মার্কিন প্রশাসনের আরোপিত বিপুল অঙ্কের শুল্ক এড়াতে চীন চল্লিশটিরও বেশি দেশ ও বাণিজ্য অঞ্চল নিয়ে একটি বিস্তৃত ট্রান্সশিপমেন্ট নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে বলে দাবি করেছে হোয়াইট হাউস। মার্কিন প্রশাসনের বাণিজ্য ও উৎপাদন নীতি দপ্তরের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই দাবি করা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে এই নেটওয়ার্কের আওতায় রয়েছে ভারতও।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, চীনের এই ছায়া ট্রান্সশিপমেন্ট নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত দেশগুলোর তালিকায় যুক্তরাষ্ট্রের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদারও রয়েছে—মেক্সিকো ও কানাডা থেকে শুরু করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া পর্যন্ত।
প্রতিবেদনে বিশেষভাবে ভারতের পুনে-গুজরাট-চেন্নাই কেন্দ্রিক উৎপাদন এলাকাকে যুক্তরাষ্ট্রে চীন-সংশ্লিষ্ট পাম্প ও কম্প্রেসর আমদানির একটি সম্ভাব্য করিডোর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই কার্যক্রম যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি শিল্পনগরীর সরবরাহ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করছে বলে দাবি করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
উভয় দেশের বাণিজ্য উপাত্ত পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সাম্প্রতিক অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের পাম্প-কম্প্রেসর রপ্তানির পরিমাণ ছিল যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের মোট রপ্তানির এক শতাংশেরও কম। তবে একই সময়ে চীন থেকে ভারতের এসব পণ্য আমদানির পরিমাণ ছিল তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি—এই তথ্যকেই সন্দেহের প্রধান ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেছে মার্কিন প্রশাসন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর যুক্তরাষ্ট্র প্রায় সাতষট্টি বিলিয়ন ডলার মূল্যের এমন পণ্য গ্রহণ করেছে, যেগুলো মেক্সিকো, ভারত ও ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশের মাধ্যমে চীন থেকে পুনঃচালান করে পাঠানো হয়েছে বলে মার্কিন প্রশাসনের ধারণা। এর ফলে শুল্ক খাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় আটাশ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে, যদিও শুধু ভারতের মাধ্যমে পুনঃচালানের আলাদা কোনো হিসাব প্রতিবেদনে দেওয়া হয়নি।
এই প্রতিবেদনের তথ্য-উপাত্ত ও পদ্ধতি খতিয়ে দেখছে ভারত সরকার। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র বলেন, কাস্টমস, পণ্যের উৎস-সংক্রান্ত বিধিমালা এবং রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ভারতের শক্তিশালী আইন ও প্রক্রিয়া রয়েছে, আর কোনো লঙ্ঘন প্রমাণিত হলে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রতিবেদনে অবৈধ ট্রান্সশিপমেন্টের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে পণ্য তৃতীয় কোনো দেশ হয়ে সামান্য প্রক্রিয়াকরণ, নতুন লেবেল বা কাগজপত্রের মাধ্যমে নতুন উৎসের পরিচয় নিয়ে রপ্তানি করা হয়, যদিও পণ্যের প্রকৃত রূপান্তর ঘটে না। ২০১৮ সাল থেকে শুল্ক আরোপের প্রতিক্রিয়ায় চীন এ ধরনের বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার প্রবণতা বাড়িয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
চিহ্নিত চল্লিশের বেশি অর্থনীতিকে তিনটি স্তরে ভাগ করা হয়েছে, যেখানে ভারতকে রাখা হয়েছে প্রথম স্তরে—কানাডা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইসরায়েল, জাপান, মেক্সিকো, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের পাশাপাশি। এই স্তরের দেশগুলোকে বহুমুখী অর্থনীতি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যাদের নিজস্ব বিস্তৃত শিল্পভিত্তি থাকা সত্ত্বেও চীন-সংশ্লিষ্ট পণ্যের একটি বড় উৎস হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে হোয়াইট হাউসের এই দাবির ব্যাপারে সন্দিহান ভারতের বাণিজ্য বিশ্লেষকরা। নয়াদিল্লিভিত্তিক একটি গবেষণা সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা মন্তব্য করেন, প্রতিবেদনে ট্রান্সশিপমেন্টের সংজ্ঞাকে অতিরিক্ত সম্প্রসারিত করা হয়েছে, যার ফলে বৈধ উৎপাদন প্রক্রিয়া ও বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলকে ভুলভাবে জালিয়াতি হিসেবে উপস্থাপনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেদনে অনিয়মিত বাণিজ্য পথ শনাক্তে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক একটি সীমান্ত নজরদারি ব্যবস্থা প্রস্তাব করা হয়েছে, যা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা—তাদের আশঙ্কা, এতে পণ্য পরিদর্শন বৃদ্ধি, চালানে বিলম্ব ও অতিরিক্ত জরিমানার মতো জটিলতা তৈরি হতে পারে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য সম্পর্কের একটি স্পর্শকাতর মুহূর্তে এই প্রতিবেদন প্রকাশিত হলো। এর কিছুদিন আগেই মার্কিন সিনেট এমন একটি বিল পাস করেছে, যাতে রাশিয়া থেকে তেল আমদানির কারণে ভারতের ওপর অতিরিক্ত শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপের সুযোগ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয়ের পক্ষ থেকে ভারতের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত উৎপাদনক্ষমতা-সংক্রান্ত একটি পৃথক তদন্তও চলমান রয়েছে।
একজন ভারতীয় বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ মন্তব্য করেন, যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় ক্রমাগত নতুন নতুন অনিশ্চয়তা যোগ করে চলেছে, আর এ ধরনের প্রতিবেদন মূলত বাণিজ্য আলোচনায় নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার একটি কৌশল বলেই মনে হচ্ছে।
তবে ভারতীয় রপ্তানিকারকদের আশঙ্কা, বিদ্যমান শুল্ক বাধার পাশাপাশি এই প্রতিবেদনের কারণে নতুন করে অশুল্ক বাধাও তৈরি হতে পারে। বর্তমানে মার্কিন বাণিজ্য আইনের একটি নির্দিষ্ট ধারার আওতায় ভারতীয় পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক ইতিমধ্যে কার্যকর রয়েছে, আর ওয়াশিংটন ভবিষ্যতে শুল্ক আরও বাড়ানোর একাধিক পথ খোলা রেখেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

