মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর চীনের অর্থনীতির গতি রোধ করার জন্য নানা বাণিজ্য ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। তবুও চীনের প্রবৃদ্ধি থেমে যায়নি। ২০২৫ সালে দেশের জিডিপি বেড়েছে ৫ শতাংশ।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, চীনের বর্তমান অর্থনৈতিক আকার ও সাম্প্রতিক প্রবৃদ্ধি হিসেব করলে ৫ শতাংশ খারাপ নয়। তবে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির গতিবেগ কিছুটা মন্থর হয়েছে। একসময় দেশটির প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশ হারে হতো।
আল–জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবর–ডিসেম্বর প্রান্তিকে বার্ষিক ভিত্তিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪.৫ শতাংশ। তৃতীয় প্রান্তিকে ৪.৮ শতাংশ, দ্বিতীয় প্রান্তিকে ৫.২ শতাংশ, আর প্রথম প্রান্তিকে ৫.৪ শতাংশ।
চীনের জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরো জানিয়েছে, বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মধ্যেও ২০২৫ সালে অর্থনীতি স্থিতিশীল অগ্রগতি বজায় রেখেছে। উন্নয়নের গুণগত মানও বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশ একসময় রপ্তানিমুখী অর্থনীতি থেকে অভ্যন্তরীণ ব্যয়ভিত্তিক অর্থনীতি গ্রহণ করেছে। তবে শুল্ক বাধা ও অন্যান্য চ্যালেঞ্জে সেই চেষ্টা পুরোপুরি সফল হয়নি।
বিবিসি জানিয়েছে, চীনের অর্থনীতি এক বছর ধরে অভ্যন্তরীণ ব্যয় বাড়ানোর চেষ্টা করেছে। তবে দীর্ঘস্থায়ী আবাসন সংকট এবং যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতির কারণে অগ্রগতি কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উৎপাদন খাতের বৃদ্ধি থাকা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষ ব্যয়ে এখনও সতর্ক। আবাসন খাতের দুরবস্থা অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকি তৈরি করছে।
ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের চীনবিষয়ক অর্থনীতিবিদ জিচুন হুয়াং মন্তব্য করেছেন, সরকারি হিসাবের চেয়ে প্রকৃত প্রবৃদ্ধি কম। তার মতে, সরকারি পরিসংখ্যানে অন্তত ১.৫ শতাংশ পয়েন্ট বেশি দেখানো হয়েছে।
জনসংখ্যা সংকট ও জন্মহার কমে যাওয়া:
১৯৪৯ সালের পর চীনের জন্মহার ২০২৫ সালে সর্বনিম্ন রেকর্ড করেছে। জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, গত বছর দেশটিতে ৭৯ লাখ শিশু জন্মেছে। একই সঙ্গে চীনের জনসংখ্যা টানা চতুর্থ বছর কমেছে। ২০২৫ সালে জনসংখ্যা কমেছে ৩৪ লাখ, যা কমিয়ে দিয়েছে মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৪০ কোটিতে। জন্মহার কমে যাওয়ায় আবাসন ও ভোক্তাপণ্যের চাহিদা আরও দুর্বল হবে। সরকারের পক্ষ থেকে দম্পতিদের সন্তান গ্রহণে উৎসাহিত করার জন্য বিভিন্ন প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে।
রেকর্ড বাণিজ্য উদ্বৃত্ত:
বেইজিং জানিয়েছে, ২০২৫ সালে চীনের বার্ষিক বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ১.১৯ ট্রিলিয়ন বা ১ লাখ ১৯০ হাজার কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। এটি দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। ২০২৪ সালে এই উদ্বৃত্ত ছিল ৯৯৩ বিলিয়ন ডলার। মাসিক রপ্তানি উদ্বৃত্ত ৭ মাস ধরে ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ছিল।
চীনের কাস্টমসের উপপরিচালক ওয়াং জুন বলেছেন, বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও বাণিজ্য উদ্বৃত্ত অসাধারণ। দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের সঙ্গে চীনের রপ্তানি বেড়েছে। তবে আমদানি তুলনায় কম হয়েছে।
শুল্ক বাধার প্রভাব সীমিত:
দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প মার্কিন শুল্ক নীতি জোরদার করলেও চীনের বাণিজ্য প্রভাবিত হয়নি। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায় রপ্তানি বৃদ্ধি দিয়ে তারা ঘাটতি পুষিয়ে নিয়েছে।
ভারতের জন্যও চীনের বাজার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। চলতি অর্থবছরে এপ্রিল থেকে নভেম্বর পর্যন্ত চীনে ভারতের রপ্তানি বেড়েছে ৩৩ শতাংশ। এর আর্থিক মূল্য দাঁড়িয়েছে ১২.২২ বিলিয়ন ডলার। যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ শুল্কের কারণে ভারতীয় পণ্যের বিকল্প বাজারে চীনের গুরুত্ব বেড়েছে।
নিষেধাজ্ঞার সীমাবদ্ধতা:
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার প্রভাব অনেক দেশেই সীমিত। দুবাইয়ের বাণিজ্য সংস্থার প্রধান হামাদ বুয়ামিম জানিয়েছেন, নিষেধাজ্ঞা অর্থনীতির গতি বদলাতে পারে, বন্ধ করতে পারে না। রাশিয়া-চীনের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও সহযোগিতা বেড়েছে।
ভারত ও রাশিয়া সম্পর্ক:
ডিসেম্বর ২০২৫ সালে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ভারতের দুই দিনের সফরে এলেন। ভারত ও রাশিয়ার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলার পৌঁছানোর পরিকল্পনা করছে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে চীনা-ভারতীয় প্রভাব:
ব্রিকস দেশগুলো বৈশ্বিক জিডিপির ৩০ শতাংশের বেশি যোগান দেয়। ভারত ও চীনে ২৮০ কোটির মানুষ বসবাস করছে। প্রযুক্তি, বিজ্ঞান, মহাকাশ কর্মসূচি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে উভয় দেশ দ্রুত অগ্রগতি করছে। ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে বহুমেরুকেন্দ্রিক ও বহুপক্ষীয় ব্যবস্থা তৈরি হচ্ছে।

