সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন। ওয়াশিংটনে শুরু হতে যাওয়া এ সফরে তিনি দেশটির কাছে এমন সব প্রযুক্তি ও সামরিক সুবিধা চাইবেন, যা কাতারের সঙ্গে হওয়া চুক্তিকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। পরমাণু সুরক্ষা থেকে এআইচালিত ড্রোন এবং উন্নত চিপ প্রযুক্তি—সব মিলিয়ে তাঁর দাবি–দাওয়ার তালিকা এ মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরবের শক্তিশালী অবস্থানকেই প্রতিফলিত করছে। বিষয়টি তুলে ধরেছেন সিন ম্যাথিউস, যার বিশ্লেষণ ১৪ নভেম্বর প্রকাশিত হয় মিডল ইস্ট আই–এ।
ওয়াশিংটনের পথে থাকা সৌদি যুবরাজ গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যার মুখে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের যুক্তরাষ্ট্রের চাপও সামলে এগোচ্ছেন। গত গ্রীষ্মে ইসরায়েল ও ইরানের সরাসরি সংঘাত থেকে দূরে থেকে তিনি আঞ্চলিক প্রভাব বাড়িয়েছেন। তাঁর আত্মবিশ্বাসের কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তিনি বিশাল এক প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা প্যাকেজ চাইছেন। বিপরীতে মার্কিন প্রেসিডেন্টও পরমাণু নিরাপত্তা প্রযুক্তি থেকে এআই–এর মতো মূল্যবান উপাদান আলোচনায় তুলতে প্রস্তুত।
এই সফরের সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন–সংক্রান্ত নিরাপত্তা উদ্বেগের ওপর। একই সঙ্গে বিশ্বের প্রধান অর্থনীতির দেশগুলোর কাছে উচ্চমূল্যের প্রযুক্তি বিক্রি করা যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি অগ্রাধিকার। বৈশ্বিক মন্দার পরিস্থিতিতেও সৌদি আরবের হাতে এখন বড় অঙ্কের বিনিয়োগ সক্ষমতা রয়েছে।
আগে মধ্যপ্রাচ্যের নেতারা হোয়াইট হাউসে আসতেন বোয়িং বা লকহিড মার্টিনের মতো প্রতিষ্ঠানের প্রচলিত অস্ত্র কেনার আলোচনায় অংশ নিতে। ইরানের শাহ এ ধরনের দীর্ঘ কেনাকাটার জন্য বিখ্যাত ছিলেন। তবে বিশ্লেষকদের মতে, মোহাম্মদ বিন সালমান যে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি তালিকা সামনে এনেছেন, তা তাঁর দেশের ভবিষ্যৎমুখী দৃষ্টিভঙ্গিকেই তুলে ধরে।
এডেলম্যান পাবলিক অ্যান্ড গভর্নমেন্ট অ্যাফেয়ার্সের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক প্রেসিডেন্ট আয়হাম কামেল বলেন, এমবিএস কোনো নির্দিষ্ট ক্ষেত্র নয় বরং দীর্ঘমেয়াদি দ্বিমুখী প্রযুক্তি ও বাণিজ্য সহযোগিতা গড়ে তুলতে চান। তাঁর মতে, রিয়াদ বহুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চাইছে এবং ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠতাকে কৌশলগতভাবে কাজে লাগাচ্ছে।
পরমাণু সুরক্ষা ও প্রতিরক্ষা কাঠামো
সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক সুরক্ষার আওতায় আসার ব্যাপারে চাপ বাড়াচ্ছে। কাতারে হামাস আলোচকদের ওপর ইসরায়েলি হামলার কয়েক দিনের মধ্যেই তারা পাকিস্তানের সঙ্গে এক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে। পাকিস্তানের কাছে প্রায় ১৭০টি ওয়ারহেড রয়েছে বলে ধারণা। দুই দেশই জানায়, ওই চুক্তিতে সব ধরনের সামরিক বিকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
যদিও যুক্তরাষ্ট্র–সৌদি পারমাণবিক আলোচনার বিষয়বস্তু গোপন রাখা হয়েছে, একজন সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, এই প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য হতে পারে সৌদি আরবকে পাকিস্তানের পারমাণবিক ছাতা থেকে সরিয়ে আনা। তাঁর মতে, আসন্ন আলোচনায় সৌদির সঙ্গে মার্কিন পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবস্থার কোনো মাত্রায় সংযুক্তির ইঙ্গিত আসতে পারে।
মিডল ইস্ট আই–এর আগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, কাতারে ইসরায়েলি হামলার অনুমোদন দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন তেলসমৃদ্ধ অঞ্চলে নিরাপত্তা রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের পুরোনো ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তবে সৌদির বিশ্বাসহীনতার শুরু আরও আগে—২০১৯ সালে আরামকো স্থাপনায় ইরানের হামলার পর। সেই সময় যুক্তরাষ্ট্র ইরান বা হুতি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত ছিল না।
রিয়াদের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক হেশাম আলঘান্নাম বলেন, সৌদি আরব এখন প্রতীকী সুরক্ষা নয় বরং কার্যকর প্রতিরক্ষাব্যবস্থা চায়। শুধু সমঝোতা স্মারক নয়, সুস্পষ্ট পরিকল্পনাসহ প্রতিরক্ষা নিশ্চয়তা তাদের লক্ষ্য। তিনি জানান, রিয়াদ বর্তমানে যে আংশিক প্রস্তাব পাচ্ছে, তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু চাইছে।
সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মুসাদ আল-আইবান ওয়াশিংটনে সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতির চূড়ান্ত আলোচনা করছেন। যুবরাজের সফর শুরুর আগেই সৌদি আরব আলোচনার টেবিল থেকে ইসরায়েলের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের বিষয়টি সরিয়ে ফেলতে সক্ষম হয়েছে—যা এই সফরের প্রথম সাফল্য।
গাজায় ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মধ্যেও সৌদি আরব এখনো ইসরায়েলের সঙ্গে স্বাভাবিকীকরণ আলোচনা চালাতে রাজি নয়। তারা যুদ্ধবিরতি ছাড়াও একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের অগ্রগতি দেখতে চায়—যা ইসরায়েল গ্রহণ করছে না।
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ অধিকার
যুক্তরাষ্ট্র–সৌদির বেসামরিক পরমাণু চুক্তি আলোচনাও চলছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ২০০৯ সালে যে ‘১২৩ চুক্তি’ করেছে, সেখানে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ থেকে তাদের বিরত থাকতে হয়েছে। কিন্তু সৌদি যুবরাজ এমন একটি চুক্তি চাইছেন, যাতে তাদের সমৃদ্ধকরণের অধিকার থাকবে। তাঁদের দাবি, দেশে প্রচুর ইউরেনিয়াম মজুত আছে এবং নিজেরাই তা সমৃদ্ধ করলে বড় অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া সম্ভব।
সৌদি জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আব্দুল আজিজ বিন সালমান জানিয়েছেন, সৌদি আরব ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করবে এবং তা বিক্রিও করবে। সৌদি বিশ্লেষকদের মতে, সমৃদ্ধকরণ অস্বীকার করা হলে সৌদির জন্য এটি হবে বড় ছাড়।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বার্নার্ড হেকেল মনে করেন, সৌদি আরব হয়তো সমৃদ্ধকরণ সাময়িকভাবে স্থগিত করতে পারে, তবে এর বিনিময়ে তারা মার্কিন পারমাণবিক সুরক্ষার নিশ্চয়তা চাইবে—যার মধ্যে সৌদির মাটিতে মার্কিন পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েনও থাকতে পারে।
মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ গ্রেগরি গাউস বলেন, সৌদি আরবে পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েন করতে কংগ্রেসের অনুমোদন লাগে না। ট্রাম্প চাইলে ভারত মহাসাগরে পারমাণবিক সাবমেরিন টহলের প্রতিশ্রুতিও দিতে পারেন।
এফ–৩৫ যুদ্ধবিমান ও সামরিক প্রযুক্তি
ওয়াশিংটন সফরে যুবরাজের সঙ্গে ১৮টি বিমানভর্তি প্রায় এক হাজার কর্মকর্তা যাওয়ার কথা। ২০১৮ সালের পর এটি তাঁর প্রথম যুক্তরাষ্ট্র সফর। সেই বছরই ওয়াশিংটন পোস্টের সাংবাদিক জামাল খাসোগিকে হত্যার ঘটনায় তাঁকে জড়িয়ে তীব্র সমালোচনা উঠেছিল। বাইডেনও সে সময় কঠোর অবস্থান নেন। তবে ইউক্রেন যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের সৌদি জ্বালানির প্রয়োজন বাড়ায় দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়ে যায়।
মে মাসে ট্রাম্পের উপসাগর সফরে যে ১৪ হাজার ২০০ কোটি ডলারের প্রতিরক্ষা ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, তার অংশ হিসেবে সৌদি আরবের কাছে ৪৮টি পর্যন্ত এফ–৩৫ বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে। ইসরায়েল অঞ্চলে একমাত্র দেশ হিসেবে এফ–৩৫ পরিচালনা করে এবং তারা এই যুদ্ধবিমানকে সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের মূল উপাদান হিসেবে দেখে। তাই সৌদিতে এফ–৩৫ বিক্রিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কিছু কর্মকর্তা উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।
এফ–৩৫–এ যুক্তরাষ্ট্রের ‘কিল সুইচ’ ক্ষমতা রয়েছে—অর্থাৎ দূর থেকেই বিমান অকার্যকর করা যায়। বিশ্লেষক রিচার্ড আবৌলাফিয়া মনে করেন, ইসরায়েলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে হলে এই বিক্রি যুক্তরাষ্ট্রকে বড় জটিলতায় ফেলবে। তবে ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত অধিকার পায়, যা সৌদি আরব পায় না।
সৌদি আরবের প্রধান চাহিদা ‘স্থানীয়করণ’। অর্থাৎ মার্কিন সহায়তা ছাড়া সৌদি অ্যারাবিয়ান মিলিটারি ইন্ডাস্ট্রিজ গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হতে পারবে না বলে বিশ্লেষক আলঘান্নাম মনে করেন।
ড্রোন, এআই ও ডেটা সেন্টার
সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্র এমকিউ–৯ রিপার ড্রোনের বিশাল একটি চুক্তি নিয়ে আলোচনা করছে। একই সঙ্গে সৌদি আরব মার্কিন স্টার্ট–আপ শিল্ড এআই–এর সঙ্গেও আলোচনা করছে। তাদের এআইচালিত ভি–ব্যাট ড্রোন ইউক্রেনে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং আকাশ থেকে আকাশে ও আকাশ থেকে ভূমিতে হামলার সক্ষমতা রাখে। সৌদি আরব যুদ্ধবিমান–সহযোগী কোলাবোরেটিভ কমব্যাট এয়ারক্র্যাফট এবং জলসীমা নজরদারির ড্রোনেও আগ্রহী।
এআই চিপ নিয়েও রিয়াদের বড় পরিকল্পনা। এনভিডিয়া সৌদি মালিকানাধীন এআই প্রতিষ্ঠান ‘হিউমেন’–এর কাছে হাজার হাজার ব্ল্যাকওয়েল চিপ বিক্রির পরিকল্পনা করেছে। রিয়াদ থেকে দাম্মাম পর্যন্ত ২০৩৪ সালের মধ্যে ৬.৬ গিগাওয়াট ক্ষমতার ডেটা সেন্টার তৈরি হচ্ছে। ডেটাভোল্ট লোহিত সাগর উপকূলে ৫০০ কোটি ডলার ব্যয়ে ডেটা সেন্টার নির্মাণ করছে। তবে এআই চুক্তির ঘোষণার পরও চিপ সরবরাহ এখনো স্থগিত রয়েছে।

