ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ভারতের তৈরি পোশাক, বস্ত্র, প্লাস্টিকসহ অধিকাংশ পণ্যে অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা বা জিএসপি স্থগিত করেছে। এই সিদ্ধান্ত ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হয়েছে। ভারতের পাশাপাশি ইন্দোনেশিয়া ও কেনিয়ার ক্ষেত্রেও একই সুবিধা স্থগিত করা হয়েছে।
ইইউর অফিশিয়াল জার্নালে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, ইউরোপীয় কমিশন গত ২৫ সেপ্টেম্বর একটি বিধিমালা জারি করে। এর মাধ্যমে ২০২৬ থেকে ২০২৮ সময়কালের জন্য ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও কেনিয়ার কিছু জিএসপি সুবিধা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিধিমালাটি চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হয়েছে এবং তা চলবে ২০২৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত।
গবেষণাপ্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ (জিটিআরআই) জানিয়েছে, এই সিদ্ধান্তের প্রভাব চলতি মাস থেকেই টের পাবেন ভারতীয় রপ্তানিকারকেরা। সংস্থাটির মতে, জিএসপি স্থগিত হওয়ায় ভারত থেকে আমদানি করা প্রায় ৮৭ শতাংশ পণ্যে ইইউর আমদানিকারকদের বেশি শুল্ক দিতে হবে। জিএসপি সুবিধা বহাল থাকবে মাত্র ১৩ শতাংশ পণ্যে। এর মধ্যে রয়েছে কৃষি ও চামড়াজাত পণ্য।
জিএসপি বা জেনারেলাইজড সিস্টেম অব প্রেফারেন্সেস হলো উন্নত দেশগুলোর দেওয়া একটি বাণিজ্যিক সুবিধা। এর আওতায় উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর পণ্যে শুল্ক ছাড় বা হ্রাস করা হয়। এতে এসব দেশের রপ্তানি বাড়ে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়।
জিএসপি সুবিধার কারণে ভারতীয় পণ্য আগে ‘সর্বাধিক সুবিধাপ্রাপ্ত জাতি’ বা এমএফএন শুল্কের তুলনায় কম হারে শুল্ক দিয়ে ইইউতে প্রবেশ করত। এখন ভারতের ৮৭ শতাংশ রপ্তানি পণ্যে সেই সুবিধা বাতিল হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোনো তৈরি পোশাকে সাধারণ শুল্কহার যদি ১২ শতাংশ হয়, জিএসপির আওতায় দিতে হতো ৯ দশমিক ৬ শতাংশ। এখন জিএসপি না থাকায় পুরো ১২ শতাংশ শুল্কই দিতে হবে।
ইইউ ভারতের প্রায় সব বড় শিল্প খাতের পণ্যে জিএসপি সুবিধা প্রত্যাহার করেছে। এর মধ্যে রয়েছে খনিজ, রাসায়নিক, প্লাস্টিক ও রাবার, বস্ত্র ও পোশাক, পাথর ও সিরামিক, মূল্যবান ধাতু, লোহা ও ইস্পাত, মৌলিক ধাতু, যন্ত্রপাতি, বৈদ্যুতিক পণ্য এবং পরিবহন সরঞ্জাম। এই খাতগুলোই ইউরোপীয় বাজারে ভারতের রপ্তানির মূল ভিত্তি। এর আগেও ২০১৩ ও ২০২৩ সালে ইইউ ধাপে ধাপে ভারতের জিএসপি সুবিধা কমিয়েছিল। তবে এবার ২০২৬ থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত তিন বছরের জন্য এই সুবিধা পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হয়েছে।
ভারত ও ইইউর মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা এফটিএ চূড়ান্ত পর্যায়ে থাকলেও জিএসপি স্থগিত হওয়ায় স্বল্প মেয়াদে বড় চাপের মুখে পড়বেন ভারতীয় রপ্তানিকারকেরা। জিটিআরআইয়ের প্রতিষ্ঠাতা অজয় শ্রীবাস্তব বলেন, এফটিএ নিয়ে আশাবাদ থাকলেও বাস্তবে রপ্তানিকারকদের সামনে বড় বাণিজ্যিক বাধা তৈরি হবে। একই সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজম বা সিবিএএমের করপর্ব শুরু হওয়ায় চাপ আরও বাড়বে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারত ও ইইউর মধ্যে পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১৩৬ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ভারতের রপ্তানি ছিল ৭৫ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার এবং আমদানি ৬০ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলার। ভারতের মোট পণ্য রপ্তানির প্রায় ১৭ শতাংশই যায় ইইউর বাজারে। অন্যদিকে, ইইউর মোট রপ্তানির প্রায় ৯ শতাংশের গন্তব্য ভারত।
ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান এক্সপোর্ট অর্গানাইজেশনসের (এফআইইও) মহাপরিচালক অজয় সাহাই বলেন, ইইউ ভারতের প্রায় ৮৭ শতাংশ পণ্যে জিএসপি সুবিধা প্রত্যাহার করেছে। ফলে এসব পণ্যকে এখন পূর্ণ এমএফএন শুল্ক দিয়ে ইউরোপে প্রবেশ করতে হবে। আগে গড়ে যে প্রায় ২০ শতাংশ শুল্ক সুবিধা পাওয়া যেত, তা আর থাকছে না। তাঁর মতে, এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের মতো দেশের তুলনায় ভারতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যাবে। কারণ, ওই দেশগুলোর পণ্য এখনো ইইউতে শুল্কমুক্ত বা কম শুল্কে প্রবেশের সুবিধা পাচ্ছে।

