মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাব এবার আরও স্পষ্টভাবে পড়ছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। ইরান যুদ্ধের কারণে যদি আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের সরবরাহ সংকট আরও গভীর হয়, তাহলে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছে ব্যাংক অব আমেরিকা।
মার্কিন এই আর্থিক প্রতিষ্ঠানটি একই সঙ্গে চলতি বছরের শেষ নাগাদ আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের মূল্য পূর্বাভাসও বাড়িয়েছে। আগে যেখানে ব্রেন্ট তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮৩ ডলার হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছিল, এখন সেই পূর্বাভাস বাড়িয়ে ৯৫ ডলার করা হয়েছে।
ব্যাংক অব আমেরিকার গ্লোবাল কমোডিটিজ বিভাগের প্রধান ফ্রান্সিসকো ব্লাঞ্চের নেতৃত্বাধীন বিশ্লেষক দল মঙ্গলবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই পূর্বাভাস দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিকল্প পথে জ্বালানি পরিবহন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে কিছু সরবরাহ অব্যাহত রাখা সম্ভব হলেও বর্তমান সংকট দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ জ্বালানি অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি এবং ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাজারে দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি বর্তমানে বড় ধরনের সংকটের মুখে রয়েছে। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর এই নৌপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হতো।
হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘ সময় ধরে বাধা তৈরি হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাস পরিবহনের জন্য এই পথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে পরিস্থিতি সামাল দিতে সৌদি আরব বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থা সক্রিয় করার চেষ্টা করছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি সৌদি আরামকো পূর্বাঞ্চল থেকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরের সঙ্গে সংযুক্ত পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন পুনরায় চালু করেছে।
এর আগে হামলার কারণে ১৩ সেপ্টেম্বর পাইপলাইনটি বন্ধ হয়ে যায় এবং ইয়ানবু বন্দর থেকে অপরিশোধিত তেল রপ্তানিও ব্যাহত হয়। মঙ্গলবার সীমিত সক্ষমতায় পাইপলাইনে আবার তেল প্রবাহ শুরু হয়েছে এবং বন্দর থেকে রপ্তানি কার্যক্রম পুনরায় চালুর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
সৌদি আরবের এই উদ্যোগের কারণে মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক বাজারে কিছুটা স্বস্তি দেখা গেছে। নভেম্বর সরবরাহের ব্রেন্ট ক্রুডের দাম দিন শেষে ১ দশমিক ০৯ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৯ দশমিক ২৫ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআইয়ের অক্টোবর চুক্তির দাম ১ দশমিক ২৪ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৪ দশমিক ৯৯ ডলারে নেমে আসে। দিনের এক পর্যায়ে উভয় ধরনের তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২ ডলারের বেশি কমেছিল।
তবে ব্যাংক অব আমেরিকার বিশ্লেষকদের মতে, বাজারে সাময়িক মূল্য কমলেও সংকট পুরোপুরি শেষ হয়নি। বিশ্বজুড়ে বাণিজ্যিক ও কৌশলগত জ্বালানি তেলের মজুদ কমে যাওয়ায় স্বল্পমেয়াদে সরবরাহ ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।
ব্যাংকটি মনে করছে, বর্তমান সংকট যদি নিয়ন্ত্রণে আসে, তাহলে ২০২৭ সালে ব্রেন্ট ক্রুডের গড় মূল্য ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৮০ ডলারে নেমে আসতে পারে। তবে তার আগে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি, জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর বাজারের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে জ্বালানি তেলের দাম এমন পর্যায়ে পৌঁছায়নি, যার কারণে বিশ্বব্যাপী চাহিদা ব্যাপকভাবে কমে যাবে। মূল্যস্ফীতি ও মানুষের আয় বিবেচনায় নিলেও এখন পর্যন্ত জ্বালানি ব্যবহারে বড় ধরনের পতন দেখা যায়নি।
এ ছাড়া বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও এখন পর্যন্ত বড় ধাক্কার মুখে পড়েনি। তবে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন বাধা তৈরি হলে পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট শুধু জ্বালানি বাজারেই নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতি, পরিবহন ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতির ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে তেল আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য বাড়তি ব্যয় ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারের নজর এখন হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বড় উৎপাদনকারী দেশগুলোর বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থার দিকে। এসব বিষয়ই নির্ধারণ করবে আগামী দিনে জ্বালানি তেলের দাম কোন দিকে যাবে।

