ফেব্রুয়ারিতে আঞ্চলিক যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাকিস্তান-নেতৃত্বাধীন আলোচনার প্রাথমিক ব্যর্থতা পর্যন্ত, মিশর উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রত্যাশার চেয়ে ভিন্ন আচরণ করেছে।
যুদ্ধের প্রথম দিনেই মিশরীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উপসাগরীয় রাষ্ট্রসমূহ ও জর্ডানের ওপর ইরানের হামলার দ্রুত নিন্দা জানিয়ে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সংহতির ইঙ্গিত দিলেও- এর পরেই তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কূটনৈতিকভাবে নিরপেক্ষতার দিকে মোড় নেয়।
কিছু বিশ্লেষক এটিকে মিশরীয় পররাষ্ট্রনীতির একটি প্রগতিশীল পদক্ষেপ হিসেবে দেখলেও- অন্যরা এটিকে একটি নাটকীয় ও দুঃসাহসিক পরিবর্তন বলে আখ্যা দিয়েছেন।
আমার মতে, কায়রো কূটনৈতিক কোন্দলে বিপদের সংকেত হিসেবে প্রবেশ করেছে। যদি এই আঞ্চলিক সংঘাত আরও বিস্তৃত হয় বা চলতে থাকে, তবে মিশরের প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনৈতিক সংকট আরও গভীর হবে, যা দেশটিকে চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যে নিমজ্জিত করবে।
সুতরাং, মিশরের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা পালনের প্রচেষ্টা একটি কৌশলগত অপরিহার্যতা হিসেবে কাজ করে, কারণ এর লক্ষ্য হলো এমন একটি সংঘাতে জড়িয়ে পড়া এড়ানো, যার রসদ ও আর্থিক চাহিদা পূরণ করা তার পক্ষে সম্ভব হবে না।
মিশর, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যকার ত্রিপক্ষীয় সমন্বয়ের ভিত্তি হলো পশ্চিমা নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে তাদের অভিন্ন সংগতি, কারণ এই তিনটি দেশই যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র, বিশেষ করে সামরিক ক্ষেত্রে।
ন্যাটো সদস্য হিসেবে তুরস্ক তার কৌশলগত অবস্থান বজায় রেখেছে, অন্যদিকে পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্ব হোয়াইট হাউসে উচ্চ-পর্যায়ের অভ্যর্থনা পেতে থাকে। মিশরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তার বার্ষিক ১.৩ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তার মাধ্যমে ওয়াশিংটনের সাথে মৌলিকভাবে সংযুক্ত রয়েছে।
এই নবগঠিত অক্ষটি তেহরানের সাথে কার্যকরী ও বাস্তবসম্মত সম্পর্কও বজায় রাখে। যদিও পাকিস্তান ও তুরস্কের ইরানের সাথে সীমান্ত রয়েছে এবং প্রতিষ্ঠিত কূটনৈতিক সম্পর্কের ইতিহাসও আছে, মিশরই সবচেয়ে সতর্ক পক্ষ, যারা ১৯৭৯ সালে, অর্থাৎ ইরানি বিপ্লব ও মিশর-ইসরায়েল শান্তি চুক্তির বছরে, তেহরানের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল।
বিভেদ দূর করা
তবে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে কায়রো সম্পর্কের বরফ গলার ইঙ্গিত দিয়েছে, বিশেষত গত জুনের ১২ দিনের যুদ্ধের পর স্বল্পস্থায়ী কায়রো চুক্তির মাধ্যমে ইরান এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মধ্যকার বিভেদ দূর করার চেষ্টা করেছে।
তাছাড়া, মিশর ও তুরস্ক উভয়েরই ইসরায়েলের সঙ্গে স্বাভাবিক—যদিও টানাপোড়েনের—সম্পর্কের এক অনন্য সুবিধা রয়েছে, যা গত অক্টোবরে কার্যকর হওয়া গাজা যুদ্ধবিরতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে।
জিসিসিভুক্ত দেশগুলোর সাথে এই তিনটি দেশের শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব এবং চলমান যুদ্ধে ইরানের সরাসরি হামলা থেকে তাদের তুলনামূলক সুরক্ষার কারণে, একটি কার্যকর মধ্যস্থতাকারী জোট হিসেবে কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক পুঁজি এই দেশগুলোর রয়েছে।
মিশরের ক্ষেত্রে, এই সংঘাত এমন এক সময়ে শুরু হয় যখন দেশটি আগে থেকেই এক নাজুক আর্থিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল: এর বৈদেশিক ঋণ বিস্ময়করভাবে ১৬৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশ, এবং ২০২৬ সালের মধ্যে এর মধ্যে ২৭ বিলিয়ন ডলার ঋণ পরিশোধের দায় রয়েছে। সুদ বাবদ খরচ বেড়ে মোট সরকারি ব্যয়ের ৫০ শতাংশেরও বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মিশরের অভ্যন্তরীণ বাজারে আঞ্চলিক সংঘাতের প্রত্যক্ষ প্রভাব রপ্তানির পরিমাণে বিস্ময়কর ৭৭ শতাংশ পতনের মাধ্যমে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। এই বাণিজ্য স্থবিরতা আরও তীব্র হয়েছে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পুঁজির বহির্গমনের কারণে, কারণ বিনিয়োগকারীরা আঞ্চলিক অনিশ্চয়তা থেকে পালাচ্ছেন।
কায়রোর রাজস্ব ভারসাম্য তিনটি প্রধান চলকের পারস্পরিক ক্রিয়ার প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল: তেলের দাম, পর্যটন থেকে আয় এবং শ্রমিকদের পাঠানো রেমিটেন্স (যার মধ্যে শেষোক্তটির পরিমাণ ২০২৫ সালে ছিল ৪১.৫ বিলিয়ন ডলার)।
স্থানীয় অর্থনীতির ওপর যুদ্ধের ব্যাপক বোঝার মধ্যে জিসিসি-র আর্থিক সহায়তা ও প্রত্যক্ষ বিনিয়োগে প্রত্যাশিত সংকোচন এবং ইরানি আক্রমণের বিরুদ্ধে জোরালো সামরিক সহায়তা প্রদানে কায়রোর অনীহার পর উপসাগরীয় অংশীদারদের—বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের—মিশরীয় শাসনব্যবস্থা নিয়ে কৌশলগত পুনর্মূল্যায়ন এই নাজুক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সংহতির নিদর্শন হিসেবে, স্বয়ং রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বে বিভিন্ন উপসাগরীয় দেশে ধারাবাহিক রাষ্ট্রীয় সফরের মাধ্যমে কায়রো কূটনৈতিকভাবে এই পরিস্থিতির প্রভাব সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছিল।
কৌশলগত পছন্দ
যুদ্ধের কারণে ইসরায়েলি প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জ্বালানির ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধি এবং নিয়মিত বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মধ্য দিয়ে মিশরের যে তীব্র অর্থনৈতিক দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে, তা পাকিস্তান ও তুরস্কের পাশাপাশি মধ্যস্থতায় কায়রোর নিবিড় অংশগ্রহণের পেছনের কৌশলগত যুক্তিকে তুলে ধরে।
২০১৩ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিশরের আঞ্চলিক প্রভাব হ্রাস পায়, কারণ অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত অস্থিতিশীলতা ও আর্থিক সংকট সৌদি আরবের মতো উদীয়মান শক্তিগুলোর হাতে ভূ-রাজনৈতিক নেতৃত্ব তুলে দেয়।
এই কৌশলগত পশ্চাদপসরণের সময়কালটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলিতে কায়রোর ঐতিহ্যবাহী প্রভাবের ক্ষয় দ্বারা চিহ্নিত হয়েছিল, যা গ্র্যান্ড ইথিওপিয়ান রেনেসাঁ ড্যাম নিয়ে ব্যর্থ আলোচনা, লিবিয়ার গৃহযুদ্ধ এবং সুদানের সংঘাতে দেখা গেছে।
এই প্রেক্ষাপটে, ক্ষমতার আরও জোরালো রূপগুলোর অনুপস্থিতি পূরণের জন্য কূটনৈতিক মধ্যস্থতা একটি কৌশলগত পছন্দ হয়ে ওঠে। এই পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল ২০১৪ সালের গাজা যুদ্ধের সময় এবং এর চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে কাতার ও তুরস্কের পাশাপাশি অক্টোবর ২০২৫-এর যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কায়রোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার মাধ্যমে।
গাজায় এই সাফল্য নিঃসন্দেহে শাসকগোষ্ঠীর সংকল্পকে আরও দৃঢ় করেছে, যা এই ধারণাকেই প্রমাণ করে যে মিশরের অনন্য ভৌগোলিক অবস্থানই তার সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার—যা একইসাথে একটি রসদ সরবরাহসংক্রান্ত বোঝা এবং প্রধান কৌশলগত সম্পদ।
ফলস্বরূপ, মিশর মধ্যস্থতাকে একটি মৌলিক পররাষ্ট্রনীতি হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মতো বৈশ্বিক পৃষ্ঠপোষকদের কাছে তার অবস্থান স্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত। এর মাধ্যমে দেশটি নিজেকে একজন আন্তরিক মিত্র হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে এবং একই সাথে এমন সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়া এড়াতে পারে, যার অত্যধিক আর্থিক ও রাজনৈতিক ব্যয়ভার সে আর সহ্য করতে পারে না।
পাকিস্তানে চলমান আলোচনা এই কৌশলগত বাস্তবতাবাদেরই প্রতিফলন। পরিশেষে, একটি চুক্তিতে পৌঁছানো এবং এই যুদ্ধের অবসান ঘটানোর জন্য কায়রোর হিসাব-নিকাশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অপরিহার্য বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে রয়েছে ইসরায়েলি সম্প্রসারণবাদ ও আঞ্চলিক আধিপত্যকে প্রতিহত করা—যা অনিয়ন্ত্রিত থাকলে অনিবার্যভাবে মিশরের নিজস্ব প্রভাবের পরিধিকে সংকুচিত করবে—এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রতি সৃষ্ট অস্তিত্বের সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে একটি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত প্রতিরোধ করা।
মিশর স্বীকার করে যে, আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে ইরানের পতন সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের ওপর ইসরায়েলের নিরঙ্কুশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় সক্ষম করবে। কিন্তু বর্তমান এই সংঘাতে মিত্রদের সামরিক ও কৌশলগত প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়ে দেশটি তার ঐতিহ্যবাহী মিত্রদের বিমুখ করার তীব্র ঝুঁকিরও সম্মুখীন হচ্ছে।
- সাইফ আলিসলাম ঈদ: আরব সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি স্টাডিজ-এর একজন মিশরীয় রাজনৈতিক গবেষক, যিনি মধ্যপ্রাচ্য গবেষণায় বিশেষজ্ঞ। সূত্র: ‘মিডল ইস্ট আই’-এর ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

