দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রায় আট দশক ধরে যে ‘নিয়ম-নির্ভর’ বিশ্বব্যবস্থা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছিল, তা এখন ইতিহাসের এক কঠিন পরীক্ষার মুখে। আন্তর্জাতিক আইন, বহুপক্ষীয় কূটনীতি এবং পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সেই কাঠামো আজ ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর একমুখী ক্ষমতা প্রয়োগের চাপে এই ব্যবস্থার ভিত নড়ে যাচ্ছে।
বিশ্ব রাজনীতি এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তির প্রতিযোগিতায় সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়ছে তথাকথিত ‘মধ্যম শক্তি’ রাষ্ট্রগুলো। কানাডা কিংবা ইউরোপীয় দেশগুলোর মতো রাষ্ট্র, যারা পরাশক্তিও নয় আবার দুর্বলও নয়—এই নতুন বাস্তবতায় তারাই সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। দাভোসে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সাম্প্রতিক অধিবেশনে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিসহ বিভিন্ন দেশের নেতাদের বক্তব্যে সেই উদ্বেগ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
২০০২ সালের কথা এখনও অনেকের মনে আছে। নাইন-ইলেভেনের পর আহত নিউ ইয়র্ক আর আমেরিকা তখন বিশ্বজুড়ে বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে সহমর্মিতা আর সমর্থনের বার্তা পাচ্ছিল। তখনও বিশ্বাস করা হতো, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ও মার্শাল প্ল্যানের মতো উদ্যোগই ইউরোপে শান্তি, গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে এনেছে। যুক্তরাষ্ট্রকে দেখা হতো এক ধরনের ‘বেনোভোলেন্ট পাওয়ার’ বা হিতৈষী শক্তি হিসেবে।
কিন্তু সময় বদলেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির যে উত্থান ঘটেছে, তা সেই পুরোনো ধারণাকে প্রায় ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। বহুপক্ষীয় সমঝোতার বদলে এখন গুরুত্ব পাচ্ছে একক সিদ্ধান্ত, শুল্কযুদ্ধ আর শক্তি প্রদর্শন। এর ফলে বিশ্ব রাজনীতিতে এক ধরনের স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতার ছায়া ক্রমেই ঘন হচ্ছে।
দাভোসে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য বিশ্ব কূটনীতিতে নতুন করে অস্বস্তি তৈরি করেছে। গ্রিনল্যান্ড দখলের ইচ্ছার কথা প্রকাশ্যে বলা এবং ইউরোপীয় মিত্রদের প্রতি প্রকাশ্য অবজ্ঞা শুধু বিতর্কই নয়, বরং দীর্ঘদিনের মিত্রতার ভিতেও ফাটল ধরিয়েছে। ডেনমার্ককে তুচ্ছ করে দেখা কিংবা ন্যাটোতে ইউরোপীয় দেশগুলোর অবদান নিয়ে কটাক্ষ—এসব মন্তব্য ব্রাসেলস থেকে লন্ডন পর্যন্ত তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এই আচরণকে সরাসরি ‘অত্যন্ত অপমানজনক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
এতে পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে, আমেরিকার এককেন্দ্রিক ক্ষমতা চর্চা আর শুধু এশিয়া বা লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এখন সেই চাপ পড়ছে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্রদের ওপরও।
এই প্রেক্ষাপটে দাভোসে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির বক্তব্য বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, বিশ্ব এখন আর কোনো ‘রূপান্তরকাল’ পার করছে না—এটি এক ধরনের বড়সড় বিচ্ছেদ বা ভাঙনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো যখন নিয়ম মানার ভান ছেড়ে দিয়ে শুল্ক, নিষেধাজ্ঞা বা সামরিক শক্তিকে খোলাখুলি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, তখন মধ্যম শক্তির দেশগুলো কার্যত অসহায় হয়ে পড়ে।
কার্নির সেই বহুল আলোচিত মন্তব্য—“আপনি যদি আলোচনার টেবিলে না থাকেন, তাহলে ধরে নিতে হবে আপনি অন্যের মেনুতে আছেন”—আজকের বৈশ্বিক বাস্তবতার নির্মম সারসংক্ষেপ হয়ে উঠেছে।
অনেক বিশ্লেষক ট্রাম্পের নীতিকে ১৯ শতকের মনরো ডকট্রিনের সঙ্গে তুলনা করছেন, যখন যুক্তরাষ্ট্র নিজের প্রভাববলয়কে এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করত। অতীতে ইরান, গুয়াতেমালা বা পানামায় যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ যেমন আন্তর্জাতিক নিয়মের তোয়াক্কা না করেই হয়েছিল, আজকের বাণিজ্য যুদ্ধ কিংবা গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতেও সেই একই মনোভাবের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।
এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বিশ্ব আবারও প্রাক-দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন অরাজকতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও অনিশ্চয়তার দিকে ফিরে যেতে পারে—এমন আশঙ্কা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
গণতন্ত্র, আইনের শাসন কিংবা দায়বদ্ধ সরকার কোনো স্বয়ংক্রিয় বা স্থায়ী ব্যবস্থা নয়। এগুলো টিকিয়ে রাখতে হলে প্রতিনিয়ত সচেতন লড়াই প্রয়োজন। আজকের এই ভঙ্গুর বিশ্বব্যবস্থায় মধ্যম শক্তির দেশগুলোর সামনে বিকল্প খুবই সীমিত। এককভাবে টিকে থাকা কঠিন। ফলে ঐক্যবদ্ধ হওয়া, পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদার করা এবং নতুন ধরনের জোট গঠনের মধ্য দিয়েই নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও স্বার্থ রক্ষার পথ খুঁজতে হবে।
বিশ্ব যে এক নতুন, অনিশ্চিত অধ্যায়ের দিকে এগোচ্ছে—তা এখন আর অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

