যুক্তরাষ্ট্রে আবারও মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতসহ নানা কারণে বাড়ছে জ্বালানি ও পরিবহন খরচ, যার প্রভাব পড়ছে সরাসরি সাধারণ পরিবারের বাজেটে। এই পরিস্থিতিতে ক্রেতাদের স্বস্তি দিতে দেশটির বড় বড় খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে ছাড় দেওয়ার এক ধরনের প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছে, বিশেষ করে সামনের উৎসবের মৌসুমকে কেন্দ্র করে।
ডিসকাউন্ট চেইন প্রতিষ্ঠান আলডি গত বুধবার জানিয়েছে, আগামী ৩ নভেম্বর পর্যন্ত তাজা খাবারের বিভিন্ন পণ্যে প্রায় সাড়ে আট কোটি ডলার সমমূল্যের ছাড় দেবে তারা। এমনকি প্রতিষ্ঠানটির দোকানে থাকা মোট পণ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের দামই গত বছরের তুলনায় ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে।
ভিন্ন কৌশল নিয়েছে আরেক শীর্ষস্থানীয় সুপারশপ চেইন ক্রোগার। তারা পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরাসরি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ প্রয়োগ করছে। দামের বিরোধ নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু জনপ্রিয় আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের পণ্য তাদের কয়েকটি দোকান থেকে সাময়িকভাবে সরিয়েও নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ক্রোগারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সরবরাহকারীদের বাড়তি দামের বোঝা যেন কোনোভাবেই ক্রেতাদের ওপর গিয়ে না পড়ে, সেটি নিশ্চিত করতেই এই কঠোর অবস্থান নিয়েছে তারা।
অনলাইন মুদিপণ্য কেনাকাটার ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রতিযোগিতা দেখা যাচ্ছে। নিত্যপণ্য সরবরাহকারী একটি জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম গত বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি বড় গ্রোসারি চেইন এখন এমন একটি কর্মসূচিতে যুক্ত হয়েছে, যেখানে দোকানে সরাসরি কেনা পণ্যের দাম আর অ্যাপের মাধ্যমে অর্ডার করা পণ্যের দামের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকবে না—অনলাইন ডেলিভারির নামে বাড়তি কোনো অর্থ নেওয়া হবে না। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী জানিয়েছেন, ক্রেতারা এখন সেই প্ল্যাটফর্মগুলোর দিকেই বেশি ঝুঁকছেন যেখানে বাড়তি মূল্য যোগ করা হয় না, এবং যেসব খুচরা বিক্রেতা অনলাইনেও একই দাম বজায় রাখছে, তাদের ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি প্রতিযোগীদের তুলনায় প্রায় দশ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি।
পাইকারি ও খুচরা বিক্রয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আরেক বড় প্রতিষ্ঠান প্রতি প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদনেই দাম কমানোর হিসাব তুলে ধরছে নিয়মিতভাবে। সাম্প্রতিক প্রান্তিকে আখরোট, কফি ও কালো গোলমরিচের মতো নিত্যব্যবহার্য পণ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে দাম কমিয়েছে তারা। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী জানান, কাঁচামালের দাম বাড়লেও সরবরাহকারীদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে পণ্যের দাম যতটা সম্ভব নিচে রাখাই তাদের মূল লক্ষ্য, এবং নতুন নতুন উপায়ে দাম কমানোর চেষ্টা তাদের নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ।
এই ছাড়ের প্রবণতা অবশ্য নতুন নয়। বিশ্বের সবচেয়ে বড় রিটেইল প্রতিষ্ঠানটি চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আড়াইশটি পণ্যে বড় ছাড়ের ঘোষণা দিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, এটি ছিল তাদের বৃহত্তর মূল্যছাড় পরিকল্পনার একটি ছোট অংশ মাত্র—সারা বছরে প্রায় এগারো হাজারের বেশি পণ্যে তারা ছাড় দিয়েছে। সম্প্রতি একটি বিনিয়োগ ব্যাংকের আয়োজিত খুচরা বাণিজ্য সম্মেলনে প্রতিষ্ঠানটির যুক্তরাষ্ট্র শাখার প্রধান নির্বাহী বলেন, তাদের মূল দায়িত্ব হলো সরবরাহকারীদের সঙ্গে দরকষাকষি করে সাময়িক মূল্যছাড়কে স্থায়ী কম দামে রূপান্তর করা, যার ফলে বছরের দ্বিতীয়ার্ধে ক্রেতারা নিশ্চিন্তে দৈনন্দিন কেনাকাটা করতে পারছেন।
অতীতের অর্থনৈতিক মন্দার সময়গুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, বাজারে আর্থিক চাপ তৈরি হলেই এই ধরনের সাশ্রয়ী সুপারশপগুলোর বাজার হিস্যা সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পায়। শুরুতে বাধ্য হয়ে কম দামের খোঁজে আসা নতুন ক্রেতারা পরে পণ্যের সঠিক দাম ও মানের কারণে ধীরে ধীরে নিয়মিত গ্রাহকে পরিণত হন। একটি বাজার বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠানের তথ্যেও এই প্রবণতার প্রতিফলন দেখা গেছে—চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের মুদি বিক্রেতাদের মধ্যে আলডির দোকানে ক্রেতাসমাগম সবচেয়ে দ্রুত বেড়েছে, যার প্রধান কারণ হিসেবে কম দামে পণ্য সরবরাহের কৌশলকেই দায়ী করা হচ্ছে।
তবে শুধু নতুন ক্রেতা আকৃষ্ট করাই এসব প্রতিষ্ঠানের একমাত্র লক্ষ্য নয়—তাদের মূল চ্যালেঞ্জ হলো এই নতুন ক্রেতাদের দীর্ঘমেয়াদে নিয়মিত গ্রাহকে রূপান্তরিত করা। সাম্প্রতিক বছরগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন ও ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের বক্তব্যেও এই কৌশলের ইঙ্গিত স্পষ্টভাবে পাওয়া যাচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতির মতো জটিল সমস্যার কোনো তাৎক্ষণিক বা জাদুকরী সমাধান নেই। তবে সংকটময় এই সময়ে সুপারশপগুলোর আগাম দাম কমানো ও ছাড় দেওয়ার এই প্রবণতা সাধারণ মানুষের ওপর থেকে মূল্যস্ফীতির তীব্র চাপ কিছুটা হলেও লাঘব করতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন তাঁরা।

