মধ্যপ্রাচ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল অবকাঠামোর সম্প্রসারণে বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফট। সংস্থাটি ২০৩০ সালের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার ও কুয়েতে ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করতে চায়।
মাইক্রোসফটের ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রেসিডেন্ট ব্র্যাড স্মিথ রয়টার্সকে জানিয়েছেন, এই বিনিয়োগের মূল লক্ষ্য হবে ক্লাউড প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক অবকাঠামো এবং আঞ্চলিক কার্যক্রম সম্প্রসারণ।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যেও মাইক্রোসফট এই বিনিয়োগ পরিকল্পনা অব্যাহত রাখছে। প্রতিষ্ঠানটির মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ডিজিটাল সক্ষমতা ও তথ্য নিরাপত্তা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ব্র্যাড স্মিথ বলেন, মাইক্রোসফটের বিনিয়োগ একদিকে যেমন নতুন প্রযুক্তিগত অবকাঠামো তৈরির অংশ, অন্যদিকে তেমনি এই অঞ্চলে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম সম্প্রসারণের কৌশলের অংশ।
উপসাগরীয় দেশগুলো বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বিপুল বিনিয়োগ করছে। দীর্ঘদিনের তেল ও গ্যাসনির্ভর অর্থনীতিকে বৈচিত্র্যময় করতে তারা প্রযুক্তি, তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল অর্থনীতিকে ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে দেখছে।
এই দেশগুলোর বড় সুবিধা হলো পর্যাপ্ত ভূমি, জ্বালানি সুবিধা এবং বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরির সক্ষমতা। এসব কারণে মাইক্রোসফটের মতো বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে তারা।
তবে এই অঞ্চলে প্রযুক্তি সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বিশেষ করে উন্নত প্রযুক্তির চিপের প্রাপ্যতা, নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি বড় বাধা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের সময় কয়েকটি তথ্যকেন্দ্রও হামলার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে অ্যামাজনের ক্লাউড ইউনিট AWS-এর বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্থাপনাগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে মাইক্রোসফট জানিয়েছে, তারা পূর্বনির্ধারিত বিনিয়োগ পরিকল্পনা থেকে সরে আসছে না। বরং চলমান পরিস্থিতির মধ্যেও বিনিয়োগ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ব্র্যাড স্মিথ বলেন, সংঘাত শুরু হওয়ার পরও প্রতিষ্ঠানটি স্থানীয় অংশীদারদের সহায়তা করেছে। বিশেষ করে ডিজিটাল স্থিতিশীলতা, তথ্য সুরক্ষা এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত অবকাঠামো রক্ষায় সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে।
মাইক্রোসফট বর্তমানে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ডিজিটাল নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বৃদ্ধির উদ্যোগে কাজ করছে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সুরক্ষা, প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি এবং সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয় রয়েছে।
তবে দেশভিত্তিক বা নির্দিষ্ট প্রকল্প অনুযায়ী বিনিয়োগের পরিমাণ প্রকাশ করেনি মাইক্রোসফট। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নিরাপত্তাজনিত বিষয় বিবেচনায় এই তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে না।
মাইক্রোসফট ২০৩০ সালের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে সমুদ্রের নিচ দিয়ে ও স্থলভিত্তিক যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নেও ৪০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করার পরিকল্পনা করছে।
এ ছাড়া আঞ্চলিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গেও অংশীদারিত্ব বাড়াচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। এর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের এআই প্রতিষ্ঠান জি৪২ অন্যতম।
২০২৪ সালে মাইক্রোসফট জি৪২-এ ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে সংখ্যালঘু অংশীদারিত্ব নিয়েছিল। এর মাধ্যমে মাইক্রোসফটের একজন প্রতিনিধি প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদে যুক্ত হয়েছেন।
সৌদি আরবের হিউমেইন এবং কাতারের কিউএআই নামের এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গেও নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে সহযোগিতা করছে মাইক্রোসফট। তবে এসব প্রতিষ্ঠানে সরাসরি মূলধন বিনিয়োগের পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এখন শুধু জ্বালানি সম্পদের ওপর নির্ভরশীল থাকতে চাইছে না। তারা প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ডিজিটাল অবকাঠামোর মাধ্যমে ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি করতে চাইছে।
মাইক্রোসফটের এই বড় বিনিয়োগ পরিকল্পনা সেই পরিবর্তনের অংশ। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতি, প্রযুক্তি সরবরাহ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এই বিনিয়োগের সফল বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

