ফুটবল বিশ্বকাপ শুধু মাঠের লড়াই নয়, এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে অফিস, কারখানা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ ঘিরে বিশ্বব্যাপী কর্মক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে এক আন্তর্জাতিক জরিপ। গবেষণাটি বলছে, খেলা দেখার আগ্রহ, কাজের সময়সূচিতে পরিবর্তন এবং কর্মীদের মনোযোগ বিচ্যুতির কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রায় ১ হাজার ৭০০ কোটি মার্কিন ডলারের ক্ষতি হতে পারে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ২ লাখ ৮ হাজার ৬৫৬ কোটি টাকা।
বিশ্বকাপ শুরু হতে আর বেশি সময় বাকি নেই। ফুটবলপ্রেমীরা ইতোমধ্যে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন নিজেদের প্রিয় দলকে সমর্থন জানাতে। তবে এই উন্মাদনা নিয়োগকর্তাদের জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, কর্মীদের একটি বড় অংশ বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখার জন্য নিয়মিত কর্মসূচিতে পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা করছেন।
মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও কর্মী পরিচালনা-সংক্রান্ত প্রযুক্তিসেবা প্রদানকারী একটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৩৭ শতাংশ কর্মী বিশ্বকাপ চলাকালে নিজেদের কাজের সময়সূচি পরিবর্তনের কথা ভাবছেন। কেউ দেরিতে অফিসে আসতে চান, কেউ আবার আগেভাগে বের হওয়ার পরিকল্পনা করছেন। এমনকি কিছু কর্মী পুরো কর্মদিবসেই অনুপস্থিত থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জরিপের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২৭ শতাংশ কর্মী স্বাভাবিক কর্মঘণ্টা ব্যাহত করতে পারেন। অন্যদিকে ১৪ শতাংশ কর্মী অফিস চলাকালে গোপনে ম্যাচ বা ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো অনলাইনে দেখার ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন। এছাড়া ১১ শতাংশ কর্মী স্বীকার করেছেন, ম্যাচ-পরবর্তী উদযাপন বা সামাজিক আড্ডার প্রভাব নিয়েই পরদিন কর্মস্থলে উপস্থিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কর্মক্ষেত্রে শারীরিক উপস্থিতি থাকলেও মানসিকভাবে কাজে মনোযোগ না থাকলে তার প্রভাব অনেক সময় সরাসরি অনুপস্থিতির চেয়েও বেশি হতে পারে। এতে কাজের গতি কমে যায়, সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব ঘটে এবং গ্রাহকসেবার মানও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
গবেষণাটি পরিচালনার জন্য অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, মেক্সিকো, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৮ হাজার কর্মীর মতামত সংগ্রহ করা হয়। জরিপে অংশ নেওয়া বিভিন্ন দেশের কর্মীদের মধ্যে বিশ্বকাপ নিয়ে ব্যাপক আগ্রহের প্রতিফলন দেখা গেছে।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতির দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। দেশটিতে উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ার ফলে প্রায় ১ হাজার ১৭০ কোটি ডলারের অর্থনৈতিক প্রভাব পড়তে পারে। এরপর রয়েছে জার্মানি, যেখানে সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৩৪ কোটি ডলার।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় ধরনের আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজনের সময় কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিতি বৃদ্ধি এবং মনোযোগের ঘাটতি প্রায়ই দেখা যায়। এর ফলে শুধু উৎপাদন কমে না, বরং একই দলের অন্য সদস্যদের ওপর অতিরিক্ত কাজের চাপ পড়ে। দীর্ঘমেয়াদে এটি কর্মপরিবেশ ও কর্মীদের মনোবলেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে বিষয়টি শুধু সাধারণ কর্মীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। জরিপে দেখা গেছে, ব্যবস্থাপক পর্যায়ের কর্মকর্তারাও বিশ্বকাপের আকর্ষণ থেকে দূরে নন। প্রায় ৪২ শতাংশ ব্যবস্থাপক গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ দেখার জন্য ছুটি নেওয়ার কথা ভাবছেন। এছাড়া ৪৫ শতাংশ ব্যবস্থাপক প্রয়োজন অনুযায়ী শেষ মুহূর্তে কাজের সময় পরিবর্তনের সুযোগ খুঁজছেন।
বিশ্বকাপ এবার আয়োজন করছে উত্তর আমেরিকার তিন দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল নিয়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এই আসর। মোট ১০৪টি ম্যাচের বিশাল আয়োজনকে ঘিরে বিশ্বব্যাপী উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বকাপের মতো বড় ক্রীড়া আসর সাময়িকভাবে উৎপাদনশীলতায় চাপ সৃষ্টি করলেও এর ইতিবাচক দিকও রয়েছে। সম্প্রচার, পর্যটন, বিজ্ঞাপন, আতিথেয়তা এবং খুচরা ব্যবসাসহ বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত অর্থনৈতিক কার্যক্রম তৈরি হয়। ফলে ক্ষতির পাশাপাশি নতুন ব্যবসায়িক সুযোগও সৃষ্টি হয়।
তবু কর্মক্ষেত্রের বাস্তবতায় নিয়োগকর্তাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে কর্মীদের উৎসাহ ও উৎপাদনশীলতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা। অনেক প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে নমনীয় কর্মঘণ্টা, হাইব্রিড কর্মব্যবস্থা এবং অফিসে খেলা দেখার বিশেষ ব্যবস্থার মতো উদ্যোগ বিবেচনা করছে, যাতে কর্মীদের আগ্রহকে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগিয়ে উৎপাদনশীলতার ক্ষতি কমিয়ে আনা যায়।
বিশ্বকাপ যতই এগিয়ে আসছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে যে এর প্রভাব শুধু স্টেডিয়াম বা টেলিভিশনের পর্দায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; বিশ্বের অসংখ্য অফিস, কারখানা ও কর্মক্ষেত্রেও এর ঢেউ অনুভূত হবে।

