যুক্তরাষ্ট্রকে আমরা সাধারণত ৫০টি রাজ্য আর ওয়াশিংটন ডিসির মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে দেখি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই দেশের গল্প এখানেই শেষ নয়। আজও যুক্তরাষ্ট্রের অধীনে রয়েছে পাঁচটি স্থায়ীভাবে বসবাসযোগ্য অঞ্চল এবং পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বেশ কিছু দ্বীপ—যেগুলোতে মানুষের চেয়ে বন্যপ্রাণীর উপস্থিতিই বেশি।
এই সব অঞ্চলে বসবাসকারী প্রায় ৩৬ লাখ মানুষ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট দিতে পারেন না, কংগ্রেসে নেই তাদের ভোটাধিকারপ্রাপ্ত প্রতিনিধি। তবু তারা যুক্তরাষ্ট্রের পতাকাকে সম্মান করে, ফোর্থ অব জুলাই উদ্যাপন করে এবং প্রয়োজনে মার্কিন সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে যুদ্ধেও অংশ নেয়।
আমেরিকার ইতিহাসের শুরু থেকেই অঞ্চল বা টেরিটরির ধারণা ছিল। নর্থওয়েস্ট টেরিটরির মতো অঞ্চল যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাকালেই অন্তর্ভুক্ত হয়। উনিশ শতকে কূটনীতি ও যুদ্ধের মাধ্যমে দেশটি দ্রুত বিস্তৃত হয়। ‘ম্যানিফেস্ট ডেস্টিনি’ ধারণা যুক্তরাষ্ট্রকে আটলান্টিক থেকে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত নিয়ে যায়। এরপর নজর পড়ে সমুদ্রের ওপারে—ক্যারিবিয়ান ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জে।

১৮৯৮ সালের পর যুক্তরাষ্ট্র সাতটি বড় অঞ্চল দখল করে, আর সময়ের ব্যবধানে দুটি অঞ্চল আবার হারায়। সেই বিস্তারের গল্পই এখানে তুলে ধরা হলো।
১. পুয়ের্তো রিকো (১৮৯৮–বর্তমান)
১৮৯৮ সালের স্প্যানিশ–আমেরিকান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এক মোড় ঘোরানো অধ্যায়। এই যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র কিউবা ও পুয়ের্তো রিকোতে হামলা চালায়। যুদ্ধ শেষে স্বাক্ষরিত ট্রিটি অব প্যারিস–এর মাধ্যমে স্পেন তার আমেরিকান উপনিবেশগুলোর নিয়ন্ত্রণ হারায়, আর যুক্তরাষ্ট্র আত্মপ্রকাশ করে নতুন এক সাম্রাজ্যিক শক্তি হিসেবে।
১৯০২ সালে যুক্তরাষ্ট্র কিউবা থেকে সরে গেলেও পুয়ের্তো রিকো আজও তাদের অধীনেই রয়ে গেছে। বর্তমানে প্রায় ৩২ লাখ মানুষের বসবাস এই দ্বীপে, যা এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে জনবহুল অঞ্চল করে তুলেছে।
১৯১৭ সালে পুয়ের্তো রিকোর বাসিন্দারা পান মার্কিন নাগরিকত্ব। ১৯৫২ সালে একটি নিজস্ব সংবিধানের মাধ্যমে দ্বীপটি ‘কমনওয়েলথ’ হিসেবে স্বায়ত্তশাসিত মর্যাদা লাভ করে।
২০২০ সালে অনুষ্ঠিত এক অবাধ্যতামূলক গণভোটে অধিকাংশ ভোটার রাজ্য হওয়ার পক্ষে মত দিলেও—রাষ্ট্র হওয়া, স্বাধীনতা, নাকি বর্তমান ব্যবস্থাই বহাল থাকবে—এই বিতর্ক এখনো শেষ হয়নি।
২. গুয়াম (১৮৯৮–বর্তমান)
স্প্যানিশ–আমেরিকান যুদ্ধের খবর গুয়ামে পৌঁছাতে এত দেরি হয়েছিল যে, ১৮৯৮ সালের জুনে যখন চারলেস্টন+ দ্বীপের দিকে গোলাবর্ষণ শুরু করে, তখন স্থানীয়রা সেটিকে সম্মানসূচক কামান দাগা বলে ভেবেছিল।
যুদ্ধ চলছে—এ কথা জানার পর স্পেনের গভর্নর কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই আত্মসমর্পণ করেন। প্রায় ২০০ বছরের স্প্যানিশ শাসনের অবসান ঘটে।
ট্রিটি অব প্যারিসের মাধ্যমে গুয়াম আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আসে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপান পার্ল হারবারে হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই গুয়াম দখল করে নেয়। প্রায় আড়াই বছর পর, ২১ জুলাই ১৯৪৪, যুক্তরাষ্ট্র দ্বীপটি পুনর্দখল করে।
১৯৫০ সালে গুয়ামের বাসিন্দারাও মার্কিন নাগরিকত্ব লাভ করেন।
৩. ফিলিপাইন (১৮৯৮–১৯৪৬)
স্প্যানিশ–আমেরিকান যুদ্ধ শুরুর এক সপ্তাহের মধ্যেই মার্কিন নৌবাহিনীর কমোডর জর্জ ডিউই ম্যানিলা উপসাগরে স্পেনের নৌবহর সম্পূর্ণ ধ্বংস করেন। এতে ফিলিপাইনে স্পেনবিরোধী বিদ্রোহ নতুন করে জ্বলে ওঠে।
স্বাধীনতার মৌখিক আশ্বাস দেওয়া হলেও যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত ২০ মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে ফিলিপাইন নিজেদের অধীনে নেয়। এর পর শুরু হয় ভয়াবহ এক যুদ্ধ—নতুন ঔপনিবেশিক শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের তিন বছরের লড়াই, যেখানে স্পেনের সঙ্গে যুদ্ধের তুলনায় ১০ গুণ বেশি মার্কিন সেনা নিহত হয়।
ইতিহাসবিদ ড্যানিয়েল ইমারওয়ার বলেন, “ফিলিপাইন দখলের পর এটি যুক্তরাষ্ট্রের মর্যাদার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। কোনো বড় শক্তির জন্য প্রতিরোধের মুখে পড়ে হঠাৎ পিছু হটা সহজ নয়।”
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের ভয়াবহ দখলদারির পর, প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্টের ১৯৪৩ সালের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ৪ জুলাই ১৯৪৬ ফিলিপাইন স্বাধীনতা লাভ করে।
৪. আমেরিকান সামোয়া (১৯০০–বর্তমান)
স্বাধীন দেশ সামোয়ার সঙ্গে গুলিয়ে ফেললে চলবে না—আমেরিকান সামোয়া যুক্তরাষ্ট্রের একটি আলাদা অঞ্চল। সাতটি পলিনেশীয় দ্বীপ নিয়ে গঠিত এই অঞ্চলটি হাওয়াইয়ের চেয়েও দক্ষিণে, নিউজিল্যান্ডের কাছাকাছি অবস্থিত।
উনিশ শতকের শেষদিকে এটি মার্কিন বাণিজ্যিক ও নৌজাহাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কয়লাঘাঁটি হয়ে ওঠে। ফিলিপাইন দখলের পর এই অঞ্চলের কৌশলগত গুরুত্ব আরও বাড়ে।
১৮৯৯ সালে জার্মানির সঙ্গে দ্বীপপুঞ্জ ভাগাভাগি করে যুক্তরাষ্ট্র পূর্ব অংশ দখল করে নেয়। ১৯০০ থেকে ১৯০৪ সালের মধ্যে স্থানীয় প্রধানরা আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে দ্বীপগুলো তুলে দেন।
আজ প্রায় ৪৪ হাজার মানুষ এখানে বসবাস করেন। তারা মার্কিন নাগরিক নন, বরং মার্কিন ন্যাশনাল।
৫. পানামা ক্যানাল জোন (১৯০৩–১৯৭৯)
কলম্বিয়া যখন পানামা প্রণালীতে খাল নির্মাণের চুক্তি প্রত্যাখ্যান করে, তখন প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্ট ১৯০৩ সালে পানামার স্বাধীনতা আন্দোলনকে স্বীকৃতি দেন। নতুন রাষ্ট্রটি যুক্তরাষ্ট্রকে খাল নির্মাণের একচেটিয়া অধিকার দেয়।
যদিও যুক্তরাষ্ট্র জমিটির মালিক ছিল না, তবে ১০ মাইল চওড়া ও ৫০ মাইল দীর্ঘ এলাকায় তারা “চিরস্থায়ীভাবে সব ক্ষমতা” পায়। এই উপনিবেশিক শাসন দীর্ঘদিন ধরে ক্ষোভ সৃষ্টি করে।
১৯৬৪ সালের দাঙ্গায় ২২ জন পানামানিয়ান ছাত্র ও ৪ জন মার্কিন সেনা নিহত হন।
শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার ১৯৭৯ সালে চুক্তি স্বাক্ষর করেন। ১৯৯৯ সালে পানামা পুরো খালের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায়, যদিও প্রয়োজনে খাল খোলা রাখতে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শক্তি ব্যবহারের অধিকার রাখে।
৬. ইউএস ভার্জিন আইল্যান্ডস (১৯১৭–বর্তমান)
এই দ্বীপগুলো কিনতে যুক্তরাষ্ট্রের লেগে যায় প্রায় ৫০ বছর। ডেনমার্কের সঙ্গে একাধিকবার আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান হুমকির মুখে ডেনমার্ক শেষ পর্যন্ত রাজি হয়।
১৯১৬ সালে ২৫ মিলিয়ন ডলারে দ্বীপগুলো বিক্রি হয়। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডে ডেনমার্কের কর্তৃত্ব স্বীকার করে নেয়।
১৯১৭ সালে দ্বীপগুলো যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হয়, আর ১০ বছর পর বাসিন্দারা মার্কিন নাগরিকত্ব পান।
৭. নর্দার্ন মারিয়ানা আইল্যান্ডস (১৯৮৬–বর্তমান)
গুয়ামের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত এই দ্বীপপুঞ্জ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের কাছ থেকে দখল করে যুক্তরাষ্ট্র। পরে জাতিসংঘের অধীনে একটি ট্রাস্ট হিসেবে পরিচালিত হয়।
গুয়ামের সঙ্গে একীভূত হওয়ার চারবার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর, ১৯৭৬ সালে কংগ্রেস এটিকে কমনওয়েলথ হিসেবে অনুমোদন দেয়।
১৯৮৬ সালে জাতিসংঘের ট্রাস্ট ভেঙে গেলে দ্বীপগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের অঞ্চল হয়। প্রায় ৫১ হাজার বাসিন্দা তখনই মার্কিন নাগরিকত্ব পান।
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস শুধু স্বাধীনতার গল্প নয়, এটি দখল, শাসন, প্রতিরোধ ও প্রত্যাবর্তনের ইতিহাসও। ৫০টি রাজ্যের বাইরের এই অঞ্চলগুলো আজও মনে করিয়ে দেয়—আমেরিকার মানচিত্র কাগজে যতটা ছোট, বাস্তবে তার ছায়া ছিল অনেক বড়।

