছে দিয়েছে।
এদিকে, লেবাননে ইসরায়েলের হামলা অব্যাহত রয়েছে। গত রোববার, এক হামলায় নারী-শিশুসহ অন্তত ১৪ জন নিহত হয়েছেন। ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে নতুন এলাকা দখল করতে বলছে, যার মধ্যে ১০ কিলোমিটার এলাকা এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। যুদ্ধবিরতি ভেঙে ইসরায়েল এই হামলাগুলো চালাচ্ছে, যা পরিস্থিতি আরও জটিল করছে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার প্রভাব বিশ্ববাজারে স্পষ্ট হচ্ছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম প্রায় ২ শতাংশ বেড়ে ১০৯.৩৩ ডলারে পৌঁছেছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, যদি প্রণালিটি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে, তবে এর প্রভাব বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খলে বিশাল প্রভাব ফেলবে, যার ফলে প্রয়োজনীয় পণ্যসহ নানা ধরনের দ্রব্যের দাম বেড়ে যেতে পারে।
বিশ্বব্যাপী অস্থিরতা ও সংকটের মধ্যে তেল ব্যবসায়ীরা একটি স্থিতিশীল যুদ্ধবিরতি বা সমঝোতার দিকে নজর দিচ্ছেন। যুদ্ধবিরতির জন্য সুনির্দিষ্ট প্রমাণের জন্য অপেক্ষা করছেন তারা। এই বৈশ্বিক সংকটের পরিস্থিতি আরও কিছুদিন চলতে থাকলে, তেলের মূল্য আরও বৃদ্ধি পেতে পারে, যা বিশ্ব অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।
হরমুজ প্রণালির সুরক্ষা ও স্থিতিশীলতা এখন বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও সংলাপের প্রক্রিয়া চলছে, তবে এই সংকটের নিরসন হওয়ার আগ পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা ও উচ্চমূল্যের চাপ অব্যাহত থাকবে।
সিভি/এইচএম

