ইরানে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভ চলছেই। সহিংসতায় শুক্রবার পর্যন্ত অন্তত ৭ জন নিহত হয়েছেন। এসব প্রাণহানি ঘটে বিক্ষোভ চলাকালীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল শুক্রবার ঘোষণা দেন, ইরানে যদি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের উদ্ধারে এগিয়ে আসবে। ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে পোস্টে বলেন, “আমরা ‘লকড অ্যান্ড লোডেড’, প্রস্তুত আছি। ইরান যদি বিক্ষোভকারীদের গুলি করে বা হত্যার চেষ্টা করে, আমরা তা প্রতিহত করতে আগ্রহী।”
ট্রাম্পের হুঁশিয়ারির পর ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রকে কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছেন। ইরানের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা সংস্থার প্রধান আলি লারিজানি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কোনো হস্তক্ষেপ পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করবে এবং এতে আমেরিকার স্বার্থও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একইভাবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা আলি শামখানিও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
আধা-সরকারি ফার্স নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেহরান থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে লরেস্তান প্রদেশের আজনা শহরে বিক্ষোভ চলাকালে অন্তত তিনজন নিহত ও ১৭ জন আহত হয়েছেন। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, রাস্তায় আগুন জ্বলছে এবং ‘নির্লজ্জ নির্লজ্জ!’ স্লোগানের মধ্যে গুলির শব্দ শোনা গেছে।
এর আগে তেহরান থেকে ৪৭০ কিলোমিটার দক্ষিণে চাহারমহল ও বখতিয়ারি প্রদেশের লোরদেগান শহরে বিক্ষোভে দুজন নিহত হয়। ফার্স নিউজ জানায়, প্রাদেশিক গভর্নরের কার্যালয়, মসজিদ, শহীদ ফাউন্ডেশন, টাউন হল, ব্যাংকসহ প্রশাসনিক ভবনে পাথর ছোড়ার কারণে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে।
পূর্ব বিক্ষোভের সময়, পশ্চিমাঞ্চলীয় কুহদাশত শহরে নিরাপত্তা বাহিনীর এক সদস্য নিহত হন। লরেস্তান প্রদেশের ডেপুটি গভর্নর সাঈদ পুরালিকে উদ্ধৃত করে টেলিভিশন জানায়, “জনশৃঙ্খলা রক্ষা করার সময় ২১ বছর বয়সী বাসিজ সদস্য দাঙ্গাকারীদের হাতে নিহত হয়েছেন।” বাসিজ হলো ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী।
মুদ্রার মান পতন ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভের সময়ই এই হতাহতের খবর এসেছে। ইরানের অর্থনীতি ৪০ শতাংশ মুদ্রাস্ফীতির কবলে এবং গত জুনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলায় দেশের পারমাণবিক ও সামরিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
তেহরান থেকে আলজাজিরার প্রতিবেদক তৌহিদ আসাদি জানান, আগের বিক্ষোভের তুলনায় এবার সরকার কিছুটা সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বিক্ষোভকারীদের যৌক্তিক দাবি মেনে অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতির জন্য পদক্ষেপ নিতে সরকারকে আহ্বান করেছেন। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে তিনি বলেন, “আমরা যদি জনগণের জীবিকার সমস্যা সমাধান করতে না পারি, তবে আমাদের পরিণতি হবে জাহান্নাম।”
সরকারি মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি জানিয়েছেন, কর্তৃপক্ষ ট্রেড ইউনিয়ন এবং ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সরাসরি সংলাপ করবে। তবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দিয়ে কঠোর অবস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বুধবার ইরানের প্রসিকিউটর জেনারেল বলেন, “অর্থনৈতিক প্রতিবাদকে নিরাপত্তাহীনতা, সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস বা বিদেশি নকশা বাস্তবায়নের হাতিয়ার বানানোর প্রচেষ্টাকে আইনি, আনুপাতিক ও চূড়ান্তভাবে দমন করা হবে।”
এদিকে তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, বুধবার সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপভিত্তিক ইসলামী প্রজাতন্ত্রবিরোধী গোষ্ঠীর’ সঙ্গে যুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

