বিশ্বের মাংস বাজারে নতুন ধরনের চাপ তৈরি হচ্ছে। গরুর সংখ্যা কমে যাওয়া, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, খরা, আবহাওয়ার পরিবর্তন এবং খাদ্য সরবরাহের অনিশ্চয়তার কারণে ভবিষ্যতে মাংসের দাম আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশ্বের ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ কোনো না কোনোভাবে মাংস খায়। ফলে মাংস উৎপাদন ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন হলে এর প্রভাব সরাসরি পড়তে পারে ভোক্তার বাজার, রান্নাঘর এবং খাদ্যাভ্যাসে।
একটি গরু বাজারজাত উপযোগী হতে কয়েক বছর সময় লাগে। আবার মুরগি ও অন্যান্য প্রাণীর খাদ্যের বড় অংশ নির্ভর করে বৈশ্বিক শস্য ও সয়াবিন বাজারের ওপর। ফলে উৎপাদন ব্যবস্থার যেকোনো একটি অংশে সমস্যা তৈরি হলে পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ পড়ে।
বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় গরুর মাংস উৎপাদক দেশ ব্রাজিল, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনে গবাদিপশুর সংখ্যা কমছে। এই তিন দেশ মিলেই বিশ্বের অর্ধেকের বেশি গরুর মাংস সরবরাহ করে।
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ব্রাজিলে গবাদিপশুর সংখ্যা আনুমানিক ১৭ কোটি ৭৪ লাখে নেমে এসেছে। ২০২৪ সালে যা ছিল ১৯ কোটি ২৫ লাখ। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে প্রায় ৮ শতাংশ কমেছে।
যুক্তরাষ্ট্রেও গবাদিপশুর সংখ্যা ঐতিহাসিকভাবে নিচে নেমেছে। ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি দেশটির খামারে গরু ও বাছুরের সংখ্যা ছিল ৮ কোটি ৬২ লাখ। এর মধ্যে ভবিষ্যৎ বাছুর উৎপাদনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ গাভীর সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৭৬ লাখ, যা আগের বছরের তুলনায় ১ শতাংশ কম।
চীনে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে গবাদিপশুর সংখ্যা ছিল প্রায় ৯ কোটি। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে এই সংখ্যা ছিল ১০ কোটি ৫০ লাখ। অর্থাৎ দুই বছরে প্রায় ১৪ শতাংশ কমেছে।
গবাদিপশুর সংখ্যা কমার সঙ্গে সঙ্গে এসব দেশে গরুর মাংস উৎপাদনও কমার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ব্রাজিলে উৎপাদন ২ শতাংশ এবং রপ্তানি ৫ শতাংশ কমতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৬ সালের উৎপাদন আগের বছরের তুলনায় ৪ শতাংশ কমার সম্ভাবনা রয়েছে। চীনের গরুর মাংস সরবরাহ ২০২৪ সালের তুলনায় ১২ শতাংশ কমতে পারে।
এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে চীনের বাজারে। দেশটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় গরুর মাংস ভোক্তা ও আমদানিকারক। স্থানীয় উৎপাদন কমে যাওয়া এবং আমদানি সরবরাহ সংকুচিত হওয়ায় সেখানে মাংসের দাম দ্রুত বাড়ছে।
কেন কমছে গবাদিপশুর সংখ্যা
বিভিন্ন দেশে সংকটের কারণ ভিন্ন হলেও কয়েকটি সাধারণ সমস্যা কাজ করছে।
ব্রাজিলের ক্ষেত্রে চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো বড় বাজারে রপ্তানি নীতির পরিবর্তন এবং কিছু সীমাবদ্ধতা উৎপাদকদের ওপর প্রভাব ফেলেছে। একই সঙ্গে দেশটি বর্তমানে এমন একটি পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে খামারিরা গবাদিপশু বিক্রির পরিবর্তে ভবিষ্যৎ উৎপাদনের জন্য স্ত্রী গরু ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে খরা। দেশটির প্রায় ৬০ শতাংশ গবাদিপশু পালনের এলাকায় খরার প্রভাব পড়েছে। এতে চারণভূমি কমেছে এবং পশুখাদ্যের খরচ বেড়েছে।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের মাংস শিল্পে শ্রম সংকটও একটি বিষয় হয়ে উঠেছে। শিল্পসংশ্লিষ্ট কয়েকটি সংগঠন জানিয়েছে, অভিবাসী শ্রমিকদের ওপর নির্ভরশীল এই খাতে বিভিন্ন অভিযান কার্যক্রম উৎপাদন ব্যবস্থায় সমস্যা তৈরি করছে।
দাম বাড়লেও দ্রুত বাড়ানো যায় না উৎপাদন
সাধারণভাবে মাংসের দাম বাড়লে উৎপাদকরা বেশি উৎপাদনে আগ্রহী হন। কিন্তু গবাদিপশুর ক্ষেত্রে বিষয়টি এত সহজ নয়।
কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজারে দাম বাড়ার সংকেত পাওয়ার পরও নতুন গবাদিপশু উৎপাদন করতে কয়েক বছর সময় লাগে। দ্রুত উৎপাদন বাড়ানোর উপায় হলো স্ত্রী গরু বিক্রি না করে প্রজননের জন্য রেখে দেওয়া।
তবে এতে খামারিদের কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়। একটি গরু এখন বেশি দামে বিক্রি করলে তাৎক্ষণিক আয় পাওয়া যায়, কিন্তু প্রজননের জন্য রেখে দিলে ভবিষ্যতে লাভের আশায় বর্তমান খরচ ও ঝুঁকি বহন করতে হয়।
এ কারণে অনেক সময় বাজারে দাম বেশি থাকা সত্ত্বেও সরবরাহ সংকট দীর্ঘস্থায়ী হয়।
ইউরোপে গরুর মাংস থেকে মুরগির দিকে ঝোঁক
ইউরোপে মাংস বাজারে আরেক ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। সেখানে গরু ও শূকরের মাংস উৎপাদন কমলেও মুরগির মাংসের উৎপাদন বাড়ছে।
২০২৫ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নে মোট প্রায় ৪ কোটি ২৭ লাখ টন মাংস উৎপাদন হয়েছে। তবে ২০২৫ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে মোট মাংস উৎপাদন প্রায় ৩ শতাংশ কমতে পারে।
এই সময়ে গরুর মাংস উৎপাদন ১০ শতাংশ এবং শূকরের মাংস উৎপাদন ৭ শতাংশ কমার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে মুরগির মাংস উৎপাদন ৫ শতাংশ বাড়তে পারে।
এর কারণ হলো, মুরগি দ্রুত উৎপাদন করা যায় এবং তুলনামূলক কম খরচে বাজারে সরবরাহ করা সম্ভব। একটি মুরগি কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বাজারজাত করা যায়, যেখানে গবাদিপশুর জন্য কয়েক বছর সময় লাগে।
মুরগির বাজারেও চাপ
শুধু গরুর মাংস নয়, মুরগির উৎপাদন ব্যবস্থাও চাপের মুখে রয়েছে। ভারতের পরিস্থিতি এর উদাহরণ।
সেখানে সয়াবিনের খৈলের দাম বেড়ে যাওয়ায় মুরগি উৎপাদনকারীরা উৎপাদন কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। জুন মাসে ভারতের একটি বড় মুরগি উৎপাদনকারী সংগঠন ২৫ শতাংশ পর্যন্ত উৎপাদন কমানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিল।
পশুখাদ্যে প্রোটিনের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হলো সয়াবিন খৈল। এর দাম বাড়লে উৎপাদকদের সামনে তিনটি পথ থাকে—বাড়তি খরচ নিজেরা বহন করা, পণ্যের দাম বাড়ানো অথবা উৎপাদন কমানো।
ভারতের ক্ষেত্রে অনেক উৎপাদক উৎপাদন কমানোর পথ বেছে নিয়েছেন।
এর প্রভাব আন্তর্জাতিক বাজারেও পড়েছে। সয়াবিন খৈলের দাম বাড়ায় ভারত কিছু রপ্তানি চুক্তি বাতিল করে এবং বিকল্প উৎস থেকে সয়াবিন সংগ্রহের চেষ্টা শুরু করে।
বিশ্বের মাংস বাজার এখন শুধু চাহিদার ওপর নির্ভর করছে না; বরং জলবায়ু, খাদ্যশস্যের দাম, উৎপাদন ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিস্থিতিও বড় ভূমিকা রাখছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে মাংস উৎপাদনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু প্রযুক্তি বা অর্থ নয়, বরং সময়। কারণ গবাদিপশুর সংখ্যা কমে গেলে তা দ্রুত পূরণ করা সম্ভব নয়। ফলে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বিশ্বের খাদ্য ব্যবস্থাকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে।

