রাশিয়ার লাগাতার আক্রমণে বিপর্যস্ত ইউক্রেন তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাকে আরও শক্তিশালী করতে ফ্রান্সের সাথে একটি বড় ধরনের চুক্তিতে পৌঁছেছে। এই চুক্তির আওতায় প্যারিস ইউক্রেনকে দেবে শতটি রাফাল এফ–৪ যুদ্ধবিমান এবং উন্নতমানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা—যা দেশটির নিরাপত্তা কৌশলে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।
ফ্রান্সের একটি বিমানঘাঁটিতে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর উপস্থিতিতে স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এই পদক্ষেপকে বললেন “ঐতিহাসিক।” তিনি জানান, আগামী ১০ বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে সরবরাহ করা হবে এসব অত্যাধুনিক বিমান। পাশাপাশি এ বছর থেকেই শুরু হচ্ছে ইন্টারসেপ্টর ড্রোনের যৌথ উৎপাদন।

চুক্তির আর্থিক দিক এখনও নির্ধারিত হয়নি, তবে ফ্রান্স চেষ্টা করছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের তহবিল ব্যবহার করতে। এছাড়া জব্দ করা রুশ সম্পদ ব্যবহারের কথাও ভাবছে প্যারিস—যা বর্তমানে ইইউ’র ভেতরে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
জেলেনস্কি জানান, যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি তারা পাচ্ছেন শক্তিশালী ফরাসি রাডার ও অন্তত আটটি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। তার ভাষায়, “এই প্রযুক্তিগুলো শুধু অস্ত্র নয়, মানুষের জীবন বাঁচানোর উপায়।”
রাশিয়া সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইউক্রেন জুড়ে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বাড়িয়েছে। জ্বালানি ও রেল অবকাঠামোতে লক্ষ্য করে করা এসব হামলায় একের পর এক ব্ল্যাকআউট এবং অসংখ্য বেসামরিক হতাহতের ঘটনা ঘটছে। সর্বশেষ হামলায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বালাক্লিয়া শহরে তিনজন নিহত ও ১৫ জন আহত হওয়ার খবর এসেছে।
এমন পরিস্থিতিতেই ম্যাক্রোঁ ঘোষণা দেন, “আমরা ১০০টি রাফাল দিতে যাচ্ছি—এটি ইউক্রেনের সামরিক সক্ষমতার পুনর্জন্ম।” তিনি বলেন, ইউক্রেনকে ভবিষ্যতের যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত করতেই এই সহায়তা।
ইউক্রেনীয় প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক সের্হি কুজান জানান, রাশিয়া প্রতি মাসে প্রায় ছয় হাজার গ্লাইড বোমা ব্যবহার করছে। তাই ২০০ কিলোমিটার পাল্লার আকাশ-থেকে-আকাশ ক্ষেপণাস্ত্র ইউক্রেনের জন্য অত্যন্ত জরুরি, বিশেষ করে যখন রাশিয়ার নিজস্ব সিস্টেমের পাল্লা আরও বেশি।

তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, রাফালের মতো উন্নত যুদ্ধবিমান পেতে সময় লাগবে এবং এর কার্যকারিতা অনেকটাই নির্ভর করবে প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের ওপর। অতীতে লেপার্ড ট্যাংক ও এফ–১৬ যুদ্ধবিমানের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে, অস্ত্রের সঙ্গে প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তাই আসল শক্তি।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—এই যুদ্ধবিমান কেনার খরচ কে দেবে? ফ্রান্স নিজস্ব বাজেট থেকে সহায়তার কথা বললেও ইইউর যৌথ ঋণ ব্যবস্থাও বিবেচনায় রয়েছে। কিন্তু ব্রাসেলসে শীর্ষ নেতারা স্বীকার করছেন, ইউক্রেন সহায়তায় বরাদ্দ অর্থ ধীরে ধীরে ফুরিয়ে আসছে। জব্দ করা রুশ সম্পদ ব্যবহারের প্রস্তাবও এখনো আইনগত জটিলতায় আটকে আছে।
ইউক্রেন এরই মধ্যে ফরাসি মিরাজ ও মার্কিন এফ–১৬ বিমানের প্রশিক্ষণ শুরু করেছে। সুইডিশ গ্রিপেন যুদ্ধবিমান পাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। ফ্রান্স সফর শেষে জেলেনস্কি স্পেনে যাবেন আরও সহায়তা নিশ্চিত করতে। এর আগে তিনি গ্রিসের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্যাস চুক্তি করেছেন, যার ফলে আসন্ন শীতে বলকান অঞ্চল হয়ে মার্কিন তরলীকৃত গ্যাস ইউক্রেনে পৌঁছাবে।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে পুতিনের পূর্ণমাত্রার আক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত ইউক্রেনের প্রায় ২০ শতাংশ ভূখণ্ড রাশিয়ার দখলে। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পরও রুশ বাহিনী ধীরগতিতে হলেও অগ্রসর হচ্ছে। এ অবস্থায় ফরাসি যুদ্ধবিমান চুক্তি ইউক্রেনের জন্য আশা জাগানো হলেও, এর প্রভাব দৃশ্যমান হতে সময় লাগবে বলেই বিশ্লেষকদের ধারণা।

