চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) শীর্ষ পর্যায়ে তীব্র টানাপোড়েন চলছে বলে ধারণা জোরালো হচ্ছে। সর্বশেষ গত সপ্তাহান্তে চীনের শীর্ষ জেনারেল ঝাং ইউকসিয়া এবং আরেক জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা জেনারেল লিউ ঝেনলিকে বহিষ্কারের ঘটনা দেশটির অভিজাত মহলে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
৭৫ বছর বয়সী ঝাং ইউকসিয়া ছিলেন কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনের (সিএমসি) ভাইস চেয়ারম্যান। কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বাধীন এই কমিশনই চীনের সশস্ত্র বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করে। সাধারণত সাত সদস্যের এই কমিশনে এখন কেবল দুজন সদস্য অবশিষ্ট আছেন—সি চিন পিং নিজে এবং জেনারেল ঝাং শেংমিন। এর আগে ধারাবাহিক দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের আওতায় বাকি সদস্যদের সরিয়ে দেওয়া হয়।
সিএমসি চীনের লাখ লাখ সামরিক সদস্যকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং এর ক্ষমতার পরিধি এতটাই বিস্তৃত যে দেং জিয়াওপিং একচ্ছত্র শাসক থাকাকালীন একমাত্র যে পদটি নিজের হাতে রেখেছিলেন, সেটি ছিল এই কমিশনের চেয়ারম্যানের পদ।
এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের গবেষক লাইল মরিস মনে করেন, সিএমসিতে মাত্র একজন জেনারেলের উপস্থিতি নজিরবিহীন। তিনি বিবিসিকে বলেন, পিএলএ বর্তমানে বিশৃঙ্খল অবস্থার মধ্যে রয়েছে এবং শীর্ষ পর্যায়ে একটি বড় ধরনের নেতৃত্বশূন্যতা তৈরি হয়েছে।
ঝাং ও লিউকে অপসারণের প্রকৃত কারণ নিয়ে নানা গুজব ছড়িয়েছে বলে জানান মরিস। তাঁর মতে, কোনটি সত্য আর কোনটি মিথ্যা, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে এই পরিস্থিতি পিএলএর ওপর সি চিন পিংয়ের নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে একটি নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে।
ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের সহযোগী অধ্যাপক চং জা ইয়ানও বলেন, ঝাংয়ের পতনের পেছনের কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত কিছু জানা যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রে পারমাণবিক গোপন তথ্য ফাঁস, অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্র এবং অভ্যন্তরীণ উপদলীয় দ্বন্দ্ব—সব ধরনের গুজবই শোনা যাচ্ছে। এমনকি বেইজিংয়ে গোলাগুলির কথাও ছড়িয়েছে।
তবে এই বহিষ্কার দুটি বিষয় স্পষ্ট করেছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। প্রথমত, সি চিন পিং এখনো অপ্রতিদ্বন্দ্বী অবস্থানে রয়েছেন এবং দ্বিতীয়ত, চীনে তথ্যপ্রবাহের কঠোর নিয়ন্ত্রণ অনিশ্চয়তা ও গুজবকে আরও উসকে দিচ্ছে।
বেইজিং সরকার জানিয়েছে, ঝাং ও লিউয়ের বিরুদ্ধে ‘শৃঙ্খলা ও আইনের গুরুতর লঙ্ঘনের’ অভিযোগে তদন্ত চলছে, যা সাধারণত দুর্নীতির ইঙ্গিত হিসেবে ব্যবহৃত হয়। রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত ‘পিএলএ ডেইলি’ তাদের সম্পাদকীয়তে এ পদক্ষেপকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কমিউনিস্ট পার্টির ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির প্রকাশ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
জেনারেলদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি এবং ভবিষ্যতেও তা প্রকাশিত হবে কি না, সে বিষয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। তবে তদন্তের অর্থই হলো, তাঁদের অন্তত কারাদণ্ড ভোগ করতে হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, দুর্নীতির অভিযোগের পাশাপাশি ক্ষমতার রাজনীতিও এই বহিষ্কারের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। সি চিন পিং ক্ষমতায় আসার পর দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ও অনুগত নন—এমন কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ বহুবার উঠেছে। এর ফলে তিনি এমন মাত্রার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন, যা মাও সেতুংয়ের পর আর দেখা যায়নি।
তবে এই ধরনের নিয়ন্ত্রণ সামরিক বাহিনীর সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভীতি ও সতর্কতা তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ঝাং ইউকসিয়া ছিলেন পিএলএর হাতে গোনা যুদ্ধ-অভিজ্ঞ শীর্ষ কর্মকর্তাদের একজন। তাঁর বাবা ছিলেন সির বাবার বিপ্লবী সহযোদ্ধা এবং ঝাংকে দীর্ঘদিন সির ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হতো।
ঝাংয়ের অপসারণ তাইওয়ান ইস্যুতে চীনের সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়েও আলোচনা চলছে। চং জা ইয়ানের মতে, তাইওয়ান দখলের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে এর বড় প্রভাব নাও পড়তে পারে। তবে শীর্ষ সামরিক পেশাদারদের অনুপস্থিতিতে সামরিক অভিযানের সিদ্ধান্ত আরও বেশি করে সির ব্যক্তিগত ইচ্ছা ও বিবেচনার ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র: বিবিসি

