বিক্রি বাড়ানো এবং ব্যবসার খরচ কমিয়ে প্রতিষ্ঠানকে আবার ঘুরে দাঁড় করাতে উত্তর আমেরিকায় আরও ২৫০টি ক্যাফে বা বিক্রয়কেন্দ্র বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আন্তর্জাতিক কফি শপ চেইন স্টারবাকস। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসা পুনর্গঠনের অংশ হিসেবেই নতুন করে এই শাখাগুলো বন্ধ করা হচ্ছে।
স্টারবাকস জানিয়েছে, বন্ধ হতে যাওয়া ২৫০টি শাখা উত্তর আমেরিকায় তাদের মোট ১৮ হাজার বিক্রয়কেন্দ্রের প্রায় ১ শতাংশ। ২০২৬ অর্থবছরের মধ্যে এসব শাখা বন্ধ ও সংশ্লিষ্ট পুনর্গঠন কার্যক্রমে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৩০ কোটি ডলার ব্যয় হতে পারে।
বিশ্বজুড়ে পরিচিত এই কফি শপ প্রতিষ্ঠানের জন্য শাখা বন্ধের সিদ্ধান্তটি ব্যবসা পরিচালনায় পরিবর্তনের একটি বড় অংশ। প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ব্রায়ান নিকোল দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটির বিক্রি বাড়ানো এবং দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক চাপ কাটিয়ে ওঠার জন্য বেশ কিছু পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছেন। নতুন করে ২৫০টি শাখা বন্ধ করার সিদ্ধান্তও সেই পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার অংশ।
স্টারবাকসের ব্যবসার একটি বড় অংশ উত্তর আমেরিকার বাজারকে ঘিরে। ফলে এই অঞ্চলে শত শত শাখা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত থেকে বোঝা যায়, প্রতিষ্ঠানটি এখন সব জায়গায় একইভাবে ব্যবসা পরিচালনা না করে তুলনামূলকভাবে কার্যকর ও লাভজনক শাখাগুলোর দিকে বেশি মনোযোগ দিতে চাইছে।
এর আগে গত বছরও প্রতিষ্ঠানটি বেশ কিছু শাখা বন্ধ করেছিল। এর মধ্যে সিয়াটলের বিখ্যাত রোস্টারিসহ একাধিক বিক্রয়কেন্দ্র ছিল। এবার আরও ২৫০টি ক্যাফে বন্ধ করার সিদ্ধান্ত সেই ধারাবাহিকতারই অংশ।
গ্রাহকদের আবার দোকানে ফিরিয়ে আনতে স্টারবাকস ইতিমধ্যে তাদের ব্যবসা পরিচালনায় বেশ কিছু পরিবর্তন এনেছে। মেনুর পরিধি সহজ করা, দ্রুত সেবা দেওয়ার চেষ্টা এবং প্রতিষ্ঠানের পরিচালন ব্যয় কমানোর মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে করপোরেট পর্যায়ে কর্মী কমানোর উদ্যোগও নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
স্টারবাকসের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো গ্রাহকদের অভিজ্ঞতা উন্নত করার পাশাপাশি ব্যবসার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা। একটি বড় কফি শপ নেটওয়ার্ক পরিচালনার ক্ষেত্রে ভাড়া, কর্মীদের বেতন, সরবরাহ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয় নিয়মিতভাবে বহন করতে হয়। কোনো শাখায় বিক্রি প্রত্যাশা অনুযায়ী না হলে সেটি চালু রাখার খরচ ব্যবসার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
এ কারণেই কম কার্যকর শাখা বন্ধ করে তুলনামূলকভাবে ভালো সম্ভাবনাময় বিক্রয়কেন্দ্রে বিনিয়োগ বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এর মাধ্যমে একদিকে পরিচালন ব্যয় কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, অন্যদিকে যেসব শাখায় গ্রাহক উপস্থিতি বেশি সেগুলোতে সেবা উন্নত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে শাখা বন্ধের সিদ্ধান্তের সঙ্গে কর্মসংস্থান এবং স্থানীয় ব্যবসার ওপরও প্রভাব পড়ার বিষয়টি জড়িত। একটি ক্যাফে বন্ধ হলে সেখানে কর্মরত কর্মীদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সরবরাহব্যবস্থার ওপরও প্রভাব পড়তে পারে। তাই ব্যবসা পুনর্গঠনের মাধ্যমে ব্যয় কমানোর লক্ষ্য থাকলেও এর স্বল্পমেয়াদি প্রভাব প্রতিষ্ঠানটির কর্মী ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের ওপর পড়তে পারে।
স্টারবাকসের পক্ষ থেকে অবশ্য শুধু শাখা বন্ধের ওপর নির্ভর না করে গ্রাহকদের আকৃষ্ট করার জন্য সেবার ধরনেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। দ্রুত সেবা দেওয়ার উদ্যোগের পাশাপাশি মেনু সহজ করার লক্ষ্য হলো গ্রাহকদের জন্য কেনাকাটার অভিজ্ঞতা আরও সহজ করা। একই সঙ্গে পরিচালন কাঠামোকে তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়বহুল করার চেষ্টা চলছে।
উত্তর আমেরিকার মোট ১৮ হাজার বিক্রয়কেন্দ্রের তুলনায় ২৫০টি শাখা সংখ্যায় খুব বড় অংশ নয়। তবে এক বছরের মধ্যে আগের শাখা বন্ধের সিদ্ধান্তের পর আবারও এতগুলো ক্যাফে বন্ধ করার ঘোষণা প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক কৌশলে পরিবর্তনের বিষয়টি স্পষ্ট করছে।
এখানে স্টারবাকসের মূল লক্ষ্য শুধু শাখার সংখ্যা কমানো নয়; বরং কোন ধরনের শাখা ব্যবসার জন্য কার্যকর, কোথায় গ্রাহক চাহিদা বেশি এবং কোন ধরনের সেবায় মানুষ বেশি আগ্রহী—এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে ব্যবসাকে নতুনভাবে সাজানো। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটি পরিমাণের চেয়ে কার্যকারিতা ও সেবার মানকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার দিকে যাচ্ছে।
২০২৬ অর্থবছরের মধ্যে পুনর্গঠন কার্যক্রমে প্রায় ৩০ কোটি ডলার ব্যয়ের সম্ভাবনাও দেখিয়েছে স্টারবাকস। অর্থাৎ শাখা বন্ধের পাশাপাশি ব্যবসার কাঠামো পরিবর্তন করতেও প্রতিষ্ঠানটিকে উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। এখন এই ব্যয়ের বিনিময়ে ভবিষ্যতে বিক্রি ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম কতটা বাড়ানো যায়, সেটিই হবে বড় প্রশ্ন।
স্টারবাকসের এই পরিবর্তন বিশ্বজুড়ে বড় খুচরা ও খাদ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। বড় সংখ্যক শাখা থাকলেই যে ব্যবসা সবসময় শক্তিশালী থাকে, তা নয়। গ্রাহকের চাহিদা, পরিচালন ব্যয় এবং বাজারের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ব্যবসার কাঠামোও বদলাতে হয়।
সব মিলিয়ে উত্তর আমেরিকায় আরও ২৫০টি ক্যাফে বন্ধ করার সিদ্ধান্ত স্টারবাকসের ব্যবসা সংকোচনের চেয়ে পুনর্গঠন পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই সামনে এসেছে। গ্রাহকদের ফিরিয়ে আনা, দ্রুত সেবা নিশ্চিত করা, পরিচালন ব্যয় কমানো এবং কার্যকর শাখাগুলোতে মনোযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি ব্যবসার গতি ফেরানোর চেষ্টা করছে। এখন এসব পরিবর্তন কতটা সফল হয় এবং এর মাধ্যমে স্টারবাকস উত্তর আমেরিকার বাজারে বিক্রি ও গ্রাহক উপস্থিতি কতটা বাড়াতে পারে, সেটিই দেখার বিষয়।

