অধিকৃত পশ্চিম তীরে অবৈধ ইসরায়েলি বসতি থেকে পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনা নিয়েছে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডা। এর জবাবে পূর্ব জেরুজালেমে অবস্থিত ব্রিটিশ কনস্যুলেট বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইসরায়েল। মঙ্গলবার এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়। কূটনৈতিক এই পদক্ষেপ ইসরায়েল ও তার দীর্ঘদিনের কয়েকটি মিত্র দেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান দূরত্বকেই আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, গাজা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সমন্বয় মিশনে যুক্তরাজ্য আর অংশ নিতে পারবে না। এর পাশাপাশি ব্রিটেনের সাবেক একজন বিরোধী দলীয় নেতাসহ কয়েকজন ব্রিটিশ ব্যক্তিত্ব এবং অন্য দেশের কিছু নাগরিকের ইসরায়েলে প্রবেশও নিষিদ্ধ করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
ইসরায়েলি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষায়, যুক্তরাজ্যের এই পদক্ষেপ একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয় ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সরাসরি হস্তক্ষেপের শামিল, এবং তা নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য। তাঁর দাবি, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের ওপর জাতিগত নির্মূল অভিযানের অভিযোগ তুলে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী যে মন্তব্য করেছেন, তা সত্যের অপলাপ। উল্লেখ্য, আগামী অক্টোবরের শেষে ইসরায়েলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে, এবং যুক্তরাজ্যের এই সিদ্ধান্তকে সেই নির্বাচনে হস্তক্ষেপের চেষ্টা হিসেবেও দেখছে ইসরায়েলি সরকার।
অন্যদিকে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য হলো, পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের কর্মকাণ্ড এবং ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগের বিষয়টি নিয়ে কেবল উদ্বেগ প্রকাশ করে বসে থাকার সময় শেষ হয়ে গেছে; এখন সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এসেছে।
যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডার নেতৃবৃন্দ এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছেন, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংকটের দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান রক্ষার লড়াইয়ে এই পদক্ষেপ একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তাঁরা চলতি সেপ্টেম্বরের শেষদিকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে এই উদ্যোগের সমর্থনে প্রচার চালানোর ঘোষণাও দিয়েছেন।
এর বাইরে ডেনমার্ক, নরওয়ে, পোল্যান্ড, স্পেন ও সুইডেনসহ আরও কয়েকটি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা পৃথক এক বিবৃতিতে দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের প্রতি তাঁদের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন, যার মূল কথা—ইসরায়েলের পাশাপাশি একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করবে। বিবৃতিতে তাঁরা ন্যায়সংগত ও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থাকার কথা জানিয়েছেন।
কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগ—দুটোই বিবেচনায় রেখে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানই দীর্ঘদিন ধরে কানাডার পছন্দের প্রস্তাব। তাঁর মতে, পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি সম্প্রসারণ এই লক্ষ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
জাতিসংঘ, ফিলিস্তিনিরা এবং বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে এই ইহুদি বসতিগুলোকে অবৈধ বলে মনে করে, যদিও ইসরায়েল এই অবস্থান প্রত্যাখ্যান করে।
একই সময়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে জানা গেছে, ইসরায়েল সরকার পশ্চিম তীরের সবচেয়ে কট্টরপন্থী বসতি স্থাপনকারীদের একাংশকে অর্থায়ন করছে, যারা অবৈধ আউটপোস্ট খামার ব্যবহার করে স্থানীয় ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদে ভূমিকা রাখছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনাপ্রবাহ স্পষ্ট করে দেয় যে পশ্চিম তীরের বসতি নীতি নিয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে পশ্চিমা মিত্রদের মতপার্থক্য এখন কূটনৈতিক উত্তেজনার পর্যায়ে পৌঁছেছে। আসন্ন ইসরায়েলি নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে এই বিরোধ আরও তীব্র হয়ে উঠতে পারে, এবং এর প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘমেয়াদি শান্তি-প্রক্রিয়ার ওপরও পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

