বৃহস্পতির বরফে আচ্ছাদিত উপগ্রহ ইউরোপার তলদেশে লুকিয়ে থাকা বিশাল মহাসমুদ্রে প্রাণের অস্তিত্ব বজায় রাখার উপযোগী রাসায়নিক উপাদান থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন বিজ্ঞানীরা। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে, ইউরোপার পৃষ্ঠে তৈরি হওয়া জীবনদায়ী অক্সিডেন্ট ধীরে ধীরে বরফের স্তর ভেদ করে নিচের মহাসাগরে পৌঁছাতে পারে।
বৃহস্পতির বহু উপগ্রহের মধ্যে ইউরোপাকে দীর্ঘদিন ধরেই ভিনগ্রহে প্রাণ অনুসন্ধানের অন্যতম সম্ভাবনাময় স্থান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। গবেষকদের মতে, এর ফাটলধরা বরফের স্তরের নিচে একটি সুবিশাল লবণাক্ত মহাসাগর রয়েছে, যেখানে পৃথিবীর সব মহাসাগরের সম্মিলিত পানির পরিমাণের চেয়েও বেশি পানি থাকতে পারে।
তবে ইউরোপার সমুদ্র সূর্যালোক ও অক্সিজেন থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। ফলে সেখানে পৃথিবীর মতো সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে শক্তি উৎপাদনের সুযোগ নেই। এমন পরিবেশে প্রাণ টিকে থাকতে হলে রাসায়নিক শক্তির ওপর নির্ভর করতে হয়। এতদিন বিজ্ঞানীদের প্রধান প্রশ্ন ছিল—বৃহস্পতির প্রবল বিকিরণের ফলে ইউরোপার পৃষ্ঠে তৈরি হওয়া অক্সিডেন্ট কীভাবে পুরু বরফের স্তর অতিক্রম করে নিচের মহাসাগরে পৌঁছায়।
ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষকদের সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, ইউরোপার ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়াই এর ব্যাখ্যা দিতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, ইউরোপার পৃষ্ঠতলের কিছু বরফ ধীরে ধীরে নিচের দিকে তলিয়ে যায়। অত্যন্ত ধীর হলেও এই ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উপরিভাগের রাসায়নিক উপাদানগুলো বরফের স্তর ভেদ করে মহাসাগরে পৌঁছাতে পারে।
গবেষণাপত্রের প্রধান লেখক ও বর্তমানে ভার্জিনিয়া টেকের পোস্টডক্টরাল গবেষক অস্টিন গ্রিন বলেন, গ্রহবিজ্ঞানে এটি একটি নতুন ধারণা, যা পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক গবেষণার একটি সুপ্রতিষ্ঠিত তত্ত্ব থেকে অনুপ্রাণিত। তাঁর মতে, এই ব্যাখ্যা ইউরোপার মহাসাগরে প্রাণের বসবাসের সম্ভাবনা নিয়ে দীর্ঘদিনের একটি বড় প্রশ্নের সমাধান দিচ্ছে।
বিজ্ঞানীরা আগে থেকেই জানতেন, বৃহস্পতির প্রবল মহাকর্ষীয় টানের কারণে ইউরোপার পৃষ্ঠ অত্যন্ত সক্রিয়। তবে নতুন গবেষণা অনুযায়ী, এই ভূতাত্ত্বিক চলন মূলত অনুভূমিকভাবে ঘটে, উলম্বভাবে নয়। ফলে বড় ধরনের ফাটল ছাড়া উপরিভাগের উপাদানগুলোর নিচে নামার সুযোগ সীমিত ছিল।
গবেষণায় বলা হয়েছে, ইউরোপার পৃষ্ঠের কাছাকাছি বরফ সাধারণত একটি শক্ত ও অনমনীয় ঢাকনার মতো আচরণ করে। এতে করে উপরিভাগের অক্সিডেন্ট নিচের মহাসাগরে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। তবে কম্পিউটার মডেলের মাধ্যমে দেখা গেছে, লবণাক্ত বরফের কিছু অংশ আশপাশের বিশুদ্ধ বরফের তুলনায় ঘন এবং কাঠামোগতভাবে দুর্বল হতে পারে। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এসব অংশ মূল বরফস্তর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ধীরে ধীরে নিচে নামতে শুরু করে।
গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, এই প্রক্রিয়ায় রাসায়নিক উপাদানগুলো বরফ ভেদ করে মহাসাগরে পৌঁছাতে সময় লাগতে পারে মাত্র ৩০ হাজার বছর, যা মহাজাগতিক সময়ের বিচারে খুবই কম। এই প্রক্রিয়াকে ‘লিথোস্ফিয়ারিক ফাউন্ডিং’ বলা হয়, যা পৃথিবীতে ভূত্বকের কিছু অংশ ম্যান্টলে তলিয়ে যাওয়ার ঘটনার সঙ্গে তুলনীয়। উল্লেখ্য, ২০২৫ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার সিয়েরা নেভাদা পর্বতমালার নিচে এ ধরনের প্রক্রিয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়।
গবেষণায় ইউরোপার প্রায় ৩০ কিলোমিটার পুরু বরফের স্তর নিয়ে ছয়টি ভিন্ন পরিস্থিতিতে সিমুলেশন চালানো হয়। প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, উপরিভাগের অন্তত ৩০০ মিটার গভীরের উপাদান বরফের একেবারে তলদেশে পৌঁছাতে সক্ষম হচ্ছে। দুর্বল অঞ্চলে এই প্রক্রিয়া আরও দ্রুত শুরু হতে পারে বলে গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন।
বিজ্ঞানীদের মতে, এই প্রক্রিয়া ইউরোপার পৃষ্ঠ থেকে মহাসাগরে জীবনদায়ী রাসায়নিক উপাদান পৌঁছে দেওয়ার একটি দ্রুত ও কার্যকর পথ হতে পারে।
আগামী বছরগুলোতে নাসার ‘ইউরোপা ক্লিপার’ মিশনের মাধ্যমে এই উপগ্রহ সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে। ২০২৪ সালে উৎক্ষেপণ করা মহাকাশযানটি ২০৩০ সালের এপ্রিলে বৃহস্পতির কক্ষপথে পৌঁছাবে। চার বছর মেয়াদি এই মিশনে ইউরোপার খুব কাছ দিয়ে প্রায় ৫০ বার উড়ে গিয়ে এর বরফের নিচের মহাসাগরের গভীরতা ও প্রাণের উপযোগিতা আরো নির্ভুলভাবে যাচাই করা হবে।
২০ জানুয়ারি বিজ্ঞান সাময়িকী দ্য প্ল্যানেটারি সায়েন্স জার্নাল-এ গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে।

