নতুন বছরের শুরুতেই বিশ্ব রাজনীতিতে নেমেছে এক গভীর এবং বিপজ্জনক ধাক্কা। ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে গতকাল শনিবার ভোরে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিক অভিযান চালায়।
এই অভিযান শুধু ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকেই হুমকির মুখে ফেলে না, বরং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন এক নজির স্থাপন করেছে। আধুনিক ইতিহাসে কোনো স্বাধীন দেশের প্রেসিডেন্টকে বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে আটক করে অন্য দেশে নেওয়ার ঘটনা বিরল।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, অভিযানে মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে মাদক পাচার এবং অস্ত্রসংক্রান্ত অপরাধে অভিযুক্ত করে যুক্তরাষ্ট্রে আনা হয়েছে। মাদুরোর গ্রেপ্তার আন্তর্জাতিক কূটনীতির নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে, যেখানে দীর্ঘদিনের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা হঠাৎ সরাসরি যুদ্ধ এবং শাসন পরিবর্তনের অভিযানে রূপ নিয়েছে।
হামলার পর ভেনেজুয়েলার প্রতিক্রিয়া ও অনিশ্চয়তা:
হামলার পর ভেনেজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ জানান, সরকার এখনও জানে না প্রেসিডেন্ট মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী কোথায় আছেন। তিনি দ্রুত তাঁদের জীবিত থাকার প্রমাণ দেখানোর দাবি করেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদ্রিনো লোপেজ বলেন, হামলাগুলো বেসামরিক এলাকাতেও আঘাত হেনেছে এবং হতাহতের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তিনি আরও স্পষ্টভাবে বলেন, ভেনেজুয়েলা তার ভূখণ্ডে বিদেশি সেনাদের উপস্থিতি প্রতিরোধ করবে।
সরকারি বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে ‘অত্যন্ত গুরুতর সামরিক আগ্রাসন’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এটি ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্ব, জনগণ এবং বেসামরিক-সামরিক স্থাপনার বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণ। যুক্তরাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে অভিযোগ করা হয়েছে যে, এই হামলার মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক স্বাধীনতায় জোরপূর্বক হস্তক্ষেপ এবং দেশটির কৌশলগত সম্পদ—বিশেষ করে তেল ও খনিজ—দখলের চেষ্টা চলছে।
এই প্রতিক্রিয়াগুলো ভেনেজুয়েলায় রাজনৈতিক সংকটকে আরও গভীর করেছে। সরকারের কিছু অংশ এখনও সক্রিয় এবং প্রতিরোধের ডাক দিচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদি অরাজকতার সম্ভাবনা বাড়াচ্ছে।
নিকোলাস মাদুরো: ক্ষমতায় উত্থান ও বিতর্কিত শাসন:
নিকোলাস মাদুরো হুগো শ্যাভেজের রাজনৈতিক উত্তরসূরি এবং ইউনাইটেড সোশ্যালিস্ট পার্টি অব ভেনেজুয়েলা (PSUV)-এর মাধ্যমে রাজনীতিতে উঠে আসেন। ২০১৩ সালে শ্যাভেজের মৃত্যুর পর তিনি প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিজয়ী ঘোষিত হলেও বিরোধীরা দাবি করে, তাদের প্রার্থী এডমুন্ডো গঞ্জালেজ বিজয়ী ছিলেন। মাদুরোর শাসনামলে ভেনেজুয়েলা গভীর অর্থনৈতিক সংকট, মুদ্রাস্ফীতি এবং অভিবাসন সংকটে পড়ে। লাখ লাখ ভেনেজুয়েলান যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমায়।
মাদুরোর শাসনামলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক তীব্র উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে, বিশেষত মাদক পাচারের অভিযোগ নিয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, মাদুরো ভেনেজুয়েলার মাদক চক্র—ট্রেন ডি আরাগুয়া এবং কার্টেল ডি লস সোলস—কে পরিচালনা করেন। এই অভিযোগ মাদুরো দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করে আসছেন এবং বলেন, ‘মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ আসলে যুক্তরাষ্ট্রের আড়ালে ভেনেজুয়েলার সরকারকে উৎখাত করার একটি অজুহাত।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া: বিভক্ত বিশ্ব:
ভেনেজুয়েলায় হামলার পর আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া তীব্র। রাশিয়া এটিকে ‘সশস্ত্র আগ্রাসন’ হিসেবে আখ্যা দেয়। ইরান ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করে। কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো এটি লাতিন আমেরিকার সার্বভৌমত্বের ওপর আক্রমণ হিসেবে বর্ণনা করেন। কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল ডিয়াজ-ক্যানেল এটিকে ‘অপরাধমূলক আক্রমণ’ হিসেবে উল্লেখ করেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ কূটনীতিক কাজা ক্যালাস বলেন, মাদুরোর প্রেসিডেন্সির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও ক্ষমতার হস্তান্তর শান্তিপূর্ণ হওয়া উচিত এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা আবশ্যক। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার দ্রুত সত্যতা যাচাই এবং ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলার আগ্রহ প্রকাশ করেন।এই প্রতিক্রিয়াগুলো দেখায়, ভেনেজুয়েলার ঘটনা শুধুমাত্র লাতিন আমেরিকায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি বৈশ্বিক রাজনৈতিক ফাঁদ তৈরি করছে।
নরিয়েগা থেকে সাদ্দাম—অভিযানের পুনরাবৃত্ত ইতিহাস:
নিকোলাস মাদুরোর গ্রেপ্তার যুক্তরাষ্ট্রের অতীত সামরিক ও রাজনৈতিক অভিযানের ধারাবাহিকতাকে পুনরায় সামনে এনেছে। ইতিহাসে দেখা যায়, ওয়াশিংটন বহুবার বিদেশি রাষ্ট্রনেতাদের বিরুদ্ধে প্রথমে অপরাধের অভিযোগ তোলে, তারপর কূটনৈতিক চাপ ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, এবং শেষ পর্যন্ত সামরিক হস্তক্ষেপের পথ বেছে নেয়। মাদুরোর ঘটনা সেই ধারাবাহিকতার সর্বশেষ সংযোজন।
ম্যানুয়েল নরিয়েগা: একসময়ের মিত্র থেকে শত্রু
১৯৮৯ সালে পানামায় গভীর রাতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান চালিয়ে ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে গ্রেপ্তার করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে, নরিয়েগা মাদক পাচার, দুর্নীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু অতীত জানায়, নরিয়েগা একসময় সিআইএর সহযোগী ছিলেন এবং লাতিন আমেরিকায় মার্কিন স্বার্থ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি স্বাধীনভাবে ক্ষমতা প্রয়োগ শুরু করলে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। গ্রেপ্তারের পর দীর্ঘ কারাদণ্ড দেওয়া হলেও পানামা বহু বছর রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার মধ্যে পড়ে।
সাদ্দাম হোসেন: প্রমাণহীন অভিযোগ ও ধ্বংসপ্রাপ্ত রাষ্ট্র
২০০৩ সালে ইরাকের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বে সামরিক অভিযান চালানো হয়। অভিযোগ ছিল—সাদ্দাম গণবিধ্বংসী অস্ত্র রাখেন। কোনো অস্ত্রের প্রমাণ না পাওয়া সত্ত্বেও যুদ্ধ থামেনি। সাদ্দাম গ্রেপ্তার হন এবং পরে ফাঁসির মুখে পড়েন। যুদ্ধ ও পরবর্তী দখলদারত্বে লক্ষাধিক বেসামরিক নিহত হন, রাষ্ট্র কাঠামো ভেঙে যায়। এটি দেখায়, শাসন পরিবর্তন অভিযান দীর্ঘমেয়াদে সংশ্লিষ্ট দেশের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনে।
হুয়ান অরল্যান্ডো এরনান্দেজ: মিত্র রাষ্ট্রের নেতার পতন
হুয়ান অরল্যান্ডো এরনান্দেজ হন্ডুরাসের সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিলেন। তবু মাদক পাচারের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রে বিচার হয়ে ৪৫ বছরের কারাদণ্ড পান। পরে ট্রাম্প তাঁকে ক্ষমা দেন। এটি দেখায়, রাষ্ট্রের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও কোনো নেতা যখন ওয়াশিংটনের সীমার বাইরে চলে যায়, তখনও ন্যায়বিচার রাজনৈতিক কারণে প্রভাবিত হতে পারে।
আফ্রিকা, গাজা ও ইউক্রেন: বিস্তৃত সংঘাতের মানচিত্র
ভেনেজুয়েলার ঘটনা একক নয়। আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং পূর্ব ইউরোপেও যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিনির্ভর নীতি প্রতিফলিত হচ্ছে। নাইজেরিয়া ও সোমালিয়ায় মার্কিন বিমান হামলা বাড়ানো হয়েছে। স্থানীয় মানবাধিকার সংস্থা বলছে, বেসামরিক হতাহতের ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে। গাজার ইসরায়েলি সামরিক অভিযানেও লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত ও নিহত হয়েছে। ইউক্রেনে ট্রাম্পের শান্তির উদ্যোগ কার্যত ব্যর্থ হয়েছে। এই সব ঘটনা দেখায়, যুক্তরাষ্ট্র শক্তির রাজনীতি চালাতে আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিক বিধিনিষেধ প্রায়শই উপেক্ষা করছে।
শক্তির রাজনীতি ও বিপজ্জনক নজির:
নরিয়েগা থেকে সাদ্দাম, এরনান্দেজ থেকে মাদুরো—এই ধারাবাহিকতা একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়। যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তার ব্যাখ্যা নিজেই নির্ধারণ করে এবং প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক আইন ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব উপেক্ষা করে শক্তি প্রয়োগে পিছপা হয় না। ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে, একজন sitting প্রেসিডেন্টকে বিদেশি অভিযানে গ্রেপ্তার করার দাবি নতুন নজির স্থাপন করেছে। এটি ভবিষ্যতে অন্য শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোকেও অনুরূপ পথে হাঁটার যুক্তি জোগাতে পারে।
ভেনেজুয়েলার ঘটনা কেবল লাতিন আমেরিকার সংকট নয়; এটি একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক শক্তির রাজনীতির প্রতিচ্ছবি। ইতিহাস দেখায়, এই ধরনের অভিযান স্বল্পমেয়াদে শক্তিধর রাষ্ট্রের জন্য রাজনৈতিক লাভ বয়ে আনে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সংশ্লিষ্ট অঞ্চল ও বিশ্বের জন্য অস্থিতিশীলতা, সহিংসতা এবং মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনে। নরিয়েগা, সাদ্দাম বা গাজার ধ্বংসস্তূপ—সবই সেই বাস্তবতার সাক্ষ্য। মাদুরোর ঘটনার পর বিশ্ব এখন সেই পুরোনো প্রশ্নের মুখোমুখি: শক্তির মাধ্যমে আরোপিত ‘শান্তি’ কি সত্যিই শান্তি বয়ে আনে, নাকি নতুন সংঘাতের বীজ বপন করে?





