২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সহায়তায় মার্কিন কোম্পানিগুলো মোট ২৪৪ বিলিয়ন ডলারের সরকারি ক্রয়চুক্তি পেয়েছে। তালিকায় বাংলাদেশের নামও রয়েছে।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় মার্কিন কোম্পানিগুলো বিদেশি সরকার থেকে এই চুক্তি পেয়েছে। ২০২৪ সালের তুলনায় এটি প্রায় তিন গুণ বেশি। চুক্তির সবচেয়ে বড় অংশ এসেছে বোয়িংয়ের বিপুলসংখ্যক জেটলাইনার অর্ডারের মাধ্যমে।
শুক্রবার এক বিবৃতিতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রশাসন (আইটিএ) জানিয়েছে, ২০২৫ সালে স্বাক্ষরিত ১২১টি চুক্তিতে প্রায় ২০৬ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন রপ্তানি উপাদান রয়েছে। এসব চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৮ লাখ ৪৪ হাজার কর্মসংস্থান টিকে থাকবে বা নতুনভাবে সৃষ্টি হবে। আইটিএর মতে, এই চুক্তিগুলোর একটি অংশ এসেছে ট্রাম্প প্রশাসনের সময় আলোচিত সাম্প্রতিক বাণিজ্য চুক্তির ফল। সহজভাবে বলা যায়, ডোনাল্ড ট্রাম্প শুল্ক হুমকি ব্যবহার করে এসব চুক্তি আদায় করেছিলেন।
এর আগে, ২০২৪ সালে বাইডেন প্রশাসনের শেষ বছরে আইটিএ ৮৭ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি নথিভুক্ত করেছিল। ২০২১ সালের কোভিড পরবর্তী নিম্নস্তর ১৭ বিলিয়নের তুলনায় এটি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ছিল।
২০২৫ সালে এই বড় উল্লম্ফনের মূল কারণ হলো বোয়িংয়ের জেটলাইনার নেট অর্ডারের ব্যাপক বৃদ্ধি। ২০২৪ সালে বোয়িংয়ের নেট অর্ডার ছিল ৩৭৭টি, যা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১,০৭৫টিতে। এটি বোয়িংয়ের ইতিহাসে ষষ্ঠ সর্বোচ্চ অর্ডারের বছর। একই সঙ্গে সাত বছর পর প্রথমবারের মতো ইউরোপীয় প্রতিদ্বন্দ্বী এয়ারবাসকে পিছনে ফেলে বোয়িং শীর্ষে উঠে আসে। দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা সংকট ও উৎপাদন সমস্যার পর প্রতিষ্ঠানটি ঘুরে দাঁড়ায়।
ট্রাম্প প্রশাসনের প্রকাশিত মূল্য অনুমানের ভিত্তিতে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে আইটিএর সহায়তায় সম্পাদিত চুক্তির মধ্যে বোয়িংয়ের বিমান ও জিই অ্যারোস্পেসের জেট ইঞ্জিন বিক্রি মিলিয়ে মোট মূল্য দাঁড়ায় ২১৫ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে রপ্তানি মূল্য ১৮৭ বিলিয়ন ডলার। চুক্তির মধ্যে কাতার এয়ারওয়েজের সঙ্গে একটি রেকর্ড ওয়াইডবডি বিমান চুক্তি রয়েছে। এতে সর্বোচ্চ ২১০টি ৭৮৭ ও ৭৭৭ এক্স উড়োজাহাজ সরবরাহ করা হবে। মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, এর মূল্য ইঞ্জিনসহ ৯৬ বিলিয়ন ডলার।
২০২৫ সালের মে মাসে ট্রাম্পের দোহা সফরের সময় বোয়িংয়ের সিইও কেলি অর্টবার্গ এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। উপস্থিত ছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি। ট্রাম্প দাবি করেন, এটি “বোয়িংয়ের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিক্রয়।”
কেলি অর্টবার্গ এক বিবৃতিতে বলেন, “২০২৫ সালে রেকর্ড চুক্তি অর্জনে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সহায়তা বোয়িংয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাদের সময়োপযোগী কূটনৈতিক সহায়তা ও কার্যকর পরামর্শ মার্কিন কর্মসংস্থান ও উৎপাদন খাতকে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রেখেছে।”
চুক্তির মধ্যে রয়েছে কোরিয়ান এয়ারলাইনসের সঙ্গে ৫০ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি। এটি যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চুক্তির অংশ। চুক্তির মাধ্যমে শুল্ক কমানো হয়েছে এবং ৩৫০ বিলিয়ন ডলারের অন্যান্য বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
উল্লেখ্য, উড়োজাহাজের ঘোষিত অর্ডারের মূল্য সাধারণত তালিকাভিত্তিক। প্রকৃত বিক্রয়মূল্য গ্রাহকের আকার, আনুগত্য, সরবরাহ সময়সূচি, রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি, অর্ডারের পরিমাণ এবং কাঁচামালের মূল্যের ওপর নির্ভর করে ভিন্ন হতে পারে। বিমান নির্মাতারা সাধারণত হস্তান্তরের সময় অর্থের বড় অংশ পান। তাই ট্রাম্পের মেয়াদ ২০২৯ সালে শেষ হলেও বোয়িং কয়েক বছর পর্যন্ত এই অর্ডারের অর্থ পাবে না।
আইটিএর এক মুখপাত্র জানান, স্বাক্ষরিত চুক্তির হিসাবেই এই পরিসংখ্যান। ফলে মালয়েশিয়া, বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের কিছু প্রাথমিক ক্রয় প্রতিশ্রুতি ২০২৬ সালের পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, যদি চুক্তিগুলো চূড়ান্ত হয়।
বাণিজ্য সচিব হাওয়ার্ড লুটনিক বলেন, “আমরা বিনিয়োগ, উৎপাদন এবং মার্কিন কোম্পানি ও শ্রমিকদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরিতে মনোযোগী। ২০২৫ সাল ঐতিহাসিক হলেও এটি কেবল শুরু। আমরা যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন ও সমৃদ্ধির নতুন যুগের সূচনা অব্যাহত রাখব।”
আইটিএর অ্যাডভোকেসি সেন্টার মার্কিন কোম্পানিগুলোকে বিদেশি ক্রয়চুক্তির দরপত্রে অংশ নিতে পরামর্শ দেয়। একই সঙ্গে বিদেশি সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের ব্যবস্থা করে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের লোকোমোটিভ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ওয়াবটেক কাজাখস্তানের সঙ্গে ৪.২ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি করে। এর আওতায় ৩০০টি ভারী মালবাহী লোকোমোটিভ কিট সরবরাহ করা হবে। ট্রাম্প ও কাজাখ প্রেসিডেন্ট কাসিম-জোমার্ট টোকায়েভের ফোনালাপও এ প্রচারণার অংশ ছিল।
ওয়াবটেকের এই চুক্তি প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিদেশি বিক্রি। এটি ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর অর্জিত মোট ৮.৩ বিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক অবকাঠামো ও সরবরাহ শৃঙ্খল প্রকল্পের অংশ।
আইটিএ আরও জানিয়েছে, ২০২৫ সালের ২৪৪ বিলিয়ন ডলারের চুক্তির মধ্যে রয়েছে প্রতিরক্ষা খাতে ১০ বিলিয়ন, জ্বালানি খাতে ৭ বিলিয়ন এবং প্রযুক্তি খাতে ৩.৪ বিলিয়ন ডলার। প্রযুক্তি খাতের চুক্তিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সাইবার নিরাপত্তা, ফিনটেক ও স্বাস্থ্যসেবা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

