গণহত্যা মানবতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে জঘন্য অপরাধগুলোর একটি। আন্তর্জাতিক আইনসহ বহু দেশের আইনে এ ধরনের অপরাধকে সর্বোচ্চ পর্যায়ের অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর জন্য মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের মতো কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। ইতিহাসে বহু স্বৈরশাসক, সরকারপ্রধান ও ক্ষমতাশালী নেতাকে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত করে বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে মৃত্যুদণ্ডও দেওয়া হয়েছে।
সোমবার মানবতাবিরোধী অপরাধে সর্বশেষ দণ্ডিত হিসেবে যুক্ত হলেন বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর মধ্য দিয়ে তিনি ইরাকের সাদ্দাম হোসেন, সার্বিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট স্লোবোদান মিলোশেভিচ, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার রাদোভান কারাদজিক এবং ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর সাবেক প্রেসিডেন্ট জোসেফ কাবিলার মতো নেতাদের পাশে নিজের নাম লেখালেন।
এই রায় আরও একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। ২৩০ বছর পর প্রথম কোনো নারী সরকারপ্রধান মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হলেন। এর আগে ১৭৯৩ সালের ১৬ অক্টোবর ফ্রান্সের সম্রাট ষোড়শ লুইয়ের স্ত্রী মারি এন্তনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। একই বছরের জানুয়ারিতে গিলোটিনে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল ষোড়শ লুইয়েরও।
বাংলাদেশে সরকারের সর্বোচ্চ পদধারী কারও বিরুদ্ধে গণহত্যার দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এটিই প্রথম রায়। এ মামলায় শেখ হাসিনা ছাড়াও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অপর আসামি সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন রাজসাক্ষী হওয়ায় তাকে লঘুদণ্ড হিসেবে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়েছিল। মূল অভিযোগ ছিল—২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টে আন্দোলনের সময় বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক ও পদ্ধতিগত দমন-পীড়নের নির্দেশ দেওয়া। ট্রাইব্যুনাল বলেছে, এই নির্দেশের ফলে গণহত্যা, খুন, অঙ্গহানি এবং নানামুখী নির্যাতন সংঘটিত হয়। তদন্তে উঠে এসেছে যে শেখ হাসিনা রাষ্ট্রীয় বাহিনী, আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠন—বিশেষ করে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের সশস্ত্র ক্যাডারদের বিক্ষোভ দমনে সরাসরি নির্দেশ দিয়েছিলেন। এর ফলে দেড় হাজারের বেশি মানুষ নিহত এবং অন্তত ২৫ হাজার আহত হয়।
গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত বা অভিযুক্ত সরকারপ্রধানরা
সাদ্দাম হোসেন (ইরাক)
২০০৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর মার্কিন বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন। ১৯৮২ সালে ১৪৮ জন শিয়া হত্যার অভিযোগে একটি ইরাকি আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। দীর্ঘ ৩৯ বছরের শাসনামলে তার নির্দেশে বহু মানুষ নিহত হন বলে প্রচলিত রয়েছে। ২০০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
কিম জং ইল (উত্তর কোরিয়া)
উত্তর কোরিয়ার সর্বাধিনায়ক কিম জং ইল ১৯৯৪ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত দেশ শাসন করেন। তার শাসনামলে বিরোধী মত দমন, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন এবং বন্দিশিবিরে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। যদিও আন্তর্জাতিক আদালতে তার বিচার হয়নি, জাতিসংঘসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনে তার শাসনামলের মানবাধিকার লঙ্ঘনকে মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং অনেক ক্ষেত্রে গণহত্যার সমতুল্য বলা হয়। ২০১১ সালের ১৭ ডিসেম্বর হার্ট অ্যাটাকে তার মৃত্যু হয়।
পল পট (কম্বোডিয়া)
খেমাররুজ নেতা পল পট ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ গণহত্যার এক নায়ক। ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ সালের মধ্যে তার নেতৃত্বে কম্বোডিয়ায় ১৭ থেকে ২২ লাখ মানুষ মারা যায়। প্রায় অর্ধেক মানুষ খেমাররুজ সেনাদের হাতে খুন হন। জীবদ্দশায় তার বিচার হয়নি। ১৯৯৮ সালে গৃহবন্দি অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
স্লোবোদান মিলোশেভিচ (সার্বিয়া)
বলকানের ‘কসাই’ নামে পরিচিত মিলোশেভিচ বসনিয়া, ক্রোয়েশিয়া ও কসোভোতে গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত ছিলেন। আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতে তার বিচার চলছিল। ২০০৬ সালে কারাগারে হৃদরোগে তার মৃত্যু হওয়ায় মামলার রায় ঘোষণা করা হয়নি।
ওমর আল-বশির (সুদান)
দারফুরে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে সুদানের সাবেক প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশির ২০০৯ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানার মুখে পড়েন। ২০১৯ সালে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। বয়স বিবেচনায় তাকে কারাগারের বদলে সংশোধনাগারে পাঠানো হয়।
হিসেন হাব্রে (চাদ)
চাদের সাবেক প্রেসিডেন্ট হিসেন হাব্রের বিরুদ্ধে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ হত্যার অভিযোগ রয়েছে। সেনেগালে বিশেষ আফ্রিকান ট্রাইব্যুনালে বিচার শেষে ২০১৬ সালে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
রাদোভান কারাদজিক (বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা)
কারাদজিক ছিলেন বসনিয়ান সার্বদের ঘোষিত কথিত রাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট। ১৯৯৫ সালের স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যায় আট হাজারের বেশি মুসলমান নিহত হন। ২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়।
জোসেফ কাবিলা (ডিআর কঙ্গো)
২০০১ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত কঙ্গোর প্রেসিডেন্ট ছিলেন জোসেফ কাবিলা। ২০২১ সালে একটি সামরিক আদালত তার অনুপস্থিতিতে দেশদ্রোহিতা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়।
বিভিন্ন দেশে সরকারপ্রধানদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড
ইয়ন আন্তোনেস্কু (রোমানিয়া)
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানপন্থি স্বৈরশাসক আন্তোনেস্কুকে ১৯৪৬ সালে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
নিকোলাই চাউসেস্কু (রোমানিয়া)
২৪ বছর কঠোর শাসনের পর ১৯৮৯ সালে বিপ্লবে উৎখাত হন চাউসেস্কু। গণহত্যা ও অন্যান্য অপরাধে অভিযুক্ত করে স্ত্রীসহ তাকে ফায়ারিং স্কোয়াডে হত্যা করা হয়।
জুলফিকার আলি ভুট্টো (পাকিস্তান)
১৯৭৭ সালে সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ভুট্টোকে হত্যা মামলায় দোষী সাব্যস্ত করে ১৯৭৯ সালের ৪ এপ্রিল ফাঁসি দেওয়া হয়।
ষোড়শ লুই (ফ্রান্স)
ফরাসি বিপ্লবের সময় গিলোটিনে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়।
মারি এন্তনে (ফ্রান্স)
অঢেল ব্যয়ের কারণে জনরোষে থাকা মারি এন্তনের বিচার শেষে ১৭৯৩ সালে গিলোটিনে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
প্রথম চার্লস (ইংল্যান্ড)
বিপ্লবে পরাজয়ের পর দেশদ্রোহিতার অভিযোগে ১৬৪৯ সালে কুঠারাঘাতে তার শিরশ্ছেদ করা হয়।
অ্যান বলিন (ইংল্যান্ড)
রাজা অষ্টম হেনরির দ্বিতীয় স্ত্রী অ্যান বলিনকে ১৫৩৬ সালে পরকীয়ার অভিযোগে শিরশ্ছেদ করা হয়। তার কন্যাই পরবর্তীতে হন বিখ্যাত রানি প্রথম এলিজাবেথ।
আদনান মেন্দারেস (তুরস্ক)
১৯৬০ সালের সামরিক ক্যুর পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মেন্দারেসকে গণহত্যা, দুর্নীতি ও সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। ১৯৬১ সালে তাকে ফাঁসি দেওয়া হয়।
মোহাম্মদ মুরসি (মিসর)
২০১৪ সালে মিসরে মুরসিসহ ৫২৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয় আদালত। তবে ২০১৯ সালে আদালতে শুনানির সময় তার মৃত্যু হওয়ায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়নি।

