বিশ্ববাজারে তেলের দাম এক সপ্তাহের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ব্রেন্ট ক্রুড ও ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই—উভয় ধরনের তেলের দাম গত শুক্রবার বেড়েছে।অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজারের আদর্শ ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বেড়েছে ব্যারেলপ্রতি ১ ডলার ৮২ সেন্ট বা ২.৮ শতাংশ। নতুন দাম দাঁড়িয়েছে ৬৫ ডলার ৮৮ সেন্টে, যা ১৪ জানুয়ারির পর সর্বোচ্চ।
একই দিনে ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৬১ ডলার ৭ সেন্টে পৌঁছেছে। এটি আগের দিনের তুলনায় ১ ডলার ৭ সেন্ট বা ২.৯ শতাংশ বেশি। সামগ্রিকভাবে গত সপ্তাহে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে ২.৫ শতাংশের বেশি। (সূত্র রয়টার্স)
বিশ্লেষকদের মতে, দাম বৃদ্ধিতে ভূরাজনৈতিক চাপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানকে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন, বিক্ষোভকারীদের হত্যা বা পারমাণবিক কর্মসূচি পুনরায় শুরু করলে তার ফল ভোগ করতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যে এই চাপ বাড়ায় তেল সরবরাহে সম্ভাব্য ব্যাঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
একই সময়ে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেলক্ষেত্রের উৎপাদন পুনরায় শুরু করতে হিমশিম খাচ্ছে কাজাখস্তান। শেভরনের নেতৃত্বাধীন তেনগিজ তেলক্ষেত্র সোমবার আগুন লাগার ঘটনায় বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এখনও উৎপাদন শুরু হয়নি। কাজাখস্তানের মোট উৎপাদনের প্রায় অর্ধেক আসে এই তেলক্ষেত্র থেকে। চলতি মাসে দেশটির উৎপাদন দৈনিক ১০ থেকে ১১ লাখ ব্যারেল নেমে যেতে পারে, স্বাভাবিক সময় সেখানে ১৮ লাখ ব্যারেল উৎপাদন হয়।
মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে একটি বিমানবাহী রণতরী ও ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসকারী যুদ্ধজাহাজ মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছাবে। গত বছরের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর সামরিক হামলা চালিয়েছিল। একই সময়ে, মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় ইরানি তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য পরিবহনে জড়িত ৯টি জাহাজ ও ৮টি প্রতিষ্ঠানকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনার ঘোষণা দিয়েছে।
ওপেকের তথ্য অনুযায়ী, ইরান দৈনিক প্রায় ৩২ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল উৎপাদন করে। ওপেকভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সৌদি আরব, ইরাক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পর ইরান চতুর্থ বৃহত্তম উৎপাদক। এছাড়া, ইরান বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তেল ক্রেতা চীনের বড় সরবরাহকারী।
তেলের বাজারের গতিবিধি সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক ঘটনার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। গত সপ্তাহের শুরুতে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থানের কারণে দাম বেড়েছিল। তবে ইউরোপের বিরুদ্ধে শুল্ক আরোপের হুমকি স্থগিত ও সামরিক পদক্ষেপ নাকচ হওয়ায় দাম ২ শতাংশ কমে গিয়েছিল। কিন্তু ইরানের বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কারণে শুক্রবার দাম আবার বেড়ে গেছে। বিশ্ববাজার শনিবার ও রোববার বন্ধ থাকে।
বিশ্ববাজারে তেলের দাম ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর ১৩৯ ডলারে পৌঁছেছিল। এরপর দাম ধারাবাহিকভাবে কমছে। মূলত চীনসহ বৈশ্বিক অর্থনীতির ধীরগতি ও ওপেকের উৎপাদন হ্রাসের ধারা দামকে ৬০–৭০ ডলারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছে। এছাড়া বিভিন্ন উৎস থেকে তেলের সরবরাহ থাকায় বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা নেই।
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে মূল্যস্ফীতি সরাসরি জড়িত। জ্বালানি ব্যয় বেড়ে গেলে উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বাড়ে, যা নিত্যপণ্যের দামে প্রতিফলিত হয়। আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে মুদ্রার ওপর চাপ পড়ে। ২০২২ সালে দেশের মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির প্রধান কারণ ছিল তেলের দাম বৃদ্ধি।

